সময়: বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘রুনাকে দাও, বিনিময়ে ফারাক্কার সব পানি নিয়ে যাও’—এক কিংবদন্তির অমলিন যাত্রা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৪:৪৮:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২৭৫ Time View

মাত্র বারো বছর বয়সে পাকিস্তানের ‘জুগনু’ সিনেমার একটি গানে কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে যে কিশোরী সংগীতপথে পা রেখেছিলেন, তিনি আজ বিশ্বের কোটি ভক্তের হৃদয়ে অমর এক নাম—রুনা লায়লা। পশ্চিম পাকিস্তানের নামকরা সংগীতজ্ঞরা এত অল্প বয়সেই তার প্রতিভায় বিস্মিত হয়েছিলেন। এর ফলস্বরূপ চলচ্চিত্রের গানে নিয়মিত হতে সময় লাগেনি রুনার। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন পশ্চিম পাকিস্তানের শ্রোতাপ্রিয়তম কণ্ঠগুলোর একটি।

স্বাধীনতার পর তিনি যখন নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখন পাকিস্তানে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। পাকিস্তান সরকারও চাইছিলেন তাকে যে করেই হোক ধরে রাখতে। কিন্তু জন্মভূমির টান, মানুষের ভালোবাসা এবং নিজের পরিচয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা—সবই তাকে ফিরিয়ে আনে ঢাকায়। জনপ্রিয়তা, প্রতিষ্ঠা, ক্যারিয়ারের বিশাল সম্ভাবনা—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

বাংলাদেশে তার সংগীত জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় সংগীত পরিচালক সত্য সাহার হাত ধরে। এরপর শুরু হয় চূড়ান্ত সাফল্যের যাত্রা। ‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ কিংবা ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’—সুরের জাদুতে তিনি জয় করে নেন পুরো উপমহাদেশকে।

উপমহাদেশের সংগীতমঞ্চে রুনার আলো

বিশ্বের এমন কোনো বড় শহর নেই, যেখানে রুনা লায়লার কণ্ঠে সুরের আলোর দীপ জ্বলে ওঠেনি। বাংলা, উর্দু, হিন্দিসহ মোট ১৮টি ভাষায় তিনি গেয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি গান—যা এক কণ্ঠশিল্পীর জন্য অবিশ্বাস্য অর্জন। তার মাধুর্যময় কণ্ঠ এমনকি কঠোর সমালোচকদেরও ভক্তে পরিণত করেছে।

এই তালিকায় ছিলেন ভারতের বিখ্যাত পত্রিকা ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া-এর সম্পাদক খুশবন্ত সিং। তিনি ছিলেন কঠোর সমালোচক, প্রশংসা করতে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তিত্ব। উদ্দেশ্য ছিল সমালোচনা করা—এই মন নিয়েই তিনি রুনা লায়লার একটি কনসার্টে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে বদলে যায় তার ধারণা।
পরদিন নিজের পত্রিকায় লিখলেন এক বিস্ময়কর বাক্য—

রুনাকে দিয়ে দাও, বিনিময়ে ফারাক্কার সব পানি নিয়ে যাও।”

খুশবন্ত সিং আরও লিখেছিলেন—রুনার গান কেবল শোনার বিষয় নয়, দেখারও

এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। কণ্ঠ, মঞ্চনৈপুণ্য এবং ব্যক্তিত্ব মিলিয়ে উপমহাদেশের সংগীতমঞ্চে তিনি এক অনন্য শিল্পী।

কাশ্মীরে রুনা লায়লার মানবিকতা: একটি হাসপাতালের জন্ম

রুনা লায়লার জনপ্রিয়তা শুধু শিল্পী হিসেবে নয়, মানবিকতা হিসেবেও গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। ১৯৭৭ বা ১৯৭৮ সালের দিকে কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ নিজ হাতে তাকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন—শ্রীনগরে একটি হাসপাতালের জন্য তহবিল গঠনে একটি কনসার্ট করতে। কাশ্মীরে তখন কোনো বড় হাসপাতাল ছিল না; চিকিৎসার জন্য মানুষকে যেতে হতো চণ্ডীগড় বা দিল্লিতে।

রুনা লায়লা জবাবে লিখেছিলেন—

এত মানুষের উপকারে আসবে এমন কাজে গান গাইতে পারাটাই আমার সৌভাগ্য। আমি কোনো পারিশ্রমিক নেব না।”

তার উত্তরে শেখ আবদুল্লাহ আবেগভরা আরেকটি চিঠি পাঠান—
আপনি অন্য দেশের শিল্পী হয়েও আমাদের মানুষের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে গান করতে রাজি হয়েছেন। আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।”

রুনা লায়লা পরিবারসহ শ্রীনগর পৌঁছালে, বিমানবন্দরে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়ে তাকে গ্রহণ করা হয়। তার নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিল ১,৪০০ মাউন্টেন পুলিশ সদস্য। প্রথম দিন মিলনায়তনে এবং দ্বিতীয় দিন স্টেডিয়ামে বিশাল দুই কনসার্টে তিনি গান করেন। তহবিল সংগ্রহের অর্থেই শ্রীনগরে হাসপাতালটির ভিত্তি স্থাপন হয়।

আজও কলকাতায় কাশ্মীরি শাল বিক্রেতারা তাকে দেখলে বলেন—
আপনি আমাদের জন্য হাসপাতাল করে দিয়েছেন। আমরা আপনাকে দোয়া করি।”

রুনা লায়লা বলেন—
এটাই আমার জীবনের বড় পাওয়া।”

আজ রুনা লায়লার জন্মদিন

আজ, ১৭ নভেম্বর, কিংবদন্তি এই সংগীতশিল্পীর জন্মদিন। একসময় পাকিস্তানে শুরু হওয়া এক কণ্ঠের যাত্রা আজ বিশ্বজুড়ে শ্রদ্ধা, গৌরব আর ভালোবাসার প্রতীক। রুনা লায়লা শুধু একজন শিল্পী নন—তিনি এক ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক সম্পদ, উপমহাদেশের সংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

‘রুনাকে দাও, বিনিময়ে ফারাক্কার সব পানি নিয়ে যাও’—এক কিংবদন্তির অমলিন যাত্রা

Update Time : ০৪:৪৮:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

মাত্র বারো বছর বয়সে পাকিস্তানের ‘জুগনু’ সিনেমার একটি গানে কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে যে কিশোরী সংগীতপথে পা রেখেছিলেন, তিনি আজ বিশ্বের কোটি ভক্তের হৃদয়ে অমর এক নাম—রুনা লায়লা। পশ্চিম পাকিস্তানের নামকরা সংগীতজ্ঞরা এত অল্প বয়সেই তার প্রতিভায় বিস্মিত হয়েছিলেন। এর ফলস্বরূপ চলচ্চিত্রের গানে নিয়মিত হতে সময় লাগেনি রুনার। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন পশ্চিম পাকিস্তানের শ্রোতাপ্রিয়তম কণ্ঠগুলোর একটি।

স্বাধীনতার পর তিনি যখন নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখন পাকিস্তানে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। পাকিস্তান সরকারও চাইছিলেন তাকে যে করেই হোক ধরে রাখতে। কিন্তু জন্মভূমির টান, মানুষের ভালোবাসা এবং নিজের পরিচয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা—সবই তাকে ফিরিয়ে আনে ঢাকায়। জনপ্রিয়তা, প্রতিষ্ঠা, ক্যারিয়ারের বিশাল সম্ভাবনা—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

বাংলাদেশে তার সংগীত জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় সংগীত পরিচালক সত্য সাহার হাত ধরে। এরপর শুরু হয় চূড়ান্ত সাফল্যের যাত্রা। ‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ কিংবা ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’—সুরের জাদুতে তিনি জয় করে নেন পুরো উপমহাদেশকে।

উপমহাদেশের সংগীতমঞ্চে রুনার আলো

বিশ্বের এমন কোনো বড় শহর নেই, যেখানে রুনা লায়লার কণ্ঠে সুরের আলোর দীপ জ্বলে ওঠেনি। বাংলা, উর্দু, হিন্দিসহ মোট ১৮টি ভাষায় তিনি গেয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি গান—যা এক কণ্ঠশিল্পীর জন্য অবিশ্বাস্য অর্জন। তার মাধুর্যময় কণ্ঠ এমনকি কঠোর সমালোচকদেরও ভক্তে পরিণত করেছে।

এই তালিকায় ছিলেন ভারতের বিখ্যাত পত্রিকা ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া-এর সম্পাদক খুশবন্ত সিং। তিনি ছিলেন কঠোর সমালোচক, প্রশংসা করতে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তিত্ব। উদ্দেশ্য ছিল সমালোচনা করা—এই মন নিয়েই তিনি রুনা লায়লার একটি কনসার্টে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে বদলে যায় তার ধারণা।
পরদিন নিজের পত্রিকায় লিখলেন এক বিস্ময়কর বাক্য—

রুনাকে দিয়ে দাও, বিনিময়ে ফারাক্কার সব পানি নিয়ে যাও।”

খুশবন্ত সিং আরও লিখেছিলেন—রুনার গান কেবল শোনার বিষয় নয়, দেখারও

এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। কণ্ঠ, মঞ্চনৈপুণ্য এবং ব্যক্তিত্ব মিলিয়ে উপমহাদেশের সংগীতমঞ্চে তিনি এক অনন্য শিল্পী।

কাশ্মীরে রুনা লায়লার মানবিকতা: একটি হাসপাতালের জন্ম

রুনা লায়লার জনপ্রিয়তা শুধু শিল্পী হিসেবে নয়, মানবিকতা হিসেবেও গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে মানুষের হৃদয়ে। ১৯৭৭ বা ১৯৭৮ সালের দিকে কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ নিজ হাতে তাকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন—শ্রীনগরে একটি হাসপাতালের জন্য তহবিল গঠনে একটি কনসার্ট করতে। কাশ্মীরে তখন কোনো বড় হাসপাতাল ছিল না; চিকিৎসার জন্য মানুষকে যেতে হতো চণ্ডীগড় বা দিল্লিতে।

রুনা লায়লা জবাবে লিখেছিলেন—

এত মানুষের উপকারে আসবে এমন কাজে গান গাইতে পারাটাই আমার সৌভাগ্য। আমি কোনো পারিশ্রমিক নেব না।”

তার উত্তরে শেখ আবদুল্লাহ আবেগভরা আরেকটি চিঠি পাঠান—
আপনি অন্য দেশের শিল্পী হয়েও আমাদের মানুষের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে গান করতে রাজি হয়েছেন। আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।”

রুনা লায়লা পরিবারসহ শ্রীনগর পৌঁছালে, বিমানবন্দরে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়ে তাকে গ্রহণ করা হয়। তার নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিল ১,৪০০ মাউন্টেন পুলিশ সদস্য। প্রথম দিন মিলনায়তনে এবং দ্বিতীয় দিন স্টেডিয়ামে বিশাল দুই কনসার্টে তিনি গান করেন। তহবিল সংগ্রহের অর্থেই শ্রীনগরে হাসপাতালটির ভিত্তি স্থাপন হয়।

আজও কলকাতায় কাশ্মীরি শাল বিক্রেতারা তাকে দেখলে বলেন—
আপনি আমাদের জন্য হাসপাতাল করে দিয়েছেন। আমরা আপনাকে দোয়া করি।”

রুনা লায়লা বলেন—
এটাই আমার জীবনের বড় পাওয়া।”

আজ রুনা লায়লার জন্মদিন

আজ, ১৭ নভেম্বর, কিংবদন্তি এই সংগীতশিল্পীর জন্মদিন। একসময় পাকিস্তানে শুরু হওয়া এক কণ্ঠের যাত্রা আজ বিশ্বজুড়ে শ্রদ্ধা, গৌরব আর ভালোবাসার প্রতীক। রুনা লায়লা শুধু একজন শিল্পী নন—তিনি এক ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক সম্পদ, উপমহাদেশের সংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।