UPSC সাক্ষাৎকারে IAS প্রার্থীদের বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দিচ্ছেন দীপক ভোহারা?
- Update Time : ১০:২০:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৯৮ Time View

ছাত্রজীবন থেকেই চাকরির বিভিন্ন পরীক্ষা, বিসিএস, প্রশাসন এবং উচ্চপর্যায়ের চাকরির সাক্ষাৎকার দেখতে আমার আগ্রহ রয়েছে। এখনো সময় পেলেই ভারতের ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (UPSC) বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও মক ইন্টারভিউ দেখি। বিশেষ করে সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক ড. দীপক ভোহারার নেওয়া সাক্ষাৎকারগুলোও আমার নজরে এসেছে।
দীপক ভোহারা দীর্ঘদিন ভারতীয় পররাষ্ট্রসেবায় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিভিন্ন ইউপিএসসি মক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রার্থীদের সরাসরি ও চাপ সৃষ্টি করে প্রশ্ন করতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে তাঁর সাক্ষাৎকারের এমন একটি অংশও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি প্রার্থীকে সরাসরি উত্তর দিতে এবং ‘রাজনৈতিকভাবে সঠিক’ উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে বলেন।
সরাসরি প্রশ্ন করা বা কঠিন প্রশ্ন করা নিয়ে আপত্তির কিছু নেই। বরং একজন ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তার চিন্তাশক্তি, যুক্তি, তথ্যজ্ঞান এবং চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করতে কঠিন প্রশ্ন প্রয়োজন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সেই প্রশ্নগুলোর ধরন কেমন?
ভোহারার কিছু মক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ, ১৯৭১ সালে ভারতের ভূমিকা এবং বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব বিষয় একজন ভারতীয় সিভিল সার্ভিস প্রার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এতে সন্দেহ নেই।
কিন্তু কোনো দেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা আর সেই দেশ সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট নেতিবাচক ধারণা সামনে রেখে প্রশ্ন করা দুটি বিষয় এক নয়।
যদি কোনো সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন, হামলা বা হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগকে প্রশ্নের ভিত্তি করা হয়, তাহলে প্রার্থীর সামনে একই সঙ্গে ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য, প্রেক্ষাপট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতাও তুলে ধরা প্রয়োজন।
কারণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা দিয়ে একটি পুরো দেশ, একটি জাতি কিংবা কোটি কোটি মানুষকে বিচার করা যায় না।
বাংলাদেশে কোনো হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ নির্যাতনের শিকার হলে আমরা অবশ্যই তার নিন্দা করি এবং বিচার দাবি করি। সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য বাংলাদেশের সমাজকে কেবল সাম্প্রদায়িক সংঘাতের চশমা দিয়ে দেখলে দেশের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন হতে পারে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?
কিন্তু প্রশ্নের ধরন যদি এমন হয় যে বাংলাদেশ মানেই সংখ্যালঘু নির্যাতন তাহলে সেটি কি একজন ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে পূর্ণাঙ্গ বাংলাদেশ সম্পর্কে ধারণা দেবে?
এখানেই আমাদের উদ্বেগ।
ভারতের একজন ভবিষ্যৎ আইএএস কর্মকর্তা শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন পরিচালনা করবেন না। তাঁদের অনেকেই ভবিষ্যতে সীমান্ত, পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা দায়িত্বেও যুক্ত হতে পারেন।
তাই তাঁদের বাংলাদেশ সম্পর্কে জ্ঞান হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং বহুমাত্রিক।
বাংলাদেশের সমস্যা আছে—এ কথা বাংলাদেশ নিজেই অস্বীকার করে না। রাজনৈতিক সংঘাত, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতা এসব নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে।
কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়ন, অর্থনীতি, শিক্ষা, পোশাকশিল্প, নারীশিক্ষা, সামাজিক পরিবর্তন, ধর্মীয় সহাবস্থান, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং দুই দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের যোগাযোগও আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।
একজন ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তার সামনে একটি প্রতিবেশী দেশের সম্পূর্ণ ছবি থাকা দরকার—শুধু নেতিবাচক অংশ নয়।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ১৯৭১।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের জনগণ ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশের মানুষ সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করে না। কিন্তু ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক সহযোগিতাকে বর্তমান সময়ের প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আলোচনায় এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার বা জাতীয় স্বার্থকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।
কৃতজ্ঞতা থাকবে, ইতিহাসের প্রতি সম্মান থাকবে; কিন্তু সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক মর্যাদাও থাকবে।
বাংলাদেশ ভারতের কাছে কোনো অনুগত রাষ্ট্র নয়, আবার ভারতও বাংলাদেশের কাছে কোনো শত্রু রাষ্ট্র নয়। দুই দেশ প্রতিবেশী। দুই দেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রয়েছে। কোথাও সহযোগিতা হবে, কোথাও মতপার্থক্য হবে এটাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক বাস্তবতা।
তাই একজন ভারতীয় সিভিল সার্ভিস প্রার্থীকে যদি প্রশ্ন করা হয় ‘১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল, তাহলে বাংলাদেশ আজ ভারতের প্রতি যথেষ্ট কৃতজ্ঞ কি না?’—তাহলে পাল্টা প্রশ্নও হতে পারে:
রাষ্ট্রের সম্পর্ক কি কেবল কৃতজ্ঞতার ওপর পরিচালিত হয়, নাকি পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা, সার্বভৌমত্ব ও সম্মানের ওপর?
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক প্রশ্ন।
আমাদের উদ্বেগ কোনো ব্যক্তিকে আক্রমণ করা নয়। বরং প্রশ্নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রশাসকদের চিন্তাভাবনায় কী ধরনের কাঠামো তৈরি হচ্ছে সেটি নিয়ে।
একজন সাবেক কূটনীতিকের প্রশ্নের গুরুত্ব অবশ্যই বেশি। কারণ তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে তাঁর প্রশ্নে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে প্রার্থীর ওপর তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা দরকার।
কোনো একজন মক ইন্টারভিউয়ারের প্রশ্ন দেখে ভারতের সব আইএএস কর্মকর্তা বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সঠিক হবে না। ভারতের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত মত, সরকারি নীতি এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত একই বিষয় নয়।
কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়—
ভারতের ভবিষ্যৎ প্রশাসকদের কাছে বাংলাদেশকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে?
বাংলাদেশের ভুল থাকলে বলুন। সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে তদন্ত করুন। অপরাধ হলে বিচার দাবি করুন। ১৯৭১-এর ইতিহাস আলোচনা করুন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা সামাজিক দুর্বলতাও তুলে ধরুন।
কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তব উন্নয়ন, সাধারণ মানুষের জীবন, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কও তুলে ধরুন।
কারণ সমালোচনা সত্যকে আড়াল করার জন্য নয়; সত্যকে আরও স্পষ্ট করার জন্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশেরও একই দায়িত্ব রয়েছে। ভারতের সমাজ, রাষ্ট্র ও জনগণকে একপাক্ষিক দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। ভারতেও নানা মত, নানা ধর্ম, নানা ভাষা, নানা রাজনৈতিক অবস্থান ও নানা সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে।
দুই দেশের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন একে অপরকে ভয় দেখানো নয়, বরং একে অপরকে সঠিকভাবে বোঝা।
বন্ধুত্ব মানে অন্ধ সমর্থন নয়।
সমালোচনা মানে শত্রুতা নয়।
আর কূটনীতি মানে একপাক্ষিক গল্পও নয়।
আমাদের প্রত্যাশা ভারতের ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বাংলাদেশকে জানুন সম্পূর্ণ বাস্তবতায়। বাংলাদেশ যেমন তার ভুল স্বীকার করে এগিয়ে যাবে, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছ থেকেও আমরা প্রত্যাশা করি বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের ধারণা হবে তথ্যনির্ভর, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত।
কারণ আজকের একজন ইউপিএসসি প্রার্থীই আগামী দিনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
আজ তাঁর মনে প্রতিবেশী বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হবে, আগামী দিনে দায়িত্ব পালনের সময় সেই ধারণা কোনো না কোনোভাবে তাঁর চিন্তাভাবনায় প্রতিফলিত হতে পারে।
তাই প্রশ্ন থাকুক কঠিন প্রশ্নও থাকুক।
কিন্তু প্রশ্নের ভিত্তি হোক তথ্য, ইতিহাস ও বাস্তবতা; পূর্বধারণা নয়।



















