সময়: বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:২৪:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • / ৭০ Time View

 

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির সাফল্য দেশটির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে দলটি। অর্থনীতি, অভিবাসননীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের একাধিক শক্ত ঘাঁটিতে জয় পেয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা। বিশেষ করে টেক্সাস, কানসাস, আইওয়া, ওহাইও, নর্থ ক্যারোলাইনা ও দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় দলটির সাফল্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে যেসব অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা সিনেট নির্বাচনে জয় পায়নি, সেখানেও এবার পরিবর্তনের চিত্র দেখা গেছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্যের ফলে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে এসেছে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়বে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দল দুটির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সিনেটে রিপাবলিকানরা ৫৩টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। তখন ডেমোক্র্যাটদের জন্য দ্রুত এই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া কঠিন বলে মনে করা হয়েছিল। কারণ, ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বেশির ভাগ আসনই ছিল দুই দলের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিতে।

কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, অভিবাসননীতি এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।

ট্রাম্পের ইরানে সামরিক অভিযান এবং অভিবাসনবিরোধী অভিযানে ফেডারেল এজেন্টদের তৎপরতা নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়। মিনিয়াপোলিসে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের সময় দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে জনমতকে আরও প্রভাবিত করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়েও ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।

ট্রাম্পের দলীয় হস্তক্ষেপেও বিপত্তি

নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসের সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধের পর টিলিস অবসরের ঘোষণা দেন। তাঁর ছেড়ে দেওয়া আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক গভর্নর রয় কুপার জয়ী হন।

টেক্সাসেও দীর্ঘদিনের সিনেটর জন কর্নিনের পরিবর্তে অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছিলেন ট্রাম্প। দলীয় মনোনয়ন লড়াইয়ে কর্নিনের পরাজয়ের পর আসনটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো জয় পান বলে এপি জানিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন। এখন থেকে ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দেওয়া, প্রশাসনের কার্যক্রম তদন্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের বিষয়ে বাধা দেওয়ার মতো সাংবিধানিক ক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারবে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনকে আগামী দুই বছর কংগ্রেসের বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করে কাজ করতে হতে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ নীতি, অভিবাসন, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং বিচার বিভাগীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যার পরিবর্তন নয়; এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রতি মার্কিন ভোটারদের মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। তবে নির্বাচনের ফলাফলকে কোনো একটি ইস্যুর একক প্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, পররাষ্ট্রনীতি ও দলীয় রাজনীতির সম্মিলিত প্রভাব হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়

Update Time : ১১:২৪:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

 

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির সাফল্য দেশটির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে দলটি। অর্থনীতি, অভিবাসননীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের একাধিক শক্ত ঘাঁটিতে জয় পেয়েছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা। বিশেষ করে টেক্সাস, কানসাস, আইওয়া, ওহাইও, নর্থ ক্যারোলাইনা ও দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় দলটির সাফল্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে যেসব অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা সিনেট নির্বাচনে জয় পায়নি, সেখানেও এবার পরিবর্তনের চিত্র দেখা গেছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্যের ফলে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে এসেছে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়বে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দল দুটির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলেছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সিনেটে রিপাবলিকানরা ৫৩টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। তখন ডেমোক্র্যাটদের জন্য দ্রুত এই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া কঠিন বলে মনে করা হয়েছিল। কারণ, ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বেশির ভাগ আসনই ছিল দুই দলের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিতে।

কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, অভিবাসননীতি এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।

ট্রাম্পের ইরানে সামরিক অভিযান এবং অভিবাসনবিরোধী অভিযানে ফেডারেল এজেন্টদের তৎপরতা নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়। মিনিয়াপোলিসে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের সময় দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে জনমতকে আরও প্রভাবিত করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়েও ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।

ট্রাম্পের দলীয় হস্তক্ষেপেও বিপত্তি

নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসের সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধের পর টিলিস অবসরের ঘোষণা দেন। তাঁর ছেড়ে দেওয়া আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক গভর্নর রয় কুপার জয়ী হন।

টেক্সাসেও দীর্ঘদিনের সিনেটর জন কর্নিনের পরিবর্তে অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছিলেন ট্রাম্প। দলীয় মনোনয়ন লড়াইয়ে কর্নিনের পরাজয়ের পর আসনটি ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো জয় পান বলে এপি জানিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন। এখন থেকে ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দেওয়া, প্রশাসনের কার্যক্রম তদন্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের বিষয়ে বাধা দেওয়ার মতো সাংবিধানিক ক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারবে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনকে আগামী দুই বছর কংগ্রেসের বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করে কাজ করতে হতে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ নীতি, অভিবাসন, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং বিচার বিভাগীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যার পরিবর্তন নয়; এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রতি মার্কিন ভোটারদের মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। তবে নির্বাচনের ফলাফলকে কোনো একটি ইস্যুর একক প্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, পররাষ্ট্রনীতি ও দলীয় রাজনীতির সম্মিলিত প্রভাব হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।