হুতিদের হামলায় বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় সমীকরণ, বেশি চাপে সৌদি আরব
- Update Time : ০৫:৩২:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৫৮ Time View

ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধাদের ধারাবাহিক হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি জ্বালানি ডিপো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে শনিবার ভোরের দিকে সৌদি রাজধানী রিয়াদসহ জেদ্দা, তাইফ ও ইয়ানবু অঞ্চলে বিমান হামলার সতর্কসংকেতও বাজানো হয়।
হুতিরা দাবি করছে, ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক হামলার জবাব হিসেবেই সৌদি ভূখণ্ডে এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
মার্কিন সহায়তা নিয়ে সৌদির প্রত্যাশা
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পাশে সরাসরি সামরিকভাবে দাঁড়াবে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতীতেও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ায়নি। এবারও হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার পরিবর্তে ওয়াশিংটন রিয়াদকে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। দীর্ঘ সংঘাতের পর ইয়েমেনের পরিস্থিতিতে এই সমঝোতা নতুন একটি কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমঝোতার আওতায় হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবকে ঘিরে হুতিদের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সরাসরি সামরিক ভূমিকা সীমিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
আরব দেশ ও ইসরায়েলের গোপন বৈঠক
এদিকে জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব দেশগুলোর সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের উদ্যোগে আয়োজিত ওই বৈঠকে ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও মিসরের সামরিক কর্মকর্তারা অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক সামরিক সমন্বয় নিয়েই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক অগ্রগতি
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ইয়েমেনের দক্ষিণ হোদেইদা ও পশ্চিম তাইজ অঞ্চল থেকে হুতি বাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করেছে। গুরুত্বপূর্ণ বন্দর মোখা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের এলাকাকে কেন্দ্র করে তাদের সামরিক তৎপরতা বেড়েছে।
তবে এসব সামরিক অগ্রগতি ও হতাহতের পরিসংখ্যান মূলত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবি। হুতিবিরোধী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের পক্ষ থেকে শত শত যোদ্ধা নিহত এবং আরও অনেকে আহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হওয়ায় সেখানে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইসরায়েলের সহায়তা নিয়েও প্রশ্ন
এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েল উপসাগরীয় দেশগুলোকে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে সৌদি আরব ইতোমধ্যে ইয়েমেন সম্পর্কিত কিছু ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে উপসাগরীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, রিয়াদ ইসরায়েলকে তার নিরাপত্তার জন্য নির্ভরযোগ্য সামরিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে না।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা থেকে সরাসরি ইসরায়েলনির্ভর কোনো নিরাপত্তা কাঠামোয় যেতে আগ্রহী নয়।
লোহিত সাগর ও জ্বালানি সরবরাহে ঝুঁকি
হুতিদের সামরিক তৎপরতার অন্যতম বড় প্রভাব পড়তে পারে লোহিত সাগরের নৌপথে। এই পথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
লোহিত সাগরের নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে।
একজন ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের প্রতিরোধ করা বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা অনেক পক্ষের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।
সৌদি আরবকে অস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
সৌদি আরবকে সরাসরি যুদ্ধে সামরিকভাবে সহায়তা না করলেও যুক্তরাষ্ট্র দেশটির জন্য বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের জন্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজার জেডিএএম গাইডেন্স কিট এবং বিপুলসংখ্যক বোমা থাকার কথা বলা হয়েছে।
একই সময়ে ইসরায়েলের জন্যও কয়েক বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর অর্থ, ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দিলেও হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি নতুন একটি যুদ্ধ শুরু করার অবস্থান নিচ্ছে না।
যুদ্ধ থামানোর পথ কী?
হুতিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের অবরোধ ও সামরিক অভিযান বন্ধ করা হলে সংঘাত কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
হুতিদের জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বলেছেন, অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইয়েমেনিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করাই তাদের প্রধান দাবি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত এখন সৌদি আরবের হাতে।
হুতিদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ইয়েমেনের ওপর আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথে অবরোধের প্রতিক্রিয়াতেই তারা পাল্টা অবরোধ ও হামলার কৌশল নিয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে সমালোচনাকারী বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ইয়েমেন ও ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা রাখাই আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর অন্যতম উপায়।
বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় নিরাপত্তা সমীকরণ
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ওয়াশিংটন হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়।
অন্যদিকে ইসরায়েল আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রস্তাব দিলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ফলে সৌদি আরবকে একই সঙ্গে সামরিক নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো, নৌপথের সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
ইয়েমেনের সংঘাত কতটা দীর্ঘায়িত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অন্যান্য দেশ ভবিষ্যতে কী ধরনের অবস্থান নেয়—তার ওপরই মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী নিরাপত্তা সমীকরণের বড় অংশ নির্ভর করবে।
সূত্র: মিডলইস্ট আই

















