সারা জীবন মুসলিমের মতোই জীবন কাটিয়েছি, অথচ জানতাম না: ইসলাম গ্রহণের পর মার্কিন তরুণী
- Update Time : ০৪:৪০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ৪৪ Time View

ক্যাথলিক স্কুলে পড়াশোনা এবং বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে দীর্ঘদিন অনুসন্ধানের পর ইসলাম গ্রহণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক আদিবাসী তরুণী অ্যাঞ্জেলা। নেটিভ আমেরিকানদের একটি সংরক্ষিত এলাকায় বেড়ে ওঠা অ্যাঞ্জেলা জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি আধ্যাত্মিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। তাঁর দাদা-দাদি তাঁকে সৃষ্টিকর্তা, প্রার্থনা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে নানা শিক্ষা দিতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিজের বিশ্বাসের প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত ইসলামের শিক্ষার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের আত্মিক অনুসন্ধানের উত্তর।
‘আবাউট ইসলাম’কে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে নিজের ইসলাম গ্রহণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন অ্যাঞ্জেলা। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, কীভাবে শৈশবের আধ্যাত্মিক শিক্ষা, বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ এবং পবিত্র কোরআন পাঠ তাঁকে ইসলামের পথে নিয়ে এসেছে।
অ্যাঞ্জেলা বলেন, ‘আমার নাম অ্যাঞ্জেলা। সত্যি বলতে, ইসলামের পথে আমার যাত্রা ঠিক কখন বা কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা আমি নিজেও জানি না। আমি একজন আমেরিকান হিসেবে বেড়ে উঠেছি। আমার শৈশব কেটেছে একটি নেটিভ আমেরিকান সংরক্ষিত এলাকায়। আমরা ছিলাম অত্যন্ত আধ্যাত্মিক পরিবেশের মানুষ।’
শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, তাঁর দাদা-দাদি সব সময় সৃষ্টিকর্তার কথা বলতেন এবং তাঁকে নানা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গল্প শোনাতেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে তাঁকে অন্যান্য আদিবাসী শিশুর সঙ্গে একটি ক্যাথলিক আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় দুই বছর কাটালেও ক্যাথলিক ধর্মের শিক্ষা তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠেনি। বরং ওই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ক্যাথলিক ধর্মের সঙ্গে তাঁর বিশ্বাসের মিল নেই।
বড় হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে মানুষ তাঁকে ধর্ম সম্পর্কে জানতে চাইত। কিন্তু নিজের ধর্মীয় পরিচয় কী, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারতেন না অ্যাঞ্জেলা।
তিনি বলেন, ‘আমাদের জীবনযাপনের মধ্যেই আধ্যাত্মিকতা ছিল। আমরা দিনের বিভিন্ন সময়ে প্রার্থনা করতাম। আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলতেন, এমনভাবে জীবনযাপন করতে হবে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপই একটি প্রার্থনা। প্রতিটি কাজের মধ্যেই সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে হবে। কিন্তু আমাদের এই বিশ্বাসের কোনো নির্দিষ্ট নাম ছিল না।’
নিজের ধর্মীয় পরিচয় খুঁজতে একপর্যায়ে অ্যাঞ্জেলা বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন। যে ধর্ম সম্পর্কেই জানার সুযোগ পেয়েছেন, সেটি বোঝার চেষ্টা করেছেন। তবে বিভিন্ন ধর্মের মতবাদ সম্পর্কে জানতে গিয়ে তাঁর মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। অনেক বিষয় তাঁর কাছে অসংগতিপূর্ণ মনে হতো।
এমন সময় একজন মুসলিম ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁদের মধ্যে ধর্ম ও জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ওই ব্যক্তির ধর্মীয় অনুশীলনের সঙ্গে নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেয়ে বিস্মিত হন অ্যাঞ্জেলা।
তিনি বলেন, ‘আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, তুমি সত্যিই এসব করো? আমিও তো ছোটবেলা থেকে এমনটাই করে আসছি! এরপর ইসলাম সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহ তৈরি হয়। ইন্টারনেটে ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইসলামের অনেক শিক্ষাই আমার কাছে অত্যন্ত অর্থবহ মনে হতে থাকে। এর বেশির ভাগ বিষয়ই ছিল এমন, যা আমি ছোটবেলায় আমার দাদা-দাদির কাছ থেকে শুনেছি।’
ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়তে থাকলে একদিন একটি মুদি দোকানে বইয়ের একটি বিশেষ সংগ্রহের সন্ধান পান তিনি। সেখানে মানুষ পুরোনো বই জমা দিত এবং সেগুলো বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দাতব্য কাজে ব্যয় করা হতো। বইয়ের স্তূপের ওপরে ইসলামবিষয়ক কয়েকটি বই দেখে তিনি আনন্দিত হন।
অ্যাঞ্জেলা বলেন, ‘আমি পুরো স্তূপের বইগুলো কিনে বাড়িতে নিয়ে আসি। এরপর একে একে পড়তে শুরু করি। প্রতিটি বিষয়ই আমার কাছে অর্থবহ মনে হচ্ছিল। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিই, পবিত্র কোরআন পড়ব।’
কোরআন পাঠের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, প্রথম দিকে কিছুটা অস্বস্তি ও দ্বিধা কাজ করেছিল। কারণ, কোরআনের কিছু বিষয় তাঁর দাদা-দাদির কাছ থেকে শোনা বিশ্বাস ও ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছিল না। কিছু বিষয় তাঁর কাছে নতুন ও ভিন্ন মনে হয়েছিল। তবে তিনি পড়া বন্ধ করেননি। ধীরে ধীরে কোরআনের শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি আরও গভীর হতে থাকে।
একসময় তাঁর মনে হয়, যে জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মধ্যে তিনি ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠেছেন, ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে তার গভীর মিল রয়েছে। অথচ এত দিন তিনি বুঝতেই পারেননি, নিজের অনুসন্ধানের উত্তর আসলে কোথায়।
অ্যাঞ্জেলার ভাষায়, ‘আমি কোরআন পড়তে পড়তে একসময় উপলব্ধি করলাম, বাহ! আমি তো সারা জীবন ধরেই এসব করে আসছি। অথচ কখনো জানতামই না! ধীরে ধীরে সবকিছু আমার কাছে পরিষ্কার হতে শুরু করল। ইসলাম আমার কাছে অর্থবহ হয়ে উঠল। আর আজ আমি এখানে।’
অ্যাঞ্জেলার এই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে, ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে অনুসন্ধান, অধ্যয়ন ও উপলব্ধির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। তাঁর জীবনের গল্পে ফুটে উঠেছে, শৈশবের আধ্যাত্মিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানার চেষ্টা এবং পবিত্র কোরআন পাঠের মধ্য দিয়ে কীভাবে একজন মানুষ নিজের বিশ্বাসের পরিচয় খুঁজে পেতে পারেন।









