সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?
- Update Time : ০৫:০০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / ৫৫ Time View

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস বিশ্ব অর্থনীতির সামনে এক অস্বস্তিকর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গতকাল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর বিশ্ববাজারে সামগ্রিক পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য পরিবহনে বাধা এবং জলবায়ুর অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন হলো, এই মূল্যবৃদ্ধির বোঝা বহন করবে কে? দ্রব্যমূল্য বাড়লে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। উচ্চ আয়ের মানুষ ব্যয় সংকোচন করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন। মধ্যবিত্ত পরিবার সঞ্চয় ভেঙে কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কিছুদিন চলতে পারে। কিন্তু যাদের আয় সীমিত, যাদের প্রতিদিনের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে পরদিনের খাবার, তাদের সামনে বিকল্প কী? চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি কিংবা জ্বালানির দাম বাড়লে তারা প্রথমে খাবারের পরিমাণ কমান, পরে পুষ্টির সঙ্গে আপস করেন। একপর্যায়ে চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যয়ও কমাতে বাধ্য হন। মূল্যস্ফীতি তখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা থাকে না; মানুষের জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত হানে।
এই সংকটের আরও একটি বিপজ্জনক দিক রয়েছে। পণ্যের দাম বাড়ছে, অথচ সেই অনুপাতে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ছে না। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগে সতর্ক হয়, ব্যবসায়ীরা কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে পড়েন। অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি মন্থর হলে শ্রমজীবী মানুষের দরকষাকষির ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে আয় বৃদ্ধির অনিশ্চয়তা—এই দুইয়ের ব্যবধান ক্রমেই বাড়তে থাকে। মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বাজারে পণ্য থাকলেও তা কেনার সামর্থ্য সবার থাকে না।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জ্বালানির মূল্য ৩২ শতাংশ এবং ধাতুর মূল্য ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। চলতি বছর খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশের বেশি বাড়লে আগামী বছর আরও ৭ শতাংশ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ খাদ্যনিরাপত্তার ওপর চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হলে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি বাড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। শক্তিশালী এল নিনো, যুদ্ধের বিস্তার এবং সরবরাহব্যবস্থার বিপর্যয় একসঙ্গে ঘটলে দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি আরও বাড়বে। অতীতেও খাদ্যসংকটের কারণে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের গভীরে নিমজ্জিত হয়েছেন।
যদিও বিশ্বব্যাংক আগামী বছর সামগ্রিক পণ্যমূল্য ৭ শতাংশ কমার সম্ভাবনাও দেখিয়েছে, কিন্তু এই পূর্বাভাসকে স্বস্তির নিশ্চয়তা হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। কারণ, মূল্যবৃদ্ধির গতি কমা এবং পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া এক বিষয় নয়। মূল্যহ্রাসের পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলেও বর্তমান উচ্চমূল্য থেকে কতটা কমবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য ও জ্বালানির মতো অপরিহার্য পণ্যের দাম দীর্ঘদিন বেশি থাকলে নিম্ন আয়ের মানুষের সঞ্চয়, পুষ্টি ও জীবনযাত্রার ওপর তার দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সংকট আরও গভীর। বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতা, ঋণের বোঝা, আমদানি ব্যয় এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারের অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশের মতো দেশে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
এ অবস্থায় সরকারের দায়িত্ব কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ কিংবা মূল্যবৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও অতিরিক্ত মুনাফা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সাময়িক স্বস্তির ঘোষণা নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। যুদ্ধ বন্ধ, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বৈশ্বিক সংকটের অজুহাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সবচেয়ে বড় কথা, মূল্যবৃদ্ধির দায় যেন শুধু সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া না হয়। যাদের আয় সীমিত, যারা দিন এনে দিন খায়, যারা মাসের শেষে সংসারের হিসাব মেলাতে হিমশিম খায়, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আগামী দিনগুলো বিশ্বের মানুষের জন্য কতটা কঠিন হবে, তা নির্ভর করবে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির ওপর নয়, বরং প্রতিটি দেশ কতটা সময়োপযোগী ও কার্যকর প্রস্তুতি নিতে পারে তার ওপরও। বাংলাদেশের জন্যও এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন থেকেই যায়—বিশ্ববাজারের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত মোকাবিলায় আমরা কতটা প্রস্তুত? আর শেষ পর্যন্ত এই বোঝা বহন করবে কে—রাষ্ট্র, নাকি সেই চিরচেনা সাধারণ মানুষ?





