শতাধিক মুফতির যুক্ত বিবৃতি: ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন’ ইসলামী বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
- Update Time : ১১:৪৪:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৪৬ Time View

শতাধিক মুফতির যুক্ত বিবৃতি: ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন’ ইসলামী বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
কোরআন-সুন্নাহর আলোকে আইনটি পুনঃপর্যালোচনা ও বাতিলের দাবি
সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত সম্প্রতি অনুমোদিত একটি আইন ইসলামী বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের শতাধিক বিশিষ্ট মুফতি। এক যুক্ত বিবৃতিতে তাঁরা বলেছেন, আইনটির মাধ্যমে মুসলিমদের হেবা, মিরাস ও ওসিয়াতের প্রতিষ্ঠিত বিধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিবৃতিতে মুফতিগণ আইনটি অনতিবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান। একই সঙ্গে দেশের স্বীকৃত মুফতি, ইসলামি আইনবিশেষজ্ঞ, মুসলিম পারিবারিক আইনবিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট আলেমদের সমন্বয়ে এর বিস্তারিত শরিয়াহ পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে আইনটির নাম, অনুমোদনের তারিখ ও প্রকৃত বিধানসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য মূল সরবরাহকৃত বিবৃতির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রকাশের আগে সরকারি গেজেট ও আইনটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ যাচাই করা প্রয়োজন।
কোন বিধান নিয়ে আপত্তি?
বিবৃতিতে আলোচিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনকে ইংরেজিতে ‘Gift Reserving Life Usufruct’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে এমন একটি সম্পত্তি দানের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর করা যাবে; তবে দাতা জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
মুফতিদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর করলেও মৃত্যুর পর সম্পত্তির কার্যকর মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, এর ফলে ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় নির্ধারিত ওয়ারিশদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
হেবা, মিরাস ও ওসিয়াত নিয়ে মুফতিদের যুক্তি
বিবৃতিতে মুফতিগণ ইসলামী শরিয়াহর হেবা, মিরাস ও ওসিয়াতের বিধানের আলোকে তাঁদের আপত্তি তুলে ধরেছেন।
১. হেবা বা দানের বিধান
মুফতিদের মতে, হেবা হলো জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান করা। তবে কোনো ব্যক্তি যদি এমনভাবে সম্পত্তি দান করেন, যার মূল উদ্দেশ্য হয় মৃত্যুর পর নির্ধারিত ওয়ারিশদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, তাহলে বিষয়টি ইসলামী উত্তরাধিকার বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে।
তাঁরা বলেন, মিরাসের সম্পত্তিতে আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত ওয়ারিশদের অংশ রয়েছে। তাই উত্তরাধিকারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর করা শরিয়াহসম্মত নয়।
২. দান করা সম্পত্তি পুনরায় ভোগ বা ফেরত নেওয়া
বিবৃতিতে সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, দান করার পর সেই সম্পত্তি ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইসলামে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মুফতিগণ দান সম্পন্ন হওয়ার পর সম্পত্তির মালিকানা, দখল ও ভোগের অধিকার নিয়ে শরিয়াহর বিধান যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
৩. ওসিয়াতের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা
মুফতিদের বিবৃতিতে ওসিয়াতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—
- একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি ওসিয়াত করতে পারেন।
- নির্ধারিত ওয়ারিশের জন্য ওসিয়াতের বিষয়ে শরিয়াহর বিশেষ বিধান রয়েছে।
বিবৃতিতে উদ্ধৃত হাদিসের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারকে তাঁর প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছেন; অতএব কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়াত নেই।
মুফতিদের মতে, জীবদ্দশায় এমনভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করা, যাতে দাতার মৃত্যুর পর তা কার্যকর হয়, তা নামের দিক থেকে হেবা হলেও উদ্দেশ্য বিবেচনায় ওসিয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এ কারণে এর শরিয়াহগত বৈধতা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
সৌদি আরব ও আন্তর্জাতিক মুসলিম আলেমদের মতামতের উল্লেখ
বিবৃতিতে সৌদি আরবের আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ লিল-বুহূস আল-ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতার ১১০৮৭ নম্বর ফতোয়ার উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্স (IUMS) এবং দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। এসব উদ্ধৃতির মাধ্যমে সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং কোনো উত্তরাধিকারীর অধিকার ক্ষুণ্ন না করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।
দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়ার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ওয়ারিশদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সব সম্পত্তি হেবা করে দেওয়া গুনাহের কাজ।
তবে সংশ্লিষ্ট ফতোয়াগুলোর পূর্ণাঙ্গ মূল পাঠ, প্রযোজ্য পরিস্থিতি ও নম্বর যাচাই করে প্রকাশ করা উচিত। কারণ ফতোয়ার নির্দিষ্ট বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে সম্পত্তির ধরন, দানের শর্ত, দখল হস্তান্তর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মুফতি আব্দুল মালেকের ফতোয়ার উল্লেখ
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফতোয়া চাওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাইতুল মোকাররমের খতিব আল্লামা মুফতি আব্দুল মালেক ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটি ফতোয়া প্রদান করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে তাঁর নামে যে বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, তার সারকথা হলো—
উত্তরাধিকার বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে হেবা
যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত উত্তরাধিকার বিধান এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি হেবা করেন, তাহলে এমন হেবা শরিয়াহর দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়—এমন মতামত বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে।
মৃত্যুর পর কার্যকর হেবা ও ওসিয়াত
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, কেউ জীবদ্দশায় এমনভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করেন যে তা তাঁর মৃত্যুর পর কার্যকর হবে, তাহলে নাম হেবা হলেও উদ্দেশ্য বিবেচনায় সেটি ওসিয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এক্ষেত্রে ওয়ারিশের জন্য ওসিয়াতের বিধান প্রযোজ্য হবে বলে মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সব প্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ স্বেচ্ছায় সন্তুষ্টচিত্তে তা বাস্তবায়ন করলে ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলেও বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
আইনটি পুনঃপর্যালোচনার দাবি
মুফতিগণ মনে করেন, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মুসলিম হওয়ায় মুসলিম নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ইসলামী বিধানের গুরুত্ব রয়েছে।
তাঁদের মতে, হেবা, মিরাস ও ওসিয়াত ইসলামী আইনের তিনটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা। সম্পত্তি দানসংক্রান্ত নতুন কোনো আইন প্রণয়নের সময় এই তিন ব্যবস্থার সীমারেখা ও শর্তগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তাই তাঁরা আইনটির বিস্তারিত শরিয়াহ পর্যালোচনার জন্য দেশের স্বীকৃত মুফতি, ইসলামি আইনবিশেষজ্ঞ, মুসলিম পারিবারিক আইনবিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট আলেমদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকারের প্রতি জোর দাবি
যুক্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইনটি যেহেতু কোরআন-সুন্নাহর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মুফতিগণ মনে করছেন, তাই এটি বাতিল করা উচিত।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সরকারের উচিত ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, পারিবারিক সম্পত্তির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং শরিয়াহ নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি পুনঃপর্যালোচনা করা।
মুফতিগণ সরকারের প্রতি অনতিবিলম্বে আইনটি বাতিলের দাবি জানান এবং বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থান প্রকাশ করেন।
শতাধিক মুফতির স্বাক্ষর
বিবৃতিতে বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ড, সম্মিলিত উলামা, বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন, মাদরাসা, মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বহু মুফতি ও আলেমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন—
- মুফতি মাওলানা আবু তাহের জিহাদী
- অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন
- ড. মুফতি মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী
- মুফতি আবু জাফর কাসেমী
- ড. মুফতি মাওলানা আব্দুস সামাদ
- অধ্যক্ষ ড. সামিউল হক ফারুকী
- মুফতি আলী হাসান ওসামা
- মুফতি নুরুজ্জামান নোমানী
- মুফতি শফিকুল ইসলাম বিন বাহাউদ্দিন
- মুফতি আবু দাউদ জাকারিয়া
- মুফতি আবুল কাশেম গাজী
- মুফতি আব্দুল আউয়াল
- মুফতি মুজিবুর রহমান হামিদী
- মুফতি সুলতান মহিউদ্দীন
- মুফতি বরকত উল্লাহ আনসারী
- মুফতি ফখরুল ইসলাম
- মুফতি আবুল কাশেম কাসেমী
- মুফতি কবির আজহারী
- মুফতি ইসমাইল হোসাইন
- মুফতি ফয়জুল্লাহ আশরাফী
- মুফতি মাওলানা শাহ আরিফ বিল্লাহ সিদ্দিকী
- মুফতি ফয়জুল হক জালালাবাদী
- মুফতি সরফুল ইসলাম
- মুফতি ড. জাকারিয়া নূর
- মুফতি লুৎফর রহমান
- মুফতি ইব্রাহিম খলিল
- অধ্যক্ষ মুফতি মিজানুর রহমান
- অধ্যাপক মুফতি শফিকুল ইসলাম
- মুফতি আব্দুল কুদ্দুস
- মুফতি অধ্যক্ষ রাহমাতুল্লাহ
- মুফতি অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী
- মুফতি মোস্তাফিজুর রহমান
- মুফতি জাহিদুর রহমান
- পীর মুফতি মাওলানা শরীফ হোসাইন
- মুফতি মাওলানা আজিজুর রহমান আজিজ
- মুফতি আল্লামা মুস্তাক আহমাদ
- মুফতি মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক কাসেমী
- মুফতি মাওলানা কামরুল ইসলাম সাঈদ আনসারী
- মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার
- মুফতি ড. আব্দুল কাইউম আল আযহারী
- মুফতি মাওলানা ফখরুদ্দীন আহমাদ
- মুফতি মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালী
- মুফতি ড. কামরুল হাসান শাহীন
- মুফতি ড. সাইফুল ইসলাম রফিক
- মুফতি মাওলানা মাউদুর রহমান
- মুফতি মাহবুবুর রহমান
- মাওলানা সাদিকুর রহমান আজহারী
- মুফতি নূরুল আমিন গোপালগঞ্জী
- মুফতি মাওলানা আবদুল বাকি
- হাফেজ মুফতি আবুল কাসেম
- মুফতি ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন আযহারী
- মুফতি মাওলানা ইরশাদুল্লাহ আযহারী
- মুফতি মাওলানা আবু নাঈম
- মুফতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
- মুফতি মাওলানা সাদিক মুহাম্মাদ ইয়াকুব আল আযহারী
এ ছাড়া আরও বহু আলেম ও মুফতি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানানো হয়েছে।
উপসংহার
সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত নতুন আইন নিয়ে শতাধিক মুফতির এই যুক্ত বিবৃতি দেশের ধর্মীয় ও আইনগত অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মুফতিদের দাবি, মুসলিম নাগরিকদের সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ইসলামী বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে, আইনটির প্রকৃত বিধান, কার্যকারিতা ও শরিয়াহগত অবস্থান নির্ধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ আইনগত ও ধর্মীয় পর্যালোচনা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতামত, সরকারি নথি এবং সংশ্লিষ্ট ফতোয়ার মূল পাঠ যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: দৈনিক সংগ্রাম














