Advertisement
সময়: বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতি হিসেবে আমরা কি স্বৈরাচারী শাসনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি?প্রথম পর্ব

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১২:৪৪:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ৯০ Time View

 

প্রথম পর্ব | ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু শাসনের সংস্কৃতি কি বদলায়?

একটি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাস শুধু ক্ষমতায় কে এলেন আর কে চলে গেলেন—তার হিসাব নয়। একটি জাতির প্রকৃত রাজনৈতিক পরিচয় বোঝা যায়, সেই জাতি ক্ষমতাকে কীভাবে দেখে, নাগরিক অধিকারকে কতটা মূল্য দেয় এবং শাসকের কাছে কতটা জবাবদিহি দাবি করে—তার মধ্য দিয়ে।

তাই আজ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে রাখা প্রয়োজন—জাতি হিসেবে আমরা কি স্বৈরাচারী শাসনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি?

প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল বা সময়কে কেন্দ্র করে নয়। বরং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে। কারণ একজন স্বৈরশাসক চলে গেলেই স্বৈরাচার শেষ হয়ে যায় না। যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে, যদি ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, যদি রাজনৈতিক আনুগত্য যোগ্যতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং যদি জনগণ ধীরে ধীরে অন্যায়কে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেয়—তাহলে স্বৈরাচারের সংস্কৃতি টিকে থাকে।

স্বৈরাচার শুধু একজন শাসকের নাম নয়

আমরা অনেক সময় স্বৈরাচার বলতে একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে বুঝি। কিন্তু বাস্তবে স্বৈরাচার একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিও হতে পারে।

যেখানে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মনে করে—তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না, বিরোধী মত মানেই শত্রুতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা যায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা যায় এবং জনগণের মতামতের চেয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ—সেখানেই স্বৈরাচারী প্রবণতা তৈরি হয়।

আর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে বসবাস করলে মানুষ একসময় সেটিকে স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করতে পারে।

আমরা কেন নীরব হয়ে যাই?

একজন সাধারণ মানুষ তার জীবিকা, পরিবার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। ফলে রাজনৈতিক অন্যায় দেখলেও অনেকে বলেন—‘আমি এসবের মধ্যে নেই।’

এই নীরবতা সাময়িকভাবে ব্যক্তিকে নিরাপদ রাখতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিকে দুর্বল করে।

কারণ একটি সমাজে যখন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, তখন অন্যায় করার সুযোগ আরও বাড়ে।

তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। নাগরিকরা যখন শান্তিপূর্ণভাবে প্রশ্ন করতে শেখেন, তথ্য জানতে চান, ভোটাধিকার ও আইনের শাসনের গুরুত্ব বোঝেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার দাবি করেন, তখন ক্ষমতার ওপর একটি স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।

ক্ষমতা বদলালেই কি পরিবর্তন আসে?

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি।

একটি সরকার পরিবর্তিত হলো, নতুন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলো—কিন্তু যদি নতুন সরকারও আগের সরকারের মতো বিরোধী মতকে দমন করে, প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সমালোচনাকে সহ্য না করে, তাহলে পরিবর্তন কতটা অর্থবহ?

তখন শুধু ক্ষমতার মুখ বদলায়, শাসনের চরিত্র বদলায় না।

সুতরাং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য শুধু নির্বাচন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দায়িত্বশীল প্রশাসন, মুক্ত গণমাধ্যম, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা।

স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় সহযোগী—অভ্যাস

স্বৈরাচার সবসময় বন্দুক বা শক্তি দিয়ে টিকে থাকে না। কখনো কখনো এটি মানুষের অভ্যাসের ওপরও নির্ভর করে।

যখন মানুষ ভাবতে শুরু করে—‘এখানে প্রশ্ন করে লাভ কী?’, ‘সব সরকারই তো একই’, ‘ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে কথা বলে কী হবে?’—তখন গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হতে থাকে।

একটি জাতির জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত তখনই, যখন অন্যায় আর মানুষকে বিস্মিত করে না।

কারণ অন্যায়কে যখন স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে, তখন প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

আমাদের কি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি দরকার?

অবশ্যই।

আমাদের এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি দরকার, যেখানে ক্ষমতাসীন দল যেমন প্রশ্নের মুখোমুখি হবে, বিরোধী দলও তেমনি জবাবদিহির বাইরে থাকবে না।

যেখানে রাষ্ট্র কোনো দলের নয়—রাষ্ট্র জনগণের।

যেখানে একজন সাংবাদিক সরকারের প্রশংসা করলে যেমন তার স্বাধীনতা থাকবে, তেমনি সমালোচনা করলেও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।

যেখানে একজন নাগরিক তার পছন্দের রাজনৈতিক মত প্রকাশ করার কারণে বৈষম্যের শিকার হবেন না।

যেখানে প্রশাসন ব্যক্তি বা দলের নির্দেশে নয়, আইন ও সংবিধানের ভিত্তিতে কাজ করবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়

আজ আমরা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করছি, আগামী প্রজন্ম তার মধ্যেই বড় হবে।

আমরা যদি তাদের শেখাই যে ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা যাবে না, তাহলে তারা জবাবদিহিহীনতাকে স্বাভাবিক ভাববে।

আর যদি আমরা শেখাই যে রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, আইন সবার জন্য সমান এবং ক্ষমতাসীনদেরও প্রশ্ন করা যায়—তাহলে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

শেষ কথা

জাতি হিসেবে আমরা কি স্বৈরাচারী শাসনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে পাওয়ার নয়। উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের নিজেদের মধ্যেও।

আমরা কি অন্যায়ের প্রতিবাদ করি?
আমরা কি ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করি?
আমরা কি ভিন্নমতকে সম্মান করি?
আমরা কি দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে মূল্য দিই?
আমরা কি চাই—আমাদের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় থাকুক, নাকি চাই যে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সে জবাবদিহির মধ্যে থাকুক?

গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা তখনই হয়, যখন আমরা শুধু নিজের পছন্দের মানুষের স্বাধীনতা নয়, নিজের অপছন্দের মানুষের স্বাধীনতাকেও রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকি।

ক্ষমতা পরিবর্তন হতে পারে একদিনে। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে সময় লাগে।

আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে একটি প্রশ্ন দিয়ে—

আমরা কি সত্যিই স্বাধীন নাগরিক হতে চাই, নাকি শুধু নতুন একজন শাসকের অধীনে পুরোনো অভ্যাস নিয়েই বাঁচতে চাই?

চলবে…

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

জাতি হিসেবে আমরা কি স্বৈরাচারী শাসনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি?প্রথম পর্ব

Update Time : ১২:৪৪:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

প্রথম পর্ব | ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু শাসনের সংস্কৃতি কি বদলায়?

একটি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাস শুধু ক্ষমতায় কে এলেন আর কে চলে গেলেন—তার হিসাব নয়। একটি জাতির প্রকৃত রাজনৈতিক পরিচয় বোঝা যায়, সেই জাতি ক্ষমতাকে কীভাবে দেখে, নাগরিক অধিকারকে কতটা মূল্য দেয় এবং শাসকের কাছে কতটা জবাবদিহি দাবি করে—তার মধ্য দিয়ে।

তাই আজ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে রাখা প্রয়োজন—জাতি হিসেবে আমরা কি স্বৈরাচারী শাসনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি?

প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল বা সময়কে কেন্দ্র করে নয়। বরং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে। কারণ একজন স্বৈরশাসক চলে গেলেই স্বৈরাচার শেষ হয়ে যায় না। যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকে, যদি ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, যদি রাজনৈতিক আনুগত্য যোগ্যতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং যদি জনগণ ধীরে ধীরে অন্যায়কে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেয়—তাহলে স্বৈরাচারের সংস্কৃতি টিকে থাকে।

স্বৈরাচার শুধু একজন শাসকের নাম নয়

আমরা অনেক সময় স্বৈরাচার বলতে একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে বুঝি। কিন্তু বাস্তবে স্বৈরাচার একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিও হতে পারে।

যেখানে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মনে করে—তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না, বিরোধী মত মানেই শত্রুতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা যায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা যায় এবং জনগণের মতামতের চেয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ—সেখানেই স্বৈরাচারী প্রবণতা তৈরি হয়।

আর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে বসবাস করলে মানুষ একসময় সেটিকে স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করতে পারে।

আমরা কেন নীরব হয়ে যাই?

একজন সাধারণ মানুষ তার জীবিকা, পরিবার, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। ফলে রাজনৈতিক অন্যায় দেখলেও অনেকে বলেন—‘আমি এসবের মধ্যে নেই।’

এই নীরবতা সাময়িকভাবে ব্যক্তিকে নিরাপদ রাখতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিকে দুর্বল করে।

কারণ একটি সমাজে যখন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, তখন অন্যায় করার সুযোগ আরও বাড়ে।

তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। নাগরিকরা যখন শান্তিপূর্ণভাবে প্রশ্ন করতে শেখেন, তথ্য জানতে চান, ভোটাধিকার ও আইনের শাসনের গুরুত্ব বোঝেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার দাবি করেন, তখন ক্ষমতার ওপর একটি স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়।

ক্ষমতা বদলালেই কি পরিবর্তন আসে?

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি।

একটি সরকার পরিবর্তিত হলো, নতুন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলো—কিন্তু যদি নতুন সরকারও আগের সরকারের মতো বিরোধী মতকে দমন করে, প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সমালোচনাকে সহ্য না করে, তাহলে পরিবর্তন কতটা অর্থবহ?

তখন শুধু ক্ষমতার মুখ বদলায়, শাসনের চরিত্র বদলায় না।

সুতরাং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য শুধু নির্বাচন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দায়িত্বশীল প্রশাসন, মুক্ত গণমাধ্যম, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা।

স্বৈরাচারের সবচেয়ে বড় সহযোগী—অভ্যাস

স্বৈরাচার সবসময় বন্দুক বা শক্তি দিয়ে টিকে থাকে না। কখনো কখনো এটি মানুষের অভ্যাসের ওপরও নির্ভর করে।

যখন মানুষ ভাবতে শুরু করে—‘এখানে প্রশ্ন করে লাভ কী?’, ‘সব সরকারই তো একই’, ‘ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে কথা বলে কী হবে?’—তখন গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হতে থাকে।

একটি জাতির জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত তখনই, যখন অন্যায় আর মানুষকে বিস্মিত করে না।

কারণ অন্যায়কে যখন স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে, তখন প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

আমাদের কি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি দরকার?

অবশ্যই।

আমাদের এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি দরকার, যেখানে ক্ষমতাসীন দল যেমন প্রশ্নের মুখোমুখি হবে, বিরোধী দলও তেমনি জবাবদিহির বাইরে থাকবে না।

যেখানে রাষ্ট্র কোনো দলের নয়—রাষ্ট্র জনগণের।

যেখানে একজন সাংবাদিক সরকারের প্রশংসা করলে যেমন তার স্বাধীনতা থাকবে, তেমনি সমালোচনা করলেও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।

যেখানে একজন নাগরিক তার পছন্দের রাজনৈতিক মত প্রকাশ করার কারণে বৈষম্যের শিকার হবেন না।

যেখানে প্রশাসন ব্যক্তি বা দলের নির্দেশে নয়, আইন ও সংবিধানের ভিত্তিতে কাজ করবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়

আজ আমরা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করছি, আগামী প্রজন্ম তার মধ্যেই বড় হবে।

আমরা যদি তাদের শেখাই যে ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা যাবে না, তাহলে তারা জবাবদিহিহীনতাকে স্বাভাবিক ভাববে।

আর যদি আমরা শেখাই যে রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, আইন সবার জন্য সমান এবং ক্ষমতাসীনদেরও প্রশ্ন করা যায়—তাহলে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

শেষ কথা

জাতি হিসেবে আমরা কি স্বৈরাচারী শাসনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে পাওয়ার নয়। উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের নিজেদের মধ্যেও।

আমরা কি অন্যায়ের প্রতিবাদ করি?
আমরা কি ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করি?
আমরা কি ভিন্নমতকে সম্মান করি?
আমরা কি দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে মূল্য দিই?
আমরা কি চাই—আমাদের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় থাকুক, নাকি চাই যে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সে জবাবদিহির মধ্যে থাকুক?

গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা তখনই হয়, যখন আমরা শুধু নিজের পছন্দের মানুষের স্বাধীনতা নয়, নিজের অপছন্দের মানুষের স্বাধীনতাকেও রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকি।

ক্ষমতা পরিবর্তন হতে পারে একদিনে। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে সময় লাগে।

আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে একটি প্রশ্ন দিয়ে—

আমরা কি সত্যিই স্বাধীন নাগরিক হতে চাই, নাকি শুধু নতুন একজন শাসকের অধীনে পুরোনো অভ্যাস নিয়েই বাঁচতে চাই?

চলবে…