উপদেষ্টাদের বিদেশে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে বিতর্ক
- Update Time : ১২:৪৪:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
- / ১১৬ Time View

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা মাত্র আঠারো মাস দায়িত্ব পালন করলেও এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই চিকিৎসা ব্যয় বাবদ সরকারের কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন একাই চিকিৎসা বাবদ নিয়েছেন ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকা।
হৃদরোগে আক্রান্ত খালিদ হোসেন সরকারের অনুমোদন নিয়ে গত বছরের শেষ দিকে এবং চলতি বছরের প্রথম দিকে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে যান। সেখানে তিনি অস্ত্রোপচারও করান। প্রথম দফায় তাঁর সঙ্গে একজন চিকিৎসক ছিলেন, আর দ্বিতীয় দফায় ছিলেন তাঁর মেয়ে ও জামাতা।
খালিদ হোসেন জানিয়েছেন, তিনি সরকারের অনুমোদন নিয়েই চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। তবে অস্ত্রোপচারের পরও তাঁর শারীরিক জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। বর্তমানে আবারও চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে তিনি বিদেশে যেতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন।
এই ঘটনা সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়, রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যবহার এবং জনস্বার্থে ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবছর চিকিৎসাসেবার আশায় লাখ লাখ বাংলাদেশি দেশের বাইরে পাড়ি জমান। ২০২৪ সালের আগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ভারতে চিকিৎসার জন্যই বছরে ১৫ থেকে ১৭ লাখ বাংলাদেশি যেতেন। পরবর্তী সময়ে নানা কারণে পরিস্থিতির কিছু পরিবর্তন হলেও উন্নত চিকিৎসার প্রত্যাশায় এখনও বিপুলসংখ্যক রোগী ভারতমুখী হচ্ছেন। ভারতের পাশাপাশি থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরও বাংলাদেশিদের চিকিৎসা গন্তব্য হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়, যেখানে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে যান।
এই প্রেক্ষাপটে ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, দেশের স্বাস্থ্য খাতের এই চিত্র কি অতীতের সরকারগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতার প্রতিফলন কিনা। জবাবে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা রয়েছে।
খালিদ হোসেন বলেন, “নিশ্চয়ই ব্যর্থতা রয়েছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা একটি বিশ্বমানের হাসপাতাল গড়ে তুলতে পারিনি। আমরা কেন মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মতো একটি হাসপাতাল তৈরি করতে পারলাম না? দেশে যখন হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুট হয়, বিদেশে পাচার হয়, তখন সেই অর্থের সামান্য অংশও যদি স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে হয়তো আজ আমাদের নাগরিকদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে ছুটতে হতো না।”
নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, “চিকিৎসা নিতে গিয়ে আমার নিজেরও অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে। দেশে যদি প্রয়োজনীয় ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে কেউ কি বিদেশে যেতে চাইত? এটি কোনো প্রমোদ ভ্রমণ নয়; এটি মানুষের জীবনের প্রয়োজন, সুস্থ হওয়ার সংগ্রাম।”
খালিদ হোসেনের এই বক্তব্য আবারও দেশের স্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বমানের চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে বিদেশমুখী চিকিৎসা প্রবণতা কমবে না, বরং প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যেতে থাকবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন আ ফ ম খালিদ হোসেন। তাঁর কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল—যখন দেশের লাখ লাখ মানুষ উন্নত চিকিৎসার অভাবে বিদেশমুখী, তখন উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি কেন জোরালোভাবে প্রশ্ন তোলেননি?
এ প্রশ্নের জবাবও ছিল তাঁর কাছে প্রস্তুত। তিনি বলেন, উপদেষ্টা বা মন্ত্রীরা চাইলেই সব কিছু করতে পারেন না। প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক সময় নীতি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর ভাষায়, “ইচ্ছা থাকলেই এখানে সব কিছু করা যায় না। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৬ জন উপদেষ্টাকে নিয়ে। পরবর্তী সময়ে বিশেষ সহকারী ও বিভিন্ন পদে আরও কয়েকজনকে যুক্ত করা হয়। আঠারো মাসের এই শাসনামলে সরকারের একাধিক উপদেষ্টা চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেছেন এবং সরকারি অর্থে চিকিৎসা বিল গ্রহণ করেছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে চিকিৎসা ব্যয় গ্রহণকারীদের তালিকায় রয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানসহ আরও কয়েকজন।
এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তারাও যদি উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে বাধ্য হন, তবে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত অবস্থা কতটা উদ্বেগজনক? একই সঙ্গে এটি দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো, বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ সংকট নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আঠারো মাসের দায়িত্বকালে বিদেশে চিকিৎসা বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে নিয়েছেন ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ২২৯ টাকা। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে বিদেশে চিকিৎসা খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়। এই তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছেন সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন, যিনি চিকিৎসা বাবদ নিয়েছেন ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকা।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি। তিনি ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন।
বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। দায়িত্ব পালনের একপর্যায়ে আমার শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। দেশে দীর্ঘ সময় ধরে রোগটি সঠিকভাবে শনাক্তই করা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সরকারের অনুমোদন নিয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা গ্রহণ করি। সেখানে আমাকে তিন দফা চিকিৎসা নিতে হয়েছে।”
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের এই বক্তব্য দেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি গভীর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরাও যখন জটিল রোগের সঠিক নির্ণয় ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন, তখন সাধারণ নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা ও সংকটের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে এটি দেশের বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা, আধুনিক রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি এবং বিশ্বমানের হাসপাতাল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে সামনে এনে দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। এই বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। তবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে—এটি দেশের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় কতটা পর্যাপ্ত এবং স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করতে কতটা সক্ষম।
বাস্তবতা হলো, প্রতিবছর উন্নত চিকিৎসার আশায় লাখ লাখ বাংলাদেশি ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। এর ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আধুনিক হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবই এ প্রবণতার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের হিসাবও সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন এবং অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের পর বিদেশে চিকিৎসা বাবদ তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, যিনি নিয়েছেন ৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৪৪ টাকা।
এ ছাড়া সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিয়েছেন ৭ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৯ টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান নিয়েছেন ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৫ টাকা, ভূমি উপদেষ্টা হাসান আরিফ নিয়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ২১৬ টাকা, শিক্ষা উপদেষ্টা ড. এম আমিনুল ইসলাম নিয়েছেন ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৯ টাকা এবং খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার নিয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ১৩৪ টাকা।
এই পরিসংখ্যান শুধু কয়েকজন উপদেষ্টার চিকিৎসা ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি বড় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরাও যখন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন, তখন সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশমুখী চিকিৎসা নির্ভরতা কমাতে হলে দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, বিশ্বমানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক রোগ নির্ণয় ও বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
এ ছাড়া বিদেশে চিকিৎসা বাবদ পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ নিয়েছেন ৬৭ হাজার ৩৬৭ টাকা। শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান নিয়েছেন ৩১ হাজার ৫২ টাকা। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান নিয়েছেন ২১ হাজার ৮০০ টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা শেখ মইনউদ্দিন চিকিৎসা ব্যয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন ৪ হাজার ১৬০ টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টার এই চিকিৎসা ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের পর সরকারি অর্থে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের নীতিমালা এবং এর যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এসব তথ্য সামনে এসেছে, যখন দেশের সাধারণ মানুষ উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং বিদেশমুখী চিকিৎসা নির্ভরতার কারণে নানা সংকটে রয়েছেন।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার ব্যক্তি অসুস্থ হলে সরকার তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারে। বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলে এবং দেশে উপযুক্ত চিকিৎসার সুযোগ না থাকলে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সরকারি অর্থে চিকিৎসা ব্যয় বহনের এই সুযোগ কোনো মাসিক বা বার্ষিক চিকিৎসা ভাতা নয় এবং এটি ব্যক্তিগত সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হওয়ারও সুযোগ নেই। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন, যৌক্তিকতা এবং নির্ধারিত বিধি-বিধানের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি নীতিমালার আওতায় বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ বৈধ হলেও, এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরাও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে দেশের স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং বিশ্বমানের চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থতার বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম-কানুন ও আর্থিক বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সরকারি অর্থে চিকিৎসা ব্যয় গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই অসুস্থতার প্রমাণ, চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র এবং প্রয়োজনীয় বিল-ভাউচার দাখিল করতে হয়। এসব নথি যাচাই-বাছাইয়ের পরই সরকার চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ করে থাকে।
তিনি আরও বলেন, “যদি এমন হয়ে থাকে যে কেউ সরকারি অর্থ গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তার বিপরীতে কোনো বিল-ভাউচার বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়নি, তাহলে বিষয়টি নিঃসন্দেহে নিয়মবহির্ভূত। সে ক্ষেত্রে যিনি অর্থ গ্রহণ করেছেন, তিনি যেমন দায় এড়াতে পারেন না, তেমনি যারা ওই অর্থ অনুমোদন করেছেন বা ছাড় করেছেন, তারাও অনিয়মের দায় থেকে মুক্ত নন।”
ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, বিষয়টি শুধু আর্থিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও সুশাসনের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই পুরো ঘটনার একটি সুনির্দিষ্ট, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, “এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায় নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কী প্রক্রিয়ায় অর্থ ছাড় করা হয়েছে, কোন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছে এবং আর্থিক বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা জরুরি।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকার স্বচ্ছতা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নথিভিত্তিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, “বিল-ভাউচার ছাড়া কীভাবে সরকারি অর্থ ছাড় করা হলো, তা অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। কারণ সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার হিসাব জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় থাকা উচিত।”
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের চিকিৎসা ব্যয় বহনের বিধান আইনসম্মত হলেও, সেই ব্যয় যদি যথাযথ প্রক্রিয়া ও প্রমাণপত্র ছাড়া পরিশোধ করা হয়ে থাকে, তাহলে তা জনআস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। ফলে এই ধরনের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তই পারে জনমনে থাকা প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে।




















