তুমি ভাঙনের খেলা খেলতে জানো, গড়তে জানো না: আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল কি সমাধান?
- Update Time : ০৬:১৩:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
- / ১৩৫ Time View

একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ভুল ধরিয়ে দেওয়া নয়, সমাধানের পথও তৈরি করা। কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হলে তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি দুর্ঘটনা বা অবহেলার ঘটনায় পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কি সবসময় সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান?
রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় গোটা দেশ শোকাহত। একটি শিশুর মৃত্যুও যেমন বেদনাদায়ক, সেখানে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যু নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত গুরুতর ঘটনা। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের চিহ্নিতকরণ এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। নিহত শিশুদের পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে।
কিন্তু এরই মধ্যে সরকার হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে—এই সিদ্ধান্তের ফলে কি সমস্যার সমাধান হবে, নাকি নতুন সমস্যা সৃষ্টি হবে?
বিশ্বের কোনো উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার দেশেই সাধারণত চিকিৎসাগত অবহেলার অভিযোগে পুরো হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়াকে প্রথম সমাধান হিসেবে দেখা হয় না। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসা-সংক্রান্ত গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত হয়, দায়ী চিকিৎসক, নার্স বা প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, নিরাপত্তা প্রটোকল সংস্কার করা হয়। কিন্তু একটি বৃহৎ হাসপাতাল, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা নেয়, সেটিকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া খুবই বিরল ঘটনা।
আদ-দ্বীন হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে দেশের সাধারণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের চিকিৎসাসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মাতৃসেবা, শিশুস্বাস্থ্য, অপারেশন, জরুরি চিকিৎসা এবং তুলনামূলক কম খরচে উন্নত সেবার কারণে অসংখ্য মানুষ এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল।
প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি একই মানের এবং একই সক্ষমতার বিকল্প হাসপাতাল গড়ে তুলতে পেরেছে? যদি আদ-দ্বীনের মতো একটি বৃহৎ হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা হাজার হাজার রোগী কোথায় যাবে? বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এর বিকল্প কী?
আমাদের দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোর অধিকাংশই রোগীর চাপে জর্জরিত। অনেক হাসপাতালে বেডের তুলনায় রোগী কয়েকগুণ বেশি। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল বন্ধ করে দিলে সেই চাপ আরও বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষই।
আরও একটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি হাসপাতালে শুধু মালিক বা পরিচালকরাই জড়িত নন। সেখানে হাজার হাজার চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করেন। হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে তাদের কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়বে। একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব কত হাজার মানুষের জীবনে পড়বে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—আমরা কি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে সমস্যার সমাধান করতে চাই, নাকি প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করে আরও শক্তিশালী করতে চাই?
যদি কোনো নার্স বা চিকিৎসকের অবহেলা থেকে এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। যদি প্রশাসনিক ব্যর্থতা থাকে, তাহলে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক। যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকে, তাহলে তা সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হোক। কিন্তু একটি হাসপাতাল, যা বছরের পর বছর লাখো মানুষকে সেবা দিয়ে এসেছে, তাকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়াই কি একমাত্র সমাধান?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু শাস্তি দেওয়া নয়; জনগণের চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করা। আমরা যেন এমন অবস্থায় না পৌঁছাই, যেখানে ভুলের বিচার করতে গিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার আরও বড় ক্ষতি ডেকে আনি।
নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু সেই বিচার যেন এমন না হয়, যার ফলে ভবিষ্যতে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়।
ভাঙা সহজ, গড়া কঠিন। একটি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া কয়েকটি প্রশাসনিক আদেশের ব্যাপার হতে পারে, কিন্তু আদ-দ্বীনের মতো একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে লাগে বহু বছর, হাজারো মানুষের শ্রম এবং মানুষের অর্জিত আস্থা।
তাই সময় এসেছে আবেগ নয়, বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। দায়ীদের শাস্তি হোক, হাসপাতালের ত্রুটি সংশোধন হোক, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হোক—কিন্তু দেশের মানুষের চিকিৎসাসেবার স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হোক।
কারণ শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল কোনো ভবন নয়; এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর আশ্রয়স্থল।














