ফারইস্ট ইসলামী লাইফে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ: নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকার দাবি
- Update Time : ০৭:৫৭:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
- / ১২৯ Time View

দেশের জীবন বীমা খাতের অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসির অর্থ, মৃত্যু দাবি (ডেথ ক্লেইম), সারেন্ডার ভ্যালু ও অন্যান্য বীমা সুবিধা পরিশোধে বিলম্বের কারণে হাজার হাজার পলিসিধারী ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে কোম্পানির অতীতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।
বিভিন্ন মহল, ভুক্তভোগী পলিসিধারী এবং বীমা খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার নানা অনিয়মের কারণে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম সিন্ডিকেটের পাশাপাশি সাবেক পরিচালক তাসলিমা ইসলাম, সাবেক পরিচালক শারিয়ার খালেদ, সাবেক পরিচালক কে এম খালেদ, সাবেক অডিট ইনচার্জ কামাল হোসেন হাওলাদার এবং সাবেক ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ইনচার্জ আব্দুর রাজ্জাকের নামও বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে।
তবে এ বিষয়ে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো বিভিন্ন অভিযোগ, দাবি ও আলোচনার ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি
ভুক্তভোগী পলিসিধারীদের অভিযোগ, বহু বছর ধরে তারা তাদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য কোম্পানির বিভিন্ন কার্যালয়ে ঘুরছেন। অনেকেই মেয়াদপূর্তির পর পলিসির অর্থ, মৃত্যু দাবির টাকা কিংবা সারেন্ডার ভ্যালু সময়মতো না পেয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কেউ সন্তানের উচ্চশিক্ষা, কেউ চিকিৎসা, আবার কেউ অবসর-পরবর্তী জীবনের নিরাপত্তার জন্য বীমা করেছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই অর্থ হাতে না পাওয়ায় অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়েছে এবং মানবিক সংকটে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গ্রাহকদের দাবি, বছরের পর বছর অপেক্ষার পরও অনেক ক্ষেত্রে সন্তোষজনক সমাধান হয়নি। ফলে জীবন বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক নিরীক্ষা
বীমা খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে কোম্পানির আর্থিক লেনদেন, বিনিয়োগ কার্যক্রম, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং অর্থের প্রবাহের ওপর একটি স্বাধীন ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করা জরুরি। এর মাধ্যমে অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়েছে—তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে।
তাদের মতে, যদি তদন্তে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করে ক্ষতিগ্রস্ত পলিসিধারীদের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকার দাবি
ভুক্তভোগী গ্রাহক, নাগরিক সমাজ এবং বীমা খাতের পর্যবেক্ষকদের দাবি, বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি পুরো জীবন বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্গে জড়িত। তাই বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে যেন তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। তদন্তে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বীমা খাতে আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জীবন বীমা শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট সমাধান করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকি নিশ্চিত করা। অতীতের অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায় নির্ধারণ না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকটের ঝুঁকি থেকে যাবে।
তারা আরও মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া থাকা পলিসিধারীদের দাবিগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য একটি সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণ, যাচাই এবং নিষ্পত্তির একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা
ভুক্তভোগী পলিসিধারীরা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, তাদের বহু বছরের কষ্টার্জিত সঞ্চয় দ্রুত ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে তারা দাবি জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
তাদের বিশ্বাস, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করা গেলে শুধু হাজারো পরিবারের দুর্ভোগই লাঘব হবে না, দেশের জীবন বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থাও পুনরুদ্ধার হবে।













