সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইডিআরএ চেয়ারম্যানের নতুন চমক: ফারইস্ট থেকে পদ্মা—৭ বিমা কোম্পানির বকেয়া দাবিতে নড়েচড়ে বসেছে আইডিআরএ

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০২:৪৪:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
  • / ১৩০ Time View

 

 

 

দেশের জীবন বিমা খাতে দীর্ঘদিনের সংকট নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যানের সাম্প্রতিক উপস্থাপনায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মাত্র সাতটি জীবন বিমা কোম্পানির কাছেই গ্রাহকদের দাবি বাবদ কয়েক হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে থাকায় লাখো পলিসিধারী দীর্ঘদিন ধরে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা পুরো বিমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়, জীবন বিমা খাতের মোট বকেয়া দাবির প্রায় ৯০ শতাংশই মাত্র সাতটি প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৫৭১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। তবে সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বকেয়া দাবি মিলিয়ে অঙ্কটি প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে লাইফ ফান্ড থেকে প্রায় ৪৫৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের দাবি বাবদ প্রায় ২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটির দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ১ শতাংশ। ফলে হাজার হাজার গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে মেয়াদপূর্তির অর্থের জন্য অপেক্ষা করছেন।

সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকদের সঞ্চিত লাইফ ফান্ড থেকে প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে দাবি পরিশোধে বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর বিরুদ্ধে গত চার বছরে প্রায় ১৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার দাবি বকেয়া থাকার তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ৬ শতাংশ এবং গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর দাবি নিষ্পত্তির হার ১৪ শতাংশ। একই তালিকায় রয়েছে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং বায়রা

লাইফ/সান লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যাদের আর্থিক দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো গ্রাহকদের লাইফ ফান্ডের অপব্যবহার। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ও মালিকপক্ষ গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থ বিমা কার্যক্রমের বাইরে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করেছেন। পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক গ্রাহক মেয়াদপূর্তির তিন থেকে চার বছর পরও তাদের পাওনা অর্থ হাতে পাচ্ছেন না।

এর প্রভাব নতুন ব্যবসাতেও পড়ছে। পুরোনো গ্রাহকদের অভিযোগ এবং দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে নতুন গ্রাহকদের বিমার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ফলে নতুন প্রিমিয়াম সংগ্রহ কমে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহ আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিমা খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণ, লাইফ ফান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং গ্রাহকদের বকেয়া দাবি দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় দেশের জীবন বিমা খাতে জনআস্থা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে গ্রাহক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, আইডিআরএ, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, গ্রাহকদের কষ্টার্জিত অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে দেশের জীবন বিমা শিল্প আরও গভীর সংকটে পড়বে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

আইডিআরএ চেয়ারম্যানের নতুন চমক: ফারইস্ট থেকে পদ্মা—৭ বিমা কোম্পানির বকেয়া দাবিতে নড়েচড়ে বসেছে আইডিআরএ

Update Time : ০২:৪৪:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

 

 

 

দেশের জীবন বিমা খাতে দীর্ঘদিনের সংকট নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যানের সাম্প্রতিক উপস্থাপনায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মাত্র সাতটি জীবন বিমা কোম্পানির কাছেই গ্রাহকদের দাবি বাবদ কয়েক হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে থাকায় লাখো পলিসিধারী দীর্ঘদিন ধরে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা পুরো বিমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়, জীবন বিমা খাতের মোট বকেয়া দাবির প্রায় ৯০ শতাংশই মাত্র সাতটি প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৫৭১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। তবে সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বকেয়া দাবি মিলিয়ে অঙ্কটি প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে লাইফ ফান্ড থেকে প্রায় ৪৫৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের দাবি বাবদ প্রায় ২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটির দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ১ শতাংশ। ফলে হাজার হাজার গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে মেয়াদপূর্তির অর্থের জন্য অপেক্ষা করছেন।

সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকদের সঞ্চিত লাইফ ফান্ড থেকে প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে দাবি পরিশোধে বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর বিরুদ্ধে গত চার বছরে প্রায় ১৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার দাবি বকেয়া থাকার তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ৬ শতাংশ এবং গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স-এর দাবি নিষ্পত্তির হার ১৪ শতাংশ। একই তালিকায় রয়েছে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং বায়রা

লাইফ/সান লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যাদের আর্থিক দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো গ্রাহকদের লাইফ ফান্ডের অপব্যবহার। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ও মালিকপক্ষ গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থ বিমা কার্যক্রমের বাইরে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করেছেন। পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক গ্রাহক মেয়াদপূর্তির তিন থেকে চার বছর পরও তাদের পাওনা অর্থ হাতে পাচ্ছেন না।

এর প্রভাব নতুন ব্যবসাতেও পড়ছে। পুরোনো গ্রাহকদের অভিযোগ এবং দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে নতুন গ্রাহকদের বিমার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ফলে নতুন প্রিমিয়াম সংগ্রহ কমে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহ আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিমা খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণ, লাইফ ফান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং গ্রাহকদের বকেয়া দাবি দ্রুত পরিশোধের উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় দেশের জীবন বিমা খাতে জনআস্থা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে গ্রাহক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, আইডিআরএ, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, গ্রাহকদের কষ্টার্জিত অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে দেশের জীবন বিমা শিল্প আরও গভীর সংকটে পড়বে।