সময়: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জীবনবীমার মেয়াদ শেষ, তবু মিলছে না টাকা: ৪–৫ বছর ধরে অপেক্ষায় গ্রাহক, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান ভুক্তভোগীরা

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১১:৫৪:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
  • / ৮৫ Time View

 

 

বাংলাদেশে জীবনবীমা মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সঞ্চয় এবং পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। বছরের পর বছর কষ্ট করে প্রিমিয়াম পরিশোধের পর পলিসির মেয়াদ শেষ হলে গ্রাহকের প্রত্যাশা থাকে—নির্ধারিত নিয়মে দ্রুত তার প্রাপ্য অর্থ হাতে পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। পলিসি মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বহু গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে ম্যাচিউরিটি ক্লেইমের টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

বিশেষ করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ম্যাচিউরিটি ও অন্যান্য বীমা দাবি পরিশোধে বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোনো কোনো গ্রাহক পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পর কয়েক বছর ধরে অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এমনকি একজন গ্রাহকের ২০২২ সালে পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পরও ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তার ১১ লাখ টাকার বেশি দাবি পরিশোধ হয়নি বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। (The Daily Star)

শুধু ফারইস্ট নয়, সংকট ছড়িয়ে পড়েছে পুরো খাতে

বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের জীবন ও সাধারণ—উভয় ধরনের বীমা প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। এর মধ্যে জীবনবীমা কোম্পানিগুলোর অনাদায়ী দাবির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪,০০৭ কোটি টাকা। (The Business Standard)

২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে জীবনবীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ এবং আর্থিক মূল্য প্রায় ৪,৪০৩ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা, তারল্য সংকট, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও অনিয়মকে খাতটির বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। (The Daily Star)

ফলে প্রশ্ন উঠছে—যে গ্রাহক বছরের পর বছর নিয়মিত প্রিমিয়াম দিয়েছেন, পলিসির মেয়াদ শেষ করেছেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন, তার টাকা পেতে কেন বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে?

ফারইস্ট

ইসলামী লাইফের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও বিভিন্ন সময়ে ‘Unsettled Claim Information’ প্রকাশ করা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির অনিষ্পন্ন দাবির বিষয়টি দীর্ঘদিনের বলে ইঙ্গিত করে। (Fareast Islami Life)

২০২৫ সালের এপ্রিলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ—IDRA ছয়টি জীবনবীমা কোম্পানিকে বকেয়া দাবি নিষ্পত্তির পরিকল্পনা জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। তালিকায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পাশাপাশি বায়রা লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, সানলাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ ও পদ্মা ইসলামী লাইফের নামও ছিল। (The Business Standard)

একই সময়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের মোট দাবি-দায় ছিল প্রায় ২,৯৪৭ কোটি টাকা, আর সে সময়ে প্রতিষ্ঠানটি দাবির মাত্র ৬.৫৯ শতাংশ পরিশোধ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। (The Business Standard)

৪–বছর অপেক্ষা কি কোনো সমাধান?

একজন সাধারণ মানুষ ১০, ১৫ কিংবা ২০ বছর ধরে একটি বীমা পলিসির প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন। অনেকেই সন্তানের শিক্ষা, মেয়ের বিয়ে, অবসরজীবন কিংবা জরুরি চিকিৎসা ব্যয়ের কথা মাথায় রেখে এই সঞ্চয় করেন।

কিন্তু পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পর যদি সেই অর্থ ৪–বছর ধরে আটকে থাকে, তাহলে ওই গ্রাহকের কাছে বীমার উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

কেউ কেউ বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজের সঞ্চয়ের টাকা পাওয়ার জন্য অফিসে অফিসে ঘুরছেন। কেউ সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য ম্যাচিউরিটি অর্থের ওপর নির্ভর করেছিলেন। অথচ বছরের পর বছর ধরে তারা শুধু শুনছেন—‘অতি শিগগিরই টাকা দেওয়া হবে।’

এই পরিস্থিতি শুধু একটি আর্থিক সমস্যা নয়; এটি সাধারণ মানুষের আস্থা, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন।

আইনের নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ব্যবধান

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র পাওয়ার পর বীমা দাবি নিষ্পত্তির জন্য ৯০ দিনের বিধান রয়েছে। অথচ বাস্তবে অনেক গ্রাহক ৯০ দিন তো দূরের কথা, কয়েক বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। (The Daily Star)

এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং গ্রাহকের অধিকার—সবকিছু নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের আকুল আবেদন

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জীবনবীমার লাখ লাখ গ্রাহকের পক্ষ থেকে একটি মানবিক ও জনস্বার্থমূলক আবেদন উঠতে পারে—এই সংকটের একটি স্থায়ী কার্যকর সমাধান করা হোক। (Cabinet Division)

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে অর্থ মন্ত্রণালয়, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট জীবনবীমা কোম্পানিগুলোকে নিয়ে একটি বিশেষ সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।

এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে—

১. প্রত্যেক জীবনবীমা কোম্পানির মোট অনিষ্পন্ন ম্যাচিউরিটি ক্লেইমের তালিকা প্রকাশ করা;

২. কোন গ্রাহকের কত টাকা কত বছর ধরে আটকে আছে—তার একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা;

৩. ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তির বিধান বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি করা;

৪. দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবির জন্য কোম্পানিভিত্তিক সময়সীমাবদ্ধ ‘ক্লেইম সেটেলমেন্ট রোডম্যাপ’ তৈরি করা;

৫. আর্থিকভাবে দুর্বল কোম্পানিগুলোর জন্য পুনর্গঠন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা আইনসম্মত অন্য কোনো সমাধানের ব্যবস্থা করা;

৬. অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া;

৭. এবং সর্বোপরি, সাধারণ পলিসিহোল্ডারদের বৈধ পাওনা দ্রুত পরিশোধের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বীমা খাতকে বাঁচাতে হলে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে

বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো ভবন, জমি বা বিনিয়োগ নয়—গ্রাহকের আস্থা। মানুষ যদি মনে করেন, বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দেওয়ার পরও প্রয়োজনের সময় নিজের টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন করে কেউ বীমা করতে আগ্রহী হবেন না।

এর ফলে শুধু কয়েকটি কোম্পানি নয়, পুরো দেশের বীমা খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাই বিষয়টিকে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে না দেখে জাতীয় জনস্বার্থ আর্থিক নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

একটি ন্যায্য দাবি

জীবনবীমার গ্রাহকরা কারও দয়া চান না। তারা চান তাদের নিজেদের বৈধ প্রাপ্য অর্থ

যে মানুষ ১০–২০ বছর ধরে কষ্ট করে প্রিমিয়াম দিয়েছেন, পলিসির শর্ত পূরণ করেছেন এবং ম্যাচিউরিটি অর্জন করেছেন, তার টাকা পাওয়ার জন্য কেন তাকে বছরের পর বছর অফিসের দরজায় ঘুরতে হবে?

প্রধানমন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের প্রতি তাই অনুরোধ—জীবনবীমার ম্যাচিউরিটি অন্যান্য অনিষ্পন্ন দাবি নিষ্পত্তিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করুন।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা আটকে আছে, তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও দায়-দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার একটি বাস্তবসম্মত, সময়সীমাবদ্ধ স্বচ্ছ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

কারণ একজন সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো ৫ লাখ, ১০ লাখ বা ২০ লাখ টাকা শুধু একটি সংখ্যা নয়—সেটিই হতে পারে তার সারাজীবনের সঞ্চয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা বার্ধক্যের শেষ অবলম্বন।

সরকার যদি এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ায়, তাহলে শুধু হাজার হাজার পরিবার তাদের প্রাপ্য অর্থ ফিরে পাবে না; বাংলাদেশের জীবনবীমা খাতও আবার মানুষের আস্থা অর্জনের সুযোগ পাবে।

জনস্বার্থে এখনই প্রয়োজন—‘ম্যাচিউরিটি ক্লেইম দ্রুত পরিশোধের জাতীয় উদ্যোগ’

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

জীবনবীমার মেয়াদ শেষ, তবু মিলছে না টাকা: ৪–৫ বছর ধরে অপেক্ষায় গ্রাহক, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান ভুক্তভোগীরা

Update Time : ১১:৫৪:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

 

 

বাংলাদেশে জীবনবীমা মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সঞ্চয় এবং পরিবারের আর্থিক সুরক্ষার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। বছরের পর বছর কষ্ট করে প্রিমিয়াম পরিশোধের পর পলিসির মেয়াদ শেষ হলে গ্রাহকের প্রত্যাশা থাকে—নির্ধারিত নিয়মে দ্রুত তার প্রাপ্য অর্থ হাতে পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। পলিসি মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বহু গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে ম্যাচিউরিটি ক্লেইমের টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

বিশেষ করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ম্যাচিউরিটি ও অন্যান্য বীমা দাবি পরিশোধে বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোনো কোনো গ্রাহক পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পর কয়েক বছর ধরে অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এমনকি একজন গ্রাহকের ২০২২ সালে পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পরও ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তার ১১ লাখ টাকার বেশি দাবি পরিশোধ হয়নি বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। (The Daily Star)

শুধু ফারইস্ট নয়, সংকট ছড়িয়ে পড়েছে পুরো খাতে

বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের জীবন ও সাধারণ—উভয় ধরনের বীমা প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ দাবি অনিষ্পন্ন ছিল। এর মধ্যে জীবনবীমা কোম্পানিগুলোর অনাদায়ী দাবির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪,০০৭ কোটি টাকা। (The Business Standard)

২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে জীবনবীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ এবং আর্থিক মূল্য প্রায় ৪,৪০৩ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা, তারল্য সংকট, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও অনিয়মকে খাতটির বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। (The Daily Star)

ফলে প্রশ্ন উঠছে—যে গ্রাহক বছরের পর বছর নিয়মিত প্রিমিয়াম দিয়েছেন, পলিসির মেয়াদ শেষ করেছেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন, তার টাকা পেতে কেন বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে?

ফারইস্ট

ইসলামী লাইফের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও বিভিন্ন সময়ে ‘Unsettled Claim Information’ প্রকাশ করা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির অনিষ্পন্ন দাবির বিষয়টি দীর্ঘদিনের বলে ইঙ্গিত করে। (Fareast Islami Life)

২০২৫ সালের এপ্রিলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ—IDRA ছয়টি জীবনবীমা কোম্পানিকে বকেয়া দাবি নিষ্পত্তির পরিকল্পনা জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। তালিকায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পাশাপাশি বায়রা লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, সানলাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ ও পদ্মা ইসলামী লাইফের নামও ছিল। (The Business Standard)

একই সময়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের মোট দাবি-দায় ছিল প্রায় ২,৯৪৭ কোটি টাকা, আর সে সময়ে প্রতিষ্ঠানটি দাবির মাত্র ৬.৫৯ শতাংশ পরিশোধ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। (The Business Standard)

৪–বছর অপেক্ষা কি কোনো সমাধান?

একজন সাধারণ মানুষ ১০, ১৫ কিংবা ২০ বছর ধরে একটি বীমা পলিসির প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন। অনেকেই সন্তানের শিক্ষা, মেয়ের বিয়ে, অবসরজীবন কিংবা জরুরি চিকিৎসা ব্যয়ের কথা মাথায় রেখে এই সঞ্চয় করেন।

কিন্তু পলিসি ম্যাচিউর হওয়ার পর যদি সেই অর্থ ৪–বছর ধরে আটকে থাকে, তাহলে ওই গ্রাহকের কাছে বীমার উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

কেউ কেউ বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজের সঞ্চয়ের টাকা পাওয়ার জন্য অফিসে অফিসে ঘুরছেন। কেউ সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য ম্যাচিউরিটি অর্থের ওপর নির্ভর করেছিলেন। অথচ বছরের পর বছর ধরে তারা শুধু শুনছেন—‘অতি শিগগিরই টাকা দেওয়া হবে।’

এই পরিস্থিতি শুধু একটি আর্থিক সমস্যা নয়; এটি সাধারণ মানুষের আস্থা, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন।

আইনের নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ব্যবধান

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র পাওয়ার পর বীমা দাবি নিষ্পত্তির জন্য ৯০ দিনের বিধান রয়েছে। অথচ বাস্তবে অনেক গ্রাহক ৯০ দিন তো দূরের কথা, কয়েক বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। (The Daily Star)

এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং গ্রাহকের অধিকার—সবকিছু নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের আকুল আবেদন

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জীবনবীমার লাখ লাখ গ্রাহকের পক্ষ থেকে একটি মানবিক ও জনস্বার্থমূলক আবেদন উঠতে পারে—এই সংকটের একটি স্থায়ী কার্যকর সমাধান করা হোক। (Cabinet Division)

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে অর্থ মন্ত্রণালয়, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট জীবনবীমা কোম্পানিগুলোকে নিয়ে একটি বিশেষ সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।

এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে—

১. প্রত্যেক জীবনবীমা কোম্পানির মোট অনিষ্পন্ন ম্যাচিউরিটি ক্লেইমের তালিকা প্রকাশ করা;

২. কোন গ্রাহকের কত টাকা কত বছর ধরে আটকে আছে—তার একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা;

৩. ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তির বিধান বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি করা;

৪. দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবির জন্য কোম্পানিভিত্তিক সময়সীমাবদ্ধ ‘ক্লেইম সেটেলমেন্ট রোডম্যাপ’ তৈরি করা;

৫. আর্থিকভাবে দুর্বল কোম্পানিগুলোর জন্য পুনর্গঠন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা আইনসম্মত অন্য কোনো সমাধানের ব্যবস্থা করা;

৬. অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া;

৭. এবং সর্বোপরি, সাধারণ পলিসিহোল্ডারদের বৈধ পাওনা দ্রুত পরিশোধের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বীমা খাতকে বাঁচাতে হলে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে

বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো ভবন, জমি বা বিনিয়োগ নয়—গ্রাহকের আস্থা। মানুষ যদি মনে করেন, বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দেওয়ার পরও প্রয়োজনের সময় নিজের টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন করে কেউ বীমা করতে আগ্রহী হবেন না।

এর ফলে শুধু কয়েকটি কোম্পানি নয়, পুরো দেশের বীমা খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাই বিষয়টিকে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে না দেখে জাতীয় জনস্বার্থ আর্থিক নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

একটি ন্যায্য দাবি

জীবনবীমার গ্রাহকরা কারও দয়া চান না। তারা চান তাদের নিজেদের বৈধ প্রাপ্য অর্থ

যে মানুষ ১০–২০ বছর ধরে কষ্ট করে প্রিমিয়াম দিয়েছেন, পলিসির শর্ত পূরণ করেছেন এবং ম্যাচিউরিটি অর্জন করেছেন, তার টাকা পাওয়ার জন্য কেন তাকে বছরের পর বছর অফিসের দরজায় ঘুরতে হবে?

প্রধানমন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের প্রতি তাই অনুরোধ—জীবনবীমার ম্যাচিউরিটি অন্যান্য অনিষ্পন্ন দাবি নিষ্পত্তিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করুন।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা আটকে আছে, তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও দায়-দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার একটি বাস্তবসম্মত, সময়সীমাবদ্ধ স্বচ্ছ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

কারণ একজন সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো ৫ লাখ, ১০ লাখ বা ২০ লাখ টাকা শুধু একটি সংখ্যা নয়—সেটিই হতে পারে তার সারাজীবনের সঞ্চয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা বার্ধক্যের শেষ অবলম্বন।

সরকার যদি এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ায়, তাহলে শুধু হাজার হাজার পরিবার তাদের প্রাপ্য অর্থ ফিরে পাবে না; বাংলাদেশের জীবনবীমা খাতও আবার মানুষের আস্থা অর্জনের সুযোগ পাবে।

জনস্বার্থে এখনই প্রয়োজন—‘ম্যাচিউরিটি ক্লেইম দ্রুত পরিশোধের জাতীয় উদ্যোগ’