পদার্থে দুটি ভুলের পর এবার রসায়ন পরীক্ষায় ৮ সৃজনশীলের ৪টিতেই ভুল!
- Update Time : ১০:৩০:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
- / ৫২ Time View

এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে ফের বিতর্ক, বিভ্রান্তি ও সময় নষ্টের অভিযোগ শিক্ষার্থীদের
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের ভুল যেন পিছু ছাড়ছে না। পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের প্রশ্নপত্রে দুটি বড় ধরনের ভুলের অভিযোগের পর এবার রসায়ন দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষাতেও একাধিক প্রশ্ন ও তথ্যগত অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (২২ জুলাই) অনুষ্ঠিত রসায়ন দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষার সৃজনশীল ও বহুনির্বাচনী—উভয় অংশের প্রশ্ন নিয়েই আপত্তি জানিয়েছেন পরীক্ষার্থী ও বিষয়সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অভিযোগ, সৃজনশীল অংশের ৮টি প্রশ্নের মধ্যে অন্তত ৪টি প্রশ্নে এমন কিছু অস্পষ্টতা, তথ্যগত অসঙ্গতি কিংবা ধারণাগত ভুল রয়েছে, যা পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে বিভ্রান্ত করেছে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী অযথা সময় নষ্ট করেছেন এবং মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে অনুমাননির্ভর উত্তর দিতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা ভুল থাকলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রশ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরীক্ষার্থীর সময় ব্যবস্থাপনা, আত্মবিশ্বাস এবং পুরো পরীক্ষার পারফরম্যান্সের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
১ নম্বর প্রশ্নে ভরের তথ্যই অনুপস্থিত
রসায়ন দ্বিতীয়পত্রের সৃজনশীল অংশের ১ নম্বর উদ্দীপকের (II) অংশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিক্রিয়ক থেকে চারটি উৎপাদ পাওয়ার কথা বলা হলেও কোন উৎপাদের ভর ২ দশমিক ৫ গ্রাম—তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
ফলে উদ্দীপকে দেওয়া তথ্য ব্যবহার করে জারকের ভর নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করছেন শিক্ষকরা। পরীক্ষার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রশ্নটি সমাধানের চেষ্টা করতে গিয়ে তারা বারবার উদ্দীপকের তথ্য যাচাই করেছেন এবং এতে মূল্যবান পরীক্ষার সময় নষ্ট হয়েছে।
‘পাত্র-১’ নাকি ‘A-পাত্র’—নামেই বিভ্রান্তি
৫ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের উদ্দীপকেও অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ‘পাত্র-১’ উল্লেখ করা হলেও প্রশ্নের ‘গ’ ও ‘ঘ’ অংশে সেটিকে ‘A-পাত্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষকদের মতে, একই উদ্দীপকে একই বিষয়কে ভিন্ন নামে উল্লেখ করায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে পরীক্ষার মতো চাপপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ ধরনের অসঙ্গতি শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন বুঝতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে বাধ্য করে।
২৫০ মিলিলিটার গ্যাস—কিন্তু তাপমাত্রা ও চাপ কোথায়?
৬ নম্বর উদ্দীপকের ‘গ’ প্রশ্ন নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন বিষয়সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। সেখানে ২৫০ মিলিলিটার গ্যাস উৎপন্ন করতে প্রয়োজনীয় মাতৃ যৌগের পরিমাণ নির্ণয় করতে বলা হয়েছে। কিন্তু গ্যাসটির তাপমাত্রা ও চাপ উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ।
গ্যাসের আয়তন ও মোলের সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ও চাপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য ছাড়া নির্ভুলভাবে হিসাব করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একই উদ্দীপকের ‘ঘ’ প্রশ্নে দেওয়া তথ্য ব্যবহার করে CO₂ গ্যাসের ক্ষেত্রে Z-এর মান ৪ দশমিক ০ পাওয়া যায় বলেও শিক্ষকরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই ফল বাস্তব গ্যাসের ধর্ম ও তরলীকরণ তত্ত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভ্যান ডার ওয়ালস সমীকরণ নিয়েও প্রশ্ন
৮ নম্বর সৃজনশীল প্রশ্নের ‘ঘ’ অংশে ‘ভ্যান ডার ওয়ালস’ সমীকরণকে ‘আদর্শ গ্যাসের সমন্বয় সমীকরণ’-এর পরিবর্তিত রূপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
শিক্ষকদের একাংশের মতে, এ ধরনের সংজ্ঞা ধারণাগতভাবে সঠিক নয়। তবে দেশের কিছু পাঠ্যবইয়ে একই ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেছেন। ফলে প্রশ্নপত্রের ভুলের পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ের বক্তব্য ও বৈজ্ঞানিক ধারণার মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বহুনির্বাচনী প্রশ্নেও সঠিক উত্তর নিয়ে সংশয়
শুধু সৃজনশীল প্রশ্ন নয়, রসায়ন দ্বিতীয়পত্রের বহুনির্বাচনী অংশেও ভুলের অভিযোগ উঠেছে।
যমুনা (ঘ) সেটের ১০ নম্বর প্রশ্নে কোনো সঠিক উত্তর নেই বলে দাবি করেছেন কয়েকজন শিক্ষক। তাদের ভাষ্য, পাঠ্যবইয়ের তথ্য অনুযায়ী প্রদত্ত বক্তব্যগুলোর মধ্যে শুধু ‘iii’ সঠিক। কিন্তু সেটিকে এককভাবে উত্তর হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ প্রশ্নের বিকল্পে রাখা হয়নি।
ফলে ওই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ।
‘প্রশ্ন ভুল হবে—এটা ভাবিনি’
পরীক্ষার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার্থী ইমতিয়াজ নোমান বলেন, কয়েকটি উদ্দীপক ও তথ্য নিয়ে প্রশ্ন সমাধানের সময় তিনি বিভ্রান্তিতে পড়েছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য অনেক সময় ব্যয় করেও শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেননি।
তার ভাষায়, বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল থাকতে পারে—এমনটা তিনি ভাবেননি। ফলে প্রশ্ন বুঝতে গিয়ে সময় নষ্ট হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত কিছু প্রশ্নে অনুমাননির্ভর উত্তর দিতে হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মিশু খান বিষয়টি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে লিখেছেন, এর আগেও পরীক্ষায় কিছু নম্বর বোনাস পেয়েছেন, এবারও হয়তো কিছু নম্বর বোনাস পাবেন—‘এটাই সায়েন্স’।
শিক্ষার্থীদের এমন মন্তব্যে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের হতাশার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রশ্নপত্রে ভুলের দায় কার?
বাংলাদেশ বিজ্ঞান পরিষদের সভাপতি ও রসায়নের শিক্ষক আরিফ হক বলেন, প্রশ্নপত্রে ভুল নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় এ ধরনের ভুল কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তার মতে, প্রশ্নপত্রের ভুল শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ায় এবং পরীক্ষার হলে অযথা সময় নষ্ট করে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেধাবী শিক্ষার্থীরা। কারণ তারা প্রশ্নের প্রতিটি তথ্য বিশ্লেষণ করে সঠিক উত্তর বের করার চেষ্টা করে এবং প্রশ্নে অসঙ্গতি থাকলে তার সমাধান খুঁজতেই অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে।
তিনি আরও বলেন, সব ভুলের দায় শুধু প্রশ্নপ্রণেতাদের ওপর চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোথাও কোথাও পাঠ্যবই, সিলেবাস ও প্রশ্নপত্রের মধ্যে অসঙ্গতিও এ ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।
পদার্থের পর রসায়ন—একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন?
এর আগে এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের প্রশ্নপত্রে দুটি বড় ধরনের ভুল ধরা পড়েছিল। পরে ওই প্রশ্নগুলোর জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
এর পরপরই রসায়ন পরীক্ষায় একাধিক প্রশ্ন নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন এবং চূড়ান্ত যাচাইয়ের বিভিন্ন ধাপে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা হচ্ছে কি না—এখন সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
একটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র শুধু একটি পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যম নয়; এটি শিক্ষার্থীর বহু বছরের প্রস্তুতি, মেধা ও ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই প্রশ্নপত্র তৈরির পর একাধিক ধাপে বিষয়বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক ও ভাষাগত যাচাই নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে?
রসায়ন দ্বিতীয়পত্রের প্রশ্নে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলো নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কোনো প্রশ্নে তথ্যগত ভুল, অস্পষ্টতা বা একাধিক সঠিক/কোনো সঠিক উত্তর না থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হলে পরীক্ষার্থীদের ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে নম্বর দেওয়ার নীতিও স্পষ্ট করা দরকার।
কারণ প্রশ্নপত্রের ভুলের দায় কোনো পরীক্ষার্থীর নয়। একজন শিক্ষার্থী যদি সঠিকভাবে প্রশ্ন বুঝতে না পেরে সময় হারান, তাহলে পরবর্তী প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য তার হাতে কম সময় থাকে। শুধু একটি প্রশ্নের নম্বর সমন্বয় করলেই সেই সময়ের ক্ষতি সবসময় পূরণ হয় না।
প্রশ্নপত্রে ভুল নয়, চাই নির্ভুলতার নিশ্চয়তা
এইচএসসি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। একই পরীক্ষায় একের পর এক প্রশ্ন নিয়ে ভুলের অভিযোগ উঠলে তা শুধু শিক্ষার্থীদের হতাশ করে না, পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
তাই পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের প্রশ্ন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে প্রকৃত ভুলগুলো চিহ্নিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ন্যায্য প্রতিকার দেওয়া এবং ভবিষ্যতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় আরও কঠোরতা আনা জরুরি।
একটি প্রশ্নপত্রের ভুল কয়েক মিনিটের বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল ও ভবিষ্যতের ওপর তার প্রভাব হতে পারে অনেক দীর্ঘস্থায়ী।


















