মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার: দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই
- Update Time : ১২:৪১:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬
- / ১৫২ Time View

দেশের বিভিন্ন মহিলা মাদ্রাসায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক যৌন নিপীড়নের অভিযোগ জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নরসিংদী, কুষ্টিয়া, সাভার কিংবা নেত্রকোনার মতো বিভিন্ন এলাকার ঘটনাগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং একটি বড় সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনার বিচার আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না; বরং স্থানীয় সালিস, আপস কিংবা সামাজিক চাপে ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এবং অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সম্প্রতি এক নারী মাদ্রাসাশিক্ষক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মহিলা মাদ্রাসাগুলোর পরিস্থিতি তাকে এতটাই বিচলিত করেছে যে তিনি নিজেই প্রতিকারমূলক উদ্যোগ নিতে চান। একজন অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি হিসেবে তাঁর এই উদ্বেগ বর্তমান বাস্তবতার ভয়াবহতাকেই সামনে নিয়ে আসে। দীর্ঘদিন ধরে নীরবে চাপা পড়ে থাকা বিষয়গুলো এখন ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসছে, যা সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
নরসিংদীর রায়পুরার একটি আবাসিক মহিলা মাদ্রাসায় ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ ওঠার পর অভিযুক্ত শিক্ষক পালিয়ে যায়। এর আগে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও সাভারের ঘটনাগুলোও সমাজকে নাড়া দিয়েছিল। বিশেষ করে সাভারের ঘটনায় শিক্ষার্থীরাই সাহসিকতার সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষককে শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। এই সাহস প্রমাণ করে, সচেতনতা ও প্রতিবাদ গড়ে উঠলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সম্ভব।
আরও উদ্বেগজনক একটি ঘটনা সামনে এসেছে নেত্রকোনা থেকে, যেখানে ১১ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর শিশুটি শুধু বলতে পেরেছিল—“পেট ভারী লাগছে, ভেতরে কিছু নড়ে।” এই ধরনের ঘটনা শুধু অপরাধ নয়; বরং মানবিক ও নৈতিক বিপর্যয়ের প্রতীক।
বাস্তবতা হলো, “মহিলা মাদ্রাসা” নাম থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণ পুরুষদের হাতেই থাকে। পরিচালক বা “বড় হুজুর” হয়ে ওঠেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। শিক্ষার্থী, নারী শিক্ষক কিংবা আবাসিক পরিবেশ—সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এই একক ক্ষমতা অনেক সময় জবাবদিহিতাহীন পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে অপরাধ সংঘটনের সুযোগ বাড়ে।
সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, অতিরিক্ত গোপনীয়তা ও অস্বচ্ছতা অনেক সময় অপরাধের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। বদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে যদি কোনো ব্যক্তিকে অতিরিক্ত পবিত্র বা প্রশ্নাতীত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে ভুক্তভোগীরা অনেক সময় নিজেদের ওপর হওয়া নির্যাতনকেও “নিয়তি” হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। এতে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে এবং শোষণের চক্র দীর্ঘস্থায়ী হয়।
মাদ্রাসাগুলোতে “বেয়াদবি” বা “ধর্মীয় অবাধ্যতা”র ভয় দেখিয়ে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি নিরুৎসাহিত করা হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ক্ষমতার যে বিশাল দূরত্ব তৈরি করা হয়, তা ভুক্তভোগীদের নীরব থাকতে বাধ্য করে। ফলে অনেক ছাত্রী নির্যাতনের শিকার হলেও মুখ খুলতে পারে না। পরিবারও সামাজিক লজ্জা, বিয়ের ভবিষ্যৎ কিংবা “মাদ্রাসার বদনাম” হওয়ার ভয়ে মামলা করতে চায় না।
দুঃখজনক বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয় বা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিপীড়নের ঘটনায় যেখানে আন্দোলন, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি হয়, সেখানে মাদ্রাসার অধিকাংশ ঘটনা সালিসে শেষ হয়ে যায়। কুমিল্লার এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তে যৌন নিপীড়নের আলামত পাওয়ার পরও আপসনামার মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের প্রবণতা অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে।
তবে ইসলামের ইতিহাস নারীদের শিক্ষা ও নেতৃত্বের অসংখ্য উজ্জ্বল উদাহরণে সমৃদ্ধ। বহু নারী হাদিস বিশারদ, শিক্ষক, বিচারক, দাতব্য সংগঠক এবং জ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ ছিলেন। আধুনিক সময়েও নারীশিক্ষা ও নেতৃত্বের উদাহরণ বিশ্বজুড়ে রয়েছে। ফলে নারীশিক্ষাকে সীমাবদ্ধ করা বা ভয়ভীতির কারণে শিক্ষার পথ সংকুচিত করা ইসলামের প্রকৃত চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সমস্যার সমাধানে প্রথমেই প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহিতা। কওমি ও অন্যান্য মাদ্রাসা বোর্ডকে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি মহিলা মাদ্রাসায় নারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে স্বাধীন ও কার্যকর গভর্নিং বডি গঠন জরুরি। নারী শিক্ষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও গোপন ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে তারা ভয় ছাড়াই অভিযোগ করতে পারে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যৌন হয়রানি কী, কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়, কোথায় অভিযোগ করতে হবে—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিং প্রয়োজন। পরিবারকেও সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিশুরা সহজে নিজেদের কষ্ট প্রকাশ করতে পারে।
সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আলেম সমাজ, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত। ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নামে অপরাধ আড়াল করা হলে শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মনে রাখতে হবে, অপরাধ গোপন করা ইসলামের সেবা নয়; বরং অন্যায়ের সহযোগিতা করা। সুরক্ষার নামে যে গোপনীয়তা অপরাধকে আড়াল করে, তা কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না।
আজ সময় এসেছে মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার। অন্যথায় একের পর এক নির্যাতনের ঘটনায় শুধু নিরীহ শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, পুরো সমাজ ও ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাও আস্থার সংকটে পড়বে।






















