সময়: রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাস্তব সংকট আড়াল করে ক্যাম্পাস রাজনীতি: কোথায় যাচ্ছি আমরা?

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ১২:৪২:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১৮৭ Time View

 

দেশ যখন বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত—জ্বালানি ঘাটতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভঙ্গুরতা—ঠিক তখনই শিক্ষাঙ্গনগুলোতে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের বিস্তার গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাস হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা, যুক্তিবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ক্ষেত্র। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সংকটময় এই সময়েই ক্যাম্পাসগুলো ক্রমে রাজনৈতিক সংঘর্ষের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।

ইরানকে ঘিরে বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বিদ্যুৎ সংকটে লোডশেডিং বেড়েছে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি সার কারখানাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে হামের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা সংকট নতুন মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় দেশের মনোযোগ থাকার কথা এসব জরুরি সমস্যার সমাধানে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে ক্যাম্পাস সংঘর্ষ, ছাত্রসংগঠনের আধিপত্য বিস্তার এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো একটি বিতর্কিত কনটেন্টকে কেন্দ্র করে কীভাবে দ্রুত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্থান হিসেবেও বিবেচিত থানার ভেতরে সংঘর্ষের অভিযোগ উঠছে—যা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের জন্য অশনিসংকেত।

প্রশ্ন হচ্ছে—এমন সময়ে এই উত্তেজনা কার জন্য লাভজনক? যখন জনগণ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ছাত্ররাজনীতির নামে সংঘর্ষ জনগণের দুঃখ-দুর্দশাকে আড়াল করছে। এতে করে প্রকৃত সংকট থেকে দৃষ্টি সরে যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ক্যাম্পাসে “গুপ্ত রাজনীতি” এবং অবিশ্বাসের সংস্কৃতি। একদিকে প্রকাশ্যে রাজনীতি নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হলেও অন্যদিকে ভিন্ন পরিচয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম চলতে থাকায় সন্দেহ, বিভাজন এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও অকারণে সন্দেহের মধ্যে পড়ছেন, যা শিক্ষার পরিবেশকে আরও নষ্ট করছে।

এছাড়া ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী—যখনই কোনো একটি সংগঠন ক্যাম্পাসে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তখনই কর্তৃত্ববাদী আচরণের ঝুঁকি বাড়ে। ফলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের পরিবর্তে সহিংসতা ও আধিপত্যই প্রাধান্য পায়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই তাদের ছাত্রসংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্যাম্পাসে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বুঝতে হবে—ক্যাম্পাসের অস্থিরতা শুধু শিক্ষার ক্ষতি করে না, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। যখন দেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রয়েছে, তখন ছাত্রসমাজের দায়িত্ব আরও বেশি। তাদের হওয়া উচিত পরিবর্তনের শক্তি, সংঘর্ষের নয়।

আজ প্রয়োজন উত্তপ্ত ক্যাম্পাস নয়, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব; সংঘর্ষ নয়, সংলাপ; বিভাজন নয়, ঐক্য। তবেই আমরা প্রকৃত সংকটগুলো মোকাবিলা করে একটি স্থিতিশীল ও উন্নত ভবিষ্যতের পথে এগোতে পারবো।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

বাস্তব সংকট আড়াল করে ক্যাম্পাস রাজনীতি: কোথায় যাচ্ছি আমরা?

Update Time : ১২:৪২:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

 

দেশ যখন বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত—জ্বালানি ঘাটতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভঙ্গুরতা—ঠিক তখনই শিক্ষাঙ্গনগুলোতে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের বিস্তার গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাস হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা, যুক্তিবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ক্ষেত্র। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সংকটময় এই সময়েই ক্যাম্পাসগুলো ক্রমে রাজনৈতিক সংঘর্ষের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।

ইরানকে ঘিরে বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বিদ্যুৎ সংকটে লোডশেডিং বেড়েছে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি সার কারখানাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে হামের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা সংকট নতুন মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় দেশের মনোযোগ থাকার কথা এসব জরুরি সমস্যার সমাধানে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে ক্যাম্পাস সংঘর্ষ, ছাত্রসংগঠনের আধিপত্য বিস্তার এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো একটি বিতর্কিত কনটেন্টকে কেন্দ্র করে কীভাবে দ্রুত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্থান হিসেবেও বিবেচিত থানার ভেতরে সংঘর্ষের অভিযোগ উঠছে—যা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের জন্য অশনিসংকেত।

প্রশ্ন হচ্ছে—এমন সময়ে এই উত্তেজনা কার জন্য লাভজনক? যখন জনগণ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ছাত্ররাজনীতির নামে সংঘর্ষ জনগণের দুঃখ-দুর্দশাকে আড়াল করছে। এতে করে প্রকৃত সংকট থেকে দৃষ্টি সরে যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ক্যাম্পাসে “গুপ্ত রাজনীতি” এবং অবিশ্বাসের সংস্কৃতি। একদিকে প্রকাশ্যে রাজনীতি নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হলেও অন্যদিকে ভিন্ন পরিচয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম চলতে থাকায় সন্দেহ, বিভাজন এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও অকারণে সন্দেহের মধ্যে পড়ছেন, যা শিক্ষার পরিবেশকে আরও নষ্ট করছে।

এছাড়া ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী—যখনই কোনো একটি সংগঠন ক্যাম্পাসে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তখনই কর্তৃত্ববাদী আচরণের ঝুঁকি বাড়ে। ফলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের পরিবর্তে সহিংসতা ও আধিপত্যই প্রাধান্য পায়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই তাদের ছাত্রসংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্যাম্পাসে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বুঝতে হবে—ক্যাম্পাসের অস্থিরতা শুধু শিক্ষার ক্ষতি করে না, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। যখন দেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রয়েছে, তখন ছাত্রসমাজের দায়িত্ব আরও বেশি। তাদের হওয়া উচিত পরিবর্তনের শক্তি, সংঘর্ষের নয়।

আজ প্রয়োজন উত্তপ্ত ক্যাম্পাস নয়, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব; সংঘর্ষ নয়, সংলাপ; বিভাজন নয়, ঐক্য। তবেই আমরা প্রকৃত সংকটগুলো মোকাবিলা করে একটি স্থিতিশীল ও উন্নত ভবিষ্যতের পথে এগোতে পারবো।