লোডশেডিংয়ে জনদুর্ভোগ, ৮০ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পুলিশের দ্বারস্থ—বাংলাদেশ কি আবার বড় বিদ্যুৎ সংকটের মুখে?
- Update Time : ১০:৪৯:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
- / ৫৪ Time View

তীব্র গরমের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি এখন আর শুধু সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয় নয়; এটি দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার গভীর কিছু দুর্বলতারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ, বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রে হামলা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং সর্বশেষ দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাওয়া—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই যদি তাদের গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, তাহলে বোঝা যায় সংকটটি কেবল বিদ্যুৎ না থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন সামাজিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গেও যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
৮০ সমিতির পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া কী বার্তা দিচ্ছে?
দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ পান। প্রায় চার কোটি গ্রাহক এসব সমিতির আওতাভুক্ত। জাতীয়ভাবে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশও তাদের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকায় বিতরণ করা হয়।
কিন্তু পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। জাতীয় গ্রিড থেকে যতটুকু বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যায়, সেটিই বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করতে হয়।
বর্তমানে তাদের সম্মিলিত চাহিদা যেখানে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে বিতরণ পর্যায়ে লোডশেডিং বাড়াতে হচ্ছে। আর দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে গ্রাহকদের মধ্যে। সেই ক্ষোভ যদি বিদ্যুৎ অফিস, উপকেন্দ্র বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলায় রূপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
এই কারণেই ৮০টি সমিতির পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একদিকে বিদ্যুৎ সংকটের সামাজিক প্রভাবের প্রতিফলন, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রকাশ।
তাহলে কি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা দরকার। দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা এবং বাস্তবে একটি নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ এক জিনিস নয়।
কোনো দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা অনেক বেশি হলেও গ্যাস, কয়লা, জ্বালানি তেল, এলএনজি, যন্ত্রপাতির সমস্যা, রক্ষণাবেক্ষণ, আর্থিক সংকট কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে সব কেন্দ্র একসঙ্গে পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতেও মূল সমস্যাগুলোর একটি হলো প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়া।
গ্যাস সংকট: বিদ্যুৎ সংকটের বড় কারণ
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকলে এসব কেন্দ্র তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারে না।
এদিকে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় এলএনজি খালাসেও সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সামিটের টার্মিনালে গ্যাসের কার্গো খালাসে সমস্যা এবং এক্সিলারেট টার্মিনালের আংশিক সক্ষমতা—দুটিই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ তৈরি করছে।
এখানেই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় দুর্বলতা সামনে আসে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও যদি প্রয়োজনীয় গ্যাস বা এলএনজি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে কাগজে থাকা উৎপাদন সক্ষমতা বাস্তবে খুব বেশি কাজে আসে না।
জাতীয় গ্রিডের ঘাটতি কি সংকটের প্রমাণ?
জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ১২ আগস্ট সকাল ৮টায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৪৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট।
এর আগে ভোর ৪টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ১৮ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট।
রাতের দিকে ঘাটতি আরও বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে নির্দিষ্ট সময়ে জাতীয় গ্রিডে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
তবে এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। বরং বলা যায়, বর্তমান সময়ে চাহিদার তুলনায় কার্যকর সরবরাহ সক্ষমতা কমে যাওয়াই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়?
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক শুধু অন্ধকার নয়; এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও রয়েছে।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ছোট ব্যবসা, শিল্পকারখানা, দোকানপাট, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অনলাইনভিত্তিক কাজ ব্যাহত হয়। প্রচণ্ড গরমের সময় বাসাবাড়িতে মানুষের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায়।
শিল্প খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন কমে যেতে পারে। উৎপাদন কমলে ব্যবসার খরচ বাড়ে, কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করে। বিদ্যুৎ অফিসে হামলা বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করার ঘটনা সেই ক্ষোভের বিপজ্জনক বহিঃপ্রকাশ।
দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ—কেন?
বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে সরকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সময়ও কমিয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।
সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ করার পাশাপাশি সন্ধ্যা ৭টার পর দোকান, মার্কেট ও শপিংমলে আলোকসজ্জাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মেলা, বাণিজ্যমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও রাত ৮টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল ও ওষুধের দোকান এই বিধিনিষেধের বাইরে রয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার মূলত সন্ধ্যা ও রাতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে চাইছে।
বাংলাদেশ কি আবার বড় বিদ্যুৎ সংকটের দিকে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া কঠিন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখারও সুযোগ নেই।
কারণ একই সময়ে কয়েকটি সমস্যা সামনে এসেছে—বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, গ্যাসের ঘাটতি, এলএনজি সরবরাহে সমস্যা, জাতীয় গ্রিডে কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি, দীর্ঘ লোডশেডিং এবং বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা।
এসব ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে সেটিকে নিছক একটি ‘সাময়িক লোডশেডিং’ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
তবে এটিও মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আবহাওয়া, জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন, গ্রিডের অবস্থা ও চাহিদার ওপর দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে কয়েক দিনের তীব্র সংকট মানেই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিদ্যুৎ বিপর্যয়—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
আসল প্রশ্ন উৎপাদন নয়, জ্বালানি নিরাপত্তা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনায় শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত: প্রয়োজনের সময় সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, এলএনজি, কয়লা বা অন্যান্য জ্বালানি কি নিশ্চিত করা যাচ্ছে?
যদি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকে কিন্তু জ্বালানি না থাকে, তাহলে স্থাপিত সক্ষমতা কাগজেই থেকে যায়। আবার জ্বালানি থাকলেও যদি গ্রিড ও বিতরণব্যবস্থা দুর্বল হয়, তাহলেও গ্রাহকের কাছে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সুতরাং বর্তমান সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ পরিকল্পনার দুর্বলতাগুলো নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
সংকট থেকে বের হতে কী প্রয়োজন?
তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ কার্যকর উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং জাতীয় গ্রিডে চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।
একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। কারণ একটি উপকেন্দ্র বা গ্রিডে হামলা হলে শুধু একটি এলাকার নয়, বৃহত্তর অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহও বিঘ্নিত হতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে আরও একটি কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—আমরা কি শুধু সংকট দেখা দিলে সমাধান করার চেষ্টা করব, নাকি ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আগাম পরিকল্পনা করব?
শেষ কথা
৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া নিছক নিরাপত্তা চাওয়ার ঘটনা নয়; এটি বিদ্যুৎ সংকটের সামাজিক অভিঘাত কতটা বাড়ছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
মানুষ যখন দিনের পর দিন গরমের মধ্যে বিদ্যুৎহীন থাকে, তখন ক্ষোভ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি বিদ্যুৎ অফিস বা স্থাপনায় হামলায় রূপ নেয়, তাহলে সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও বিপর্যস্ত হতে পারে।
তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—মানুষের ভোগান্তি কমানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি নিশ্চিত করা, গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানো এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বর্তমান পরিস্থিতি হয়তো সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু এই সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা—বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও জনগণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবে না।













