স্ত্রীসহ ফারইস্ট লাইফের সাবেক চেয়ারম্যানের সম্পদ ক্রোক
- Update Time : ০২:১৩:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১২৫ Time View

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা ৫৭ কোটি ৬১ লাখ টাকারও বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা কথিত অবৈধ সম্পদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও আইনি ব্যবস্থা নিতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আদালতের আদেশে সম্পদ ক্রোক
ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. শাহজাহান কবির দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ ক্রোক আদেশ জারি করেন।
দুদক সূত্রে জানা যায়, অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান দুদক বিধিমালা, ২০০৭ (সংশোধিত ২০১৯)-এর বিধি ১৮ অনুযায়ী নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা স্থাবর সম্পদ ক্রোকের আবেদন করেন।
আদালতের পর্যালোচনায় উঠে আসে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাধারণ গ্রাহকদের সঞ্চয়ের অর্থ আত্মসাৎ, বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা এফডিআর নিয়ে অনিয়ম এবং প্রতিষ্ঠানের নামে অতিরিক্ত দামে জমি কেনার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
দুদকের আশঙ্কা, সম্পদ ক্রোক করা না হলে অভিযুক্তরা তা হস্তান্তর, বিক্রি কিংবা বিদেশে পাচার করতে পারেন। এ কারণে আদালত সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিনিময় না করার নির্দেশ দিয়েছেন।
যেসব জেলায় সম্পদ হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ, মুন্সীগঞ্জ, পটুয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের জেলা রেজিস্ট্রারদের ক্রোককৃত স্থাবর সম্পদ কোনো অবস্থাতেই হস্তান্তর বা বিনিময় না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর সম্পদের বিবরণ
আদালতের আদেশে পৃথক দুটি ছকে নজরুল ইসলাম ও তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা জমি, প্লট, বাড়ি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পদের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
নজরুল ইসলামের নামে থাকা সম্পদ
রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, ভালুকা, কুয়াকাটা, রূপগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে থাকা মোট ২০টি দলিলের সম্পদের সরকারি ক্রয়মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা।
উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে—
- গুলশানে ৮ কাঠা জমি ও বাড়ি, যার দলিলমূল্য ১০ কোটি টাকা।
- পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় ৬ দশমিক ১৮ একর জমি, যার দলিলমূল্য ১০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
- রাজধানীর উত্তরায় ২১ দশমিক ২১ কাঠা জমি।
- বিভিন্ন এলাকায় থাকা অন্যান্য জমি ও স্থাবর সম্পদ।
তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা সম্পদ
নজরুল ইসলামের স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে গুলশান, খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, বাড্ডা, সূত্রাপুর, টঙ্গীবাড়ী ও গাজীপুরে থাকা মোট ২২টি দলিলের স্থাবর সম্পদের সরকারি ক্রয়মূল্য ১৯ কোটি ২২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে—
- গুলশান ও বাড্ডায় বিভিন্ন ফ্ল্যাট ও জমি।
- খিলক্ষেতে আবাসিক প্লট ও ভবন।
- সূত্রাপুর, টঙ্গীবাড়ী ও গাজীপুরে থাকা অন্যান্য স্থাবর সম্পদ।
মোট সম্পদের মূল্য ৫৭ কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি
আদালতের আদেশে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা সম্পদের মোট সরকারি ক্রয়মূল্য ৫৭ কোটি ৬১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।
তবে এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য সরকারি ক্রয়মূল্যের তুলনায় বহুগুণ বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে উল্লেখ্য, সম্পদ ক্রোকের আদেশে সরকারি ক্রয়মূল্য বিবেচনা করা হয়েছে। বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য পৃথক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
দুদকের একাধিক মামলা
নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয় (সজেকা), ঢাকা-১-এ একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
দুদক সূত্রে উল্লেখিত মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- মামলা নম্বর ০১ ও ০২ — ৮ মার্চ ২০২২
- মামলা নম্বর ১৮ — ৮ মার্চ ২০২২
- মামলা নম্বর ০৪ — ১২ আগস্ট ২০২২
- মামলা নম্বর ০৪ — ৯ মে ২০২৩
- মামলা নম্বর ০৪ — ৭ এপ্রিল ২০২৩
- মামলা নম্বর ৩৫ — ৩১ জুলাই ২০২৫
২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকা-১-এর মামলা নম্বর ৩৫-এ নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের অনুমতিতে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ডে তিনি বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের তথ্য দিয়েছেন বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের বিষয়ে আইনি উদ্যোগ
নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে থাকা দেশীয় সম্পদের পাশাপাশি বিদেশে পাচার করা কথিত সম্পদ এবং যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাড়ির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইনি তথ্য বিনিময় ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের প্রত্যাশা
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের সাধারণ গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক চেয়ারম্যানের সম্পদ ক্রোকের আদেশকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদপূর্তির টাকা ও বীমা দাবির অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে আত্মসাৎ ও অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গ্রাহকদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশা বীমা গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট মহলের।












