সেতুতে রডের বদলে বাঁশ: বদলিই কি এই কাজের শাস্তির জন্য যথেষ্ট?
- Update Time : ০৫:৪১:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৮ Time View

টাঙ্গাইলের বাসাইলে প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ শুধু একটি নির্মাণকাজের অনিয়মের ঘটনা নয়; এটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর নির্মাণাধীন প্রায় ৯০ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এমন একটি বড় প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরির সময় রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাইয়ের চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়রা বাধা দিলে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও পরে আবার রাতে ঢালাই সম্পন্ন করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।

ঘটনার পর প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা শুরু হয়েছে। দুদক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিকভাবে নির্মাণকাজে রডের ঘাটতি থাকার বিষয়টি দেখতে পেয়েছে বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। এলজিইডির একজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং একজন সাব-ঠিকাদারকে গ্রেপ্তারের কথাও জানানো হয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—বদলি বা সাময়িক বরখাস্তই যেন তদন্তের শেষ ধাপ না হয়। প্রকল্পে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, কার দায়িত্ব কোথায় ছিল, নির্মাণসামগ্রীর অনুমোদিত নকশা ও স্পেসিফিকেশন কী ছিল, ব্যবহৃত উপকরণের মান কতটা ঠিক ছিল এবং সরকারি অর্থের কোনো অপচয় বা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
একটি সেতু কেবল ইট, বালু, সিমেন্ট ও রডের সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে মানুষের জীবন, চলাচলের নিরাপত্তা এবং বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ জড়িত। নির্মাণকাজে নিম্নমানের বা অনুমোদনবহির্ভূত উপকরণ ব্যবহার করা হলে তা ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যে অবকাঠামো বহু বছর মানুষের ব্যবহার করার কথা, তার নির্মাণে কোনো ধরনের আপস গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তদারকি ব্যবস্থা। স্থানীয় মানুষ যদি নির্মাণকাজের অনিয়ম দেখতে পান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—নিয়মিত প্রকৌশলগত পরিদর্শন ও মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল? সরকারি প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের শুধু কাগজপত্রে নয়, বাস্তব নির্মাণস্থলেও নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে দুর্নীতির দায় আরোপ করাও সমীচীন নয়। অভিযোগের সত্যতা, দায়িত্বের সীমা এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ যথাযথ তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারি সব অবকাঠামো প্রকল্পে আরও শক্তিশালী মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। নির্মাণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে ছবি ও ভিডিওভিত্তিক নথি, উপকরণের মান পরীক্ষা, প্রকৌশলীদের নিয়মিত পরিদর্শন এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কারিগরি যাচাই চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
জনগণের করের টাকা দিয়ে নির্মিত প্রতিটি সেতু, রাস্তা, কালভার্ট কিংবা ভবন জনগণের সম্পদ। সেখানে রডের জায়গায় বাঁশ কিংবা মানসম্মত উপকরণের পরিবর্তে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কোনো অভিযোগই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
বাসাইলের এই ঘটনা তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণকাজ সরকারি অর্থের অপচয় না ঘটিয়ে যথাযথ মানে পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
উন্নয়ন শুধু প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না; উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় নির্মাণের মান, মানুষের নিরাপত্তা এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে।















