এনভিডিয়া সিইওর সঙ্গে চীনা গুপ্তচরের প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগ, তদন্তে নামছে মার্কিন কংগ্রেস
- Update Time : ০৪:৪৪:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
- / ৭৮ Time View

বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জেনসেন হুয়াংয়ের সঙ্গে চীনের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা এক নারীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই নারী ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে হুয়াংয়ের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ও ব্যবসায়িক তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বিষয়টি সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ঘটনাটি তদন্তে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে মার্কিন কংগ্রেস।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরের শুরুর দিকে একটি গোপন স্মারক তৈরি করা হয়। এতে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেগাস্পিডের নির্বাহী অ্যালিস হুয়াংয়ের সঙ্গে জেনসেন হুয়াংয়ের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। মেগাস্পিড এনভিডিয়ার একটি গ্রাহক প্রতিষ্ঠান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে ওই গোপন স্মারকটি পাঠানো হয়েছিল।
চীনের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অ্যালিস হুয়াং চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করছিলেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত চিপ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা। একই সঙ্গে এনভিডিয়ার সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চীনের কাছে বিক্রির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, জেনসেন হুয়াংয়ের সঙ্গে অ্যালিস হুয়াংয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে তাঁদের ধারণা। তবে তাঁদের পরিচয় কীভাবে হয়েছিল কিংবা সম্পর্কের সূত্রপাত কখন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
কংগ্রেসের দ্বিদলীয় তদন্তের উদ্যোগ
ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় কংগ্রেসের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আগ্রহী হয়েছে। আগামী জানুয়ারি থেকে সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে যাওয়া ডেলাওয়্যারের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস পূর্ণাঙ্গ কংগ্রেসীয় তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বিষয়টিকে ট্রাম্প প্রশাসন, চীনা গুপ্তচর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, কংগ্রেস এ বিষয়ে তদন্ত করবে এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জবাব চাইবে।
এদিকে প্রতিনিধি পরিষদের চীনবিষয়ক, পররাষ্ট্রবিষয়ক ও গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির রিপাবলিকান নেতারা জেনসেন হুয়াংকে আগামী ১১ নভেম্বরের মধ্যে উপস্থিত হয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁদের মূল উদ্বেগ, এই অভিযোগের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার কোনো ঝুঁকি জড়িত কি না।
অভিযোগ অস্বীকার এনভিডিয়া ও চীনের
তবে জেনসেন হুয়াং এবং এনভিডিয়া কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, অ্যালিস হুয়াংয়ের সঙ্গে জেনসেন হুয়াংয়ের যোগাযোগ ছিল সম্পূর্ণ পেশাগত ও ব্যবসায়িক। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী প্রতিবছর হাজার হাজার গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অ্যালিসের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
এনভিডিয়ার দাবি, ওই নারীর সঙ্গে কোনো সংবেদনশীল তথ্য আদান-প্রদান করা হয়নি এবং কোনো অনিয়মের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
চীন সরকারও এ ধরনের গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, অ্যালিস হুয়াংয়ের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
চিপ রপ্তানি নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক
এনভিডিয়া ও চীনের মধ্যকার প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে একটি চীনা গেমিং প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথক হয়ে মেগাস্পিড প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চীনে অবৈধভাবে উন্নত প্রযুক্তির চিপ পাচারের আশঙ্কায় দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত চালিয়ে আসছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
এনভিডিয়াও এর আগে নিজেদের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চালিয়ে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছে।
চীনে এনভিডিয়ার উন্নত চিপ বিক্রির অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যেও একাধিকবার মতবিরোধ দেখা গেছে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও এনভিডিয়ার চিপ বিভিন্ন চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে পৌঁছানোর অভিযোগও রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুর দিকে জেনসেন হুয়াং ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে চীনে এনভিডিয়ার তৈরি এইচ২০০ (H200) চিপ রপ্তানির অনুমতি চেয়ে তদবির করেছিলেন। ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সঙ্গে হুয়াংয়ের একাধিক বৈঠকও হয়েছে।
সব মিলিয়ে, জেনসেন হুয়াংকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ এখন শুধু একজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিগত আধিপত্য, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং উন্নত সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি নীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি। কংগ্রেসের সম্ভাব্য তদন্তে এ বিষয়ে নতুন তথ্য উঠে আসে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।









