বিয়েতে দেরি হলে কী করবেন? ইসলামের আলোকে জেনে নিন করণীয়
- Update Time : ১১:১৮:১১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ৫১ Time View

বিয়ে শুধু দুজন মানুষের বন্ধন নয়; বরং ভালোবাসা, প্রশান্তি, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তোলার বৈধ ও পবিত্র মাধ্যম। ইসলামে বিয়েকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে আল্লাহর বিশেষ নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কিন্তু বর্তমান সময়ে আর্থিক অসচ্ছলতা, অতিরিক্ত সামাজিক প্রত্যাশা, উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজে না পাওয়া কিংবা পারিবারিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেকের বিয়ে বিলম্বিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে গিয়ে কেউ কেউ হতাশা ও মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামের শিক্ষা হলো—আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং বাস্তবসম্মত উপায়ে বিয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
তবে মনে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট কোনো আমল করলেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিয়ে হবে—এমন নিশ্চয়তা কোরআন-হাদিসে নেই। বরং দোয়া, ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও বৈধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করাই মুমিনের করণীয়।
বিয়ের বিষয়ে কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন—
আরবি:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
অর্থ: “আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।”
—সুরা আর-রুম, আয়াত ২১।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে।”
—সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০৬৬।
১. বেশি বেশি দোয়া করুন
দোয়া মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বিয়ের জন্য আল্লাহর কাছে একজন সৎ, দ্বীনদার, উত্তম চরিত্রের ও দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গী চাওয়া যায়। পাশাপাশি নিজের চরিত্র সংশোধন, হালাল উপার্জনের ব্যবস্থা এবং বিয়ের প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্যও দোয়া করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
আরবি:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
অর্থ: “আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন (বলে দাও) আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।”
—সুরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৬।
নিজের ভাষায় আন্তরিকভাবে দোয়া করতে পারেন। যেমন, “হে আল্লাহ! আমার জন্য একজন নেককার ও উত্তম জীবনসঙ্গী নির্ধারণ করুন। আমার বিয়ের পথ সহজ করে দিন এবং আমাকে এমন পরিবার গঠনের তাওফিক দিন, যে পরিবার আপনার সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক হবে।”
দোয়ার পাশাপাশি পরিবার ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সহযোগিতায় উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী খোঁজার চেষ্টা করুন।
২. কোরআনের এই দোয়াটি পড়ুন
নেককার জীবনসঙ্গী ও প্রশান্তিময় পরিবার লাভের জন্য পবিত্র কোরআনের একটি সুন্দর দোয়া রয়েছে। দোয়াটি সুরা আল-ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরবি:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণ: রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউনিন, ওয়াজ‘আলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখের প্রশান্তি দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।”
—সুরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪।
এই দোয়ায় শুধু জীবনসঙ্গী লাভের আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এমন একটি পরিবার গঠনের প্রার্থনাও রয়েছে, যে পরিবার ঈমান, নৈতিকতা ও নেক আমলের পথে চলতে সাহায্য করবে।
ফরজ নামাজের পর, নফল নামাজের সময় কিংবা অন্য যেকোনো সময়ে দোয়াটি পড়তে পারেন। তবে বিয়ে হওয়ার জন্য এটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়তেই হবে—এমন কোনো সহিহ দলিল নেই।
৩. নফল নামাজ আদায় করে আল্লাহর সাহায্য চান
জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিয়ের বিষয়ে দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা কিংবা পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা থাকলে নফল নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন তুলে ধরতে পারেন।
হজরত হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কোনো কঠিন বিষয় উপস্থিত হলে তিনি নামাজ আদায় করতেন।
—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৩১৯।
নামাজের পর আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা বলুন। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচন এবং বিয়ের পথে থাকা বাধা দূর করার জন্য সাহায্য চান। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারার নামাজ ও দোয়াও করা যায়।
বিয়ের জন্য আরও যে বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি
বিয়ে সহজ করার জন্য শুধু আমল নয়, বাস্তব উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
- বিয়েতে অযৌক্তিক খরচ, যৌতুকের দাবি ও অতিরিক্ত সামাজিক প্রত্যাশা পরিহার করুন।
- পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে বাহ্যিক সৌন্দর্য ও সম্পদের পাশাপাশি চরিত্র, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিন।
- উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজতে পরিবার ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সহযোগিতা নিন।
- সামর্থ্য অনুযায়ী হালাল উপার্জন ও সংসারের দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিন।
- বিয়ে বিলম্বিত হলে নিজেকে দোষারোপ করবেন না; ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
মনে রাখতে হবে, বিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তাই তাড়াহুড়া করে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচন, পারস্পরিক সম্মতি এবং ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
পরিশেষে, দোয়া, নফল ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও বৈধ প্রচেষ্টার সমন্বয়েই বিয়ের পথ সহজ করার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহর কাছে কল্যাণকর জীবনসঙ্গী প্রার্থনা করুন এবং তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখুন। কারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণের সময় ও পদ্ধতি সব সময় এক রকম হয় না; তবে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো সৎ পথে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর রহমতের আশা না হারানো।









