ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে ফেরার নিশ্চয়তা কোথায়?
- Update Time : ০৬:৪৭:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
- / ৬৬ Time View

উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় সড়ক, সেতু, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়। উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন একজন মানুষ নির্ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেন, একজন অভিভাবক নিশ্চিন্তে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন এবং একজন ব্যবসায়ী নিজের উপার্জন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে কাজ করতে পারেন। কিন্তু সমাজে যখন খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, অপহরণ ও অন্যান্য অপরাধের আশঙ্কা মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে, তখন উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দেয়। প্রশ্ন জাগে—নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতির দাবি কতটা অর্থবহ?
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় জননিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অপরাধের খবর শুধু সংবাদপত্রের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষের মনেও ভয় সৃষ্টি করে। একটি অপরাধের শিকার হন একজন ব্যক্তি, কিন্তু সেই ঘটনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য মানুষের মধ্যে। কোনো শিশুর নিখোঁজ হওয়া কিংবা হত্যার খবর অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। ছিনতাইয়ের ঘটনা সাধারণ মানুষকে চলাচলে সতর্ক করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চুরি বা ডাকাতির আশঙ্কা উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এভাবে অপরাধের প্রত্যক্ষ শিকার ছাড়াও পুরো সমাজ নিরাপত্তাহীনতার বোঝা বহন করে।
সম্প্রতি নাটোরে এক জার্মান পর্যটকের ল্যাপটপ ও মুঠোফোন হারিয়ে যাওয়ার পর সেগুলো উদ্ধারের জন্য তাঁকে বারবার থানায় যেতে হয়েছে বলে যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ সৃষ্টি করে। একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসে এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে তাঁর ব্যক্তিগত ভোগান্তির পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। তবে এখানে মূল বিবেচ্য বিষয় তাঁর বিদেশি পরিচয় নয়; বরং একজন নাগরিক কিংবা পর্যটকের অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং প্রতিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা আন্তরিক ও কার্যকর।
একইভাবে, কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ ধানখেতে পাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। একটি শিশুর স্বাভাবিক চলাফেরাও যদি প্রাণহানির আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সমাজের অভিভাবকত্ব ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সামগ্রিক সামাজিক ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
এ ধরনের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করা, অপরাধের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। কোনো একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর সাময়িক ক্ষোভ প্রকাশ কিংবা আশ্বাস প্রদানই যথেষ্ট নয়। তদন্তের অগ্রগতি, অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
অন্যদিকে, খুলনায় পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা এবং বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার খবরও উদ্বেগের বিষয়। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা যদি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, পুলিশের প্রতি আস্থা কেবল বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের আচরণ, অভিযোগ গ্রহণের আন্তরিকতা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের গুরুত্বই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য। অপরাধী রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হোন কিংবা সামাজিকভাবে পরিচিত—কোনো পরিচয়ই তাঁকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না। আবার অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এবং স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা গেলে অপরাধ দমনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।
জননিরাপত্তার সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্পর্কও গভীর। কোনো দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ বিবেচনা করার সময় উদ্যোক্তারা শুধু বাজারের আকার কিংবা শ্রমের প্রাপ্যতা দেখেন না; তাঁরা সম্পদের নিরাপত্তা, চুক্তি বাস্তবায়ন, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আইনের শাসনের নিশ্চয়তাও বিবেচনা করেন। ব্যবসায়ী যদি নিজের প্রতিষ্ঠান, কর্মী কিংবা পণ্য নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে তাঁর ব্যয় ও ঝুঁকি বেড়ে যায়। নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অতএব, নিরাপত্তা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক অগ্রগতিরও অন্যতম ভিত্তি। উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে তাঁদের জীবন, জীবিকা ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যে সমাজে মানুষ ভয় নিয়ে জীবনযাপন করে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ক্ষেত্রে পুলিশের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, অপরাধপ্রবণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি, জরুরি অভিযোগে দ্রুত সাড়া প্রদান এবং আধুনিক তদন্তপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। চুরি, প্রতারণা কিংবা সম্পত্তিসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ ও অগ্রগতি জানাতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি পুলিশের জবাবদিহি, মানবাধিকার রক্ষা এবং তদন্তের মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে কেবল পুলিশি তৎপরতা বাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। অপরাধের পেছনে কাজ করা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। মাদক, কিশোর অপরাধ, পারিবারিক সহিংসতা, অনলাইন প্রতারণা এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগও জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অপরাধের খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা। যাচাই না করা তথ্য, গুজব কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্য মানুষের আতঙ্ক বাড়াতে পারে। গণমাধ্যমের দায়িত্ব অপরাধের খবর প্রকাশের পাশাপাশি তথ্য যাচাই করা, তদন্তের স্বার্থ রক্ষা করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত জনগণকে সময়মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য জানানো, যাতে গুজব ও অনিশ্চয়তা বিস্তার লাভ করতে না পারে।
রাষ্ট্রের কাছে মানুষের প্রত্যাশা খুবই মৌলিক—তাঁরা নিরাপদে চলাফেরা করতে চান, সন্তানদের সুরক্ষা চান, অন্যায়ের শিকার হলে প্রতিকার চান এবং অপরাধীর বিচার দেখতে চান। এসব প্রত্যাশা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; নাগরিক হিসেবে এগুলো তাঁদের ন্যায্য অধিকার। তাই জননিরাপত্তার প্রশ্নকে রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা সাময়িক সংবাদচক্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু কতটা উন্নয়ন হয়েছে, তা দিয়ে নয়; সেই উন্নয়নের মধ্যে মানুষ কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করতে পারছেন, তা দিয়েও বিচার করতে হবে। অপরাধ ঘটলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর প্রতি সহায়তা, অপরাধীর আইনানুগ বিচার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া স্থায়ী জনআস্থা অর্জন সম্ভব নয়।
নিরাপত্তাহীন সমাজে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত ঝুঁকি হিসাব করে; নিরাপদ সমাজে মানুষ ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখে। বাংলাদেশকে কোন পথে এগিয়ে নিতে চাই, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জননিরাপত্তার প্রশ্নটি অবিচ্ছেদ্য। নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়, দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে আর অবহেলা নয়—কার্যকর পদক্ষেপ, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ এবং দৃশ্যমান জবাবদিহিই হোক সময়ের দাবি।
প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়—মানুষ যদি নিজের ঘর, পথঘাট, সন্তান ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েই অনিশ্চয়তায় থাকে, তবে একটি সমাজ আর কত দূর এগোতে পারবে?









