মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও নতুন যৌনজীবনের খোঁজ
- Update Time : ১১:৫৬:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৬৪ Time View

চিকিৎসকেরা যখন কোনো রোগীকে জানিয়ে দেন—“আর ভালো হওয়ার আশা নেই, আয়ু ফুরিয়ে আসছে”—তখন মানুষের মনে কী চলে? ভয়, দুঃখ, অনুশোচনা, পরিবারকে আঁকড়ে ধরার আকুতি—এসবই স্বাভাবিক অনুমান। কিন্তু একটি বাস্তব গল্প এই সব ধারণাকেই ভেঙে দিয়েছে। কারণ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এক নারী ভেবেছিলেন তাঁর অপূর্ণ যৌনজীবনের কথা। জীবনের শেষ সময়টুকুতে তিনি নতুন করে যৌনতা, সম্পর্ক আর নিজের চাওয়াকে আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন।
এই বিস্ময়কর, সাহসী এবং আলোড়ন জাগানো সত্যি ঘটনাকে অবলম্বন করেই তৈরি হয়েছে ওয়েব সিরিজ ‘ডাইং ফর সেক্স’ (Dying for Sex)। সিরিজটি মুক্তি পাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। আর সম্প্রতি এই সিরিজে অভিনয়ের জন্য গোল্ডেন গ্লোবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন হলিউড তারকা মিশেল উইলিয়ামস।

মরণব্যাধির মুখোমুখি এক জীবন
মলি কোচান নামের এক নারী দীর্ঘদিন স্তন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। ২০১৫ সালের মধ্যেই তিনি কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি, দুই স্তন অপসারণ (বাইল্যাটারাল মাসটেকটমি) এবং স্তন পুনর্গঠন অস্ত্রোপচারসহ প্রায় সব ধরনের চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যান। একসময় মনে হয়েছিল তিনি হয়তো এই যুদ্ধ জিতে গেছেন।
কিন্তু সেই আশায় ভাঙন ধরে, যখন চিকিৎসকেরা জানান—ক্যানসার ফিরে এসেছে এবং তা চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পর্যায়ে রোগ আর নিরাময়যোগ্য নয়। বলা হয়, তাঁর আয়ু হতে পারে কয়েক মাস, বড়জোর কয়েক বছর।
এই কঠিন সত্য জানার পর মলির জীবনে আসে এক অভাবনীয় মোড়।

স্বামীকে ছেড়ে, নিজের জীবনের দিকে ফেরা
ক্যানসার ধরা পড়ার আগেই মলির দাম্পত্য জীবনে সমস্যা ছিল। তিনি নিজেই পডকাস্টে বলেছেন, রোগ আসার ঠিক আগে তিনি সংসারটাকে নতুন করে প্রাণবন্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্যানসার সবকিছু বদলে দেয়।
চতুর্থ পর্যায়ের ক্যানসারের খবর পাওয়ার পর মলি সিদ্ধান্ত নেন—জীবনের শেষ অধ্যায় তিনি আর আপস করে কাটাবেন না। তিনি স্বামীকে ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন নিজের ইচ্ছা, চাওয়া আর শরীরকে নতুন করে আবিষ্কারের পথে। তিনি ঠিক করেন, বাকি জীবনটা তিনি নিজের মতো করেই বাঁচবেন।
এই যাত্রায় তাঁর পাশে ছিলেন সবচেয়ে কাছের বন্ধু নিকি বয়ার।

পডকাস্টের জন্ম: ‘ডাইং ফর সেক্স’
২০১৮ সালের এক দুপুরে, খাবার টেবিলে বসে মলি আর নিকির কথোপকথন থেকেই জন্ম নেয় একটি ব্যতিক্রমী ধারণা। মলি সেদিন জানান, দুপুরের আগেই তিনি দুটি ডেটে গিয়েছেন। সেখান থেকেই আসে পডকাস্ট করার ভাবনা।
২০২০ সালে ওয়ান্ডেরি থেকে প্রকাশিত হয় ছয় পর্বের পডকাস্ট ‘ডাইং ফর সেক্স’। এতে মলি প্রায় ২০০টির কাছাকাছি যৌন অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কের গল্প অকপটে তুলে ধরেন। তবে এটি কেবল যৌনতার গল্প নয়—এটি ছিল ভয়, ট্রমা, আত্মপরিচয় আর মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবনের অর্থ খোঁজার গল্প।
মলির মৃত্যুর এক বছর পর প্রকাশিত এই পডকাস্ট এখন পর্যন্ত ৫০ লাখের বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে।
পডকাস্ট থেকে টিভি সিরিজ
২০১৯ সালে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে মলি কোচান মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি লেখেন আত্মজীবনী ‘স্ক্রু ক্যানসার: বিকামিং হোল’, যা প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে।
এই গল্পের বড় ভক্ত ছিলেন জনপ্রিয় সিরিজ নিউ গার্ল-এর নির্মাতা এলিজাবেথ মেরিওয়েদার। নিকি বয়ারের সঙ্গে যৌথভাবে তিনিই পডকাস্ট ও বইয়ের গল্পকে রূপ দেন টিভি সিরিজ ‘ডাইং ফর সেক্স’-এ। সিরিজটি প্রচারিত হয় এফএক্স ও হুলুতে।
সিরিজে মলির চরিত্রে অভিনয় করেন মিশেল উইলিয়ামস এবং নিকির চরিত্রে অভিনয় করেন জেনি স্লেট। বাস্তব জীবনের নিকি বয়ার এই সিরিজের নির্বাহী প্রযোজকদের একজন।

সিরিজে কী দেখানো হয়েছে
সিরিজের শুরুতেই এক প্যালিয়েটিভ কেয়ার থেরাপিস্ট মলিকে জিজ্ঞেস করেন—তিনি যদি একটি ‘বাকেট লিস্ট’ বানান, সেখানে কী রাখবেন? তখনই মলি বুঝতে পারেন, তিনি জীবনের শেষ সময়ে যৌনতা, ডেটিং আর সত্যিকারের ভালো লাগাকে অগ্রাধিকার দিতে চান।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য তিনি—
- সদিচ্ছাপূর্ণ কিন্তু আবেগগতভাবে দূরত্বপূর্ণ স্বামীকে ছেড়ে যান
- সবচেয়ে কাছের বন্ধু নিকিকে তাঁর প্রধান পরিচর্যাকারী হওয়ার অনুরোধ করেন
- অনলাইনে পরিচিত পুরুষদের সঙ্গে দেখা করতে শুরু করেন, সম্পর্ক গড়েন, নিজের শরীর ও চাওয়াকে নতুন করে গ্রহণ করেন
নিকি বয়ার পরে টাইম সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, সিরিজে তাঁদের বন্ধুত্বের আবেগগত সত্যটি খুব ভালোভাবে উঠে এসেছে, যদিও কিছু জায়গায় সৃজনশীল স্বাধীনতা নেওয়া হয়েছে।
কেন এই গল্প আলাদা
‘ডাইং ফর সেক্স’ কেবল যৌনতার গল্প নয়। এটি জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের সত্যটাকে খুঁজে পাওয়ার গল্প। এটি ভয়কে অতিক্রম করার, শরীরকে গ্রহণ করার, অপূর্ণতাকে আলিঙ্গন করার গল্প।
নিকি বয়ারের ভাষায়,
“মলি হাসপাতালে আটকে থাকা মানুষ হতে চায়নি। সে প্রেমে পড়তে চেয়েছিল। আর শেষ পর্যন্ত সে নিজের প্রেমেই পড়েছিল। জীবনের শেষের জন্য যেসব কাজ রেখে দেন—সেগুলো শুরু করে দিন এখনই।”
এই কারণেই ‘ডাইং ফর সেক্স’ শুধু একটি সিরিজ নয়, এটি জীবনের প্রতি এক সাহসী দর্শন।
ই! নিউজ ও টাইম অবলম্বনে
















