সময়: শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুসলিম ছাত্রীদের জন্য বিদ্যালয়ে হিজাব নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে যে দেশ

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৪:৫৬:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১৭৮ Time View

 

অস্ট্রিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ১৪ বছরের কম বয়সী স্কুলছাত্রীদের জন্য হিজাব পরিধান নিষিদ্ধ করতে একটি নতুন আইন পাসের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার দেশটির সংসদে আইনটি উপস্থাপন করা হবে এবং সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এটি সহজেই অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের দাবি—এই আইন কন্যাশিশুদের “দমন, নিপীড়ন ও সামাজিক চাপ” থেকে সুরক্ষা দিতেই প্রস্তাব করা হয়েছে।

আগের আইন আদালতে বাতিল হলেও—সরকারের নতুন দাবি: এবার আইনটি ‘সাংবিধানিক’

২০১৯ সালে অস্ট্রিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিজাব নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু অস্ট্রিয়ার সাংবিধানিক আদালত এই সিদ্ধান্তকে “অন্যায়, বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানবিরোধী” বলে বাতিল করে। আদালত যুক্তি দিয়েছিল—একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পোশাককে টার্গেট করা সমতার নীতির পরিপন্থী।
তবে নতুন খসড়া আইনের ক্ষেত্রে সরকার বলছে—
এবার আইনটির ভাষা কাঠামো সাংবিধানিকভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে এবং ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ এড়ানো হয়েছে।”

নতুন আইন পাস হলে—স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধের নিয়ম এমন হবে

আইনটি পাস হলে—

  • ১৪ বছরের কম কোনো শিক্ষার্থী ইসলামি রীতি অনুযায়ী মাথা ঢেকে রাখা হিজাব বা অনুরূপ ঘোমটা স্কুলে পরতে পারবে না।
  • সেপ্টেম্বর থেকে আইন কার্যকর হবে।
  • ফেব্রুয়ারি থেকে স্কুলগুলোতে ‘পরিচিতি পর্ব’ শুরু হবে—এ সময় নিয়ম ভাঙলে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না
  • তবে বারবার নিয়ম অমান্য করলে শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের ১৫০ থেকে ৮০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করা হবে।

সরকারের যুক্তি: “এটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং নিপীড়ন”

আইন উপস্থাপনকালে ইন্টিগ্রেশন মন্ত্রী ক্লাউডিয়া প্লাকোল্ম বলেন—
যখন একটি মেয়েকে বলা হয়, পুরুষের দৃষ্টির কারণে তাকে শরীর ঢেকে রাখতে হবে—এটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং নিপীড়ন। মেয়েদের স্বাধীনতা রক্ষাই আমাদের লক্ষ্য।”

সরকার আরও বলছে—বাল্যবয়সে ধর্মীয় পোশাক চাপিয়ে দেওয়া সাংস্কৃতিক ‘গেটো সৃষ্টি’ করে এবং অস্ট্রিয়ান মূলধারার সমাজে অন্তর্ভুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে।

মানবাধিকার

সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনা

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রিয়া আইনটিকে আখ্যা দিয়েছে—
মুসলিম মেয়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বৈষম্য”
এবং বলেছে—
এই আইন ইসলামবিরোধী বর্ণবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।”

আরও বলা হয়েছে—
এই নিষেধাজ্ঞা মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে ভুল ধারণা, ঘৃণা ও পূর্বধারণাকে আরও উসকে দিতে পারে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া—“এটি সামাজিক সংহতিকে ধ্বংস করবে”

অস্ট্রিয়ার মুসলিমদের সরকারি প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন IGGÖ আইনটির বিরোধিতা করে বলেছে—
এই নিষেধাজ্ঞা শিশুদের ক্ষমতায়নের বদলে তাদের কলঙ্কিত করবে, বিচ্ছিন্ন করবে এবং সামাজিক সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।”

নারী–অধিকার অ্যান্টি–রেসিজম সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

  • নারী অধিকার সংগঠন আমাজোনে–এর পরিচালক অ্যাঞ্জেলিকা অ্যাটসিঙ্গার বলেন—
    হিজাব নিষিদ্ধের উদ্যোগ মেয়েদের কাছে ভুল বার্তা পাঠাবে—অন্যরা তাদের শরীর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেটি গ্রহণযোগ্য।”
  • অ্যান্টি–রেসিজম সংগঠন SOS Mitmensch আইনটি “বৈষম্যমূলক” মন্তব্য করে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

অস্ট্রিয়ার অভিবাসন–রাজনীতি ইসলামবিদ্বেষের প্রেক্ষাপট

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষিণপন্থি রাজনীতির উত্থানের ফলে ধর্মীয় পোশাক, হিজাব এবং মুসলিম অভিবাসীদের বিষয়ে নানা কঠোর নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। অস্ট্রিয়াও সেই প্রবণতারই অংশ।
হিজাব নিষিদ্ধের প্রস্তাব তাই শুধু শিক্ষা–নীতি নয়, বরং অভিবাসন–রাজনীতি ইসলামভীতি ঘিরে বৃহত্তর বিতর্কের অংশে পরিণত হয়েছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মুসলিম ছাত্রীদের জন্য বিদ্যালয়ে হিজাব নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে যে দেশ

Update Time : ০৪:৫৬:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

 

অস্ট্রিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার ১৪ বছরের কম বয়সী স্কুলছাত্রীদের জন্য হিজাব পরিধান নিষিদ্ধ করতে একটি নতুন আইন পাসের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার দেশটির সংসদে আইনটি উপস্থাপন করা হবে এবং সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এটি সহজেই অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের দাবি—এই আইন কন্যাশিশুদের “দমন, নিপীড়ন ও সামাজিক চাপ” থেকে সুরক্ষা দিতেই প্রস্তাব করা হয়েছে।

আগের আইন আদালতে বাতিল হলেও—সরকারের নতুন দাবি: এবার আইনটি ‘সাংবিধানিক’

২০১৯ সালে অস্ট্রিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিজাব নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু অস্ট্রিয়ার সাংবিধানিক আদালত এই সিদ্ধান্তকে “অন্যায়, বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানবিরোধী” বলে বাতিল করে। আদালত যুক্তি দিয়েছিল—একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পোশাককে টার্গেট করা সমতার নীতির পরিপন্থী।
তবে নতুন খসড়া আইনের ক্ষেত্রে সরকার বলছে—
এবার আইনটির ভাষা কাঠামো সাংবিধানিকভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে এবং ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ এড়ানো হয়েছে।”

নতুন আইন পাস হলে—স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধের নিয়ম এমন হবে

আইনটি পাস হলে—

  • ১৪ বছরের কম কোনো শিক্ষার্থী ইসলামি রীতি অনুযায়ী মাথা ঢেকে রাখা হিজাব বা অনুরূপ ঘোমটা স্কুলে পরতে পারবে না।
  • সেপ্টেম্বর থেকে আইন কার্যকর হবে।
  • ফেব্রুয়ারি থেকে স্কুলগুলোতে ‘পরিচিতি পর্ব’ শুরু হবে—এ সময় নিয়ম ভাঙলে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না
  • তবে বারবার নিয়ম অমান্য করলে শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের ১৫০ থেকে ৮০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করা হবে।

সরকারের যুক্তি: “এটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং নিপীড়ন”

আইন উপস্থাপনকালে ইন্টিগ্রেশন মন্ত্রী ক্লাউডিয়া প্লাকোল্ম বলেন—
যখন একটি মেয়েকে বলা হয়, পুরুষের দৃষ্টির কারণে তাকে শরীর ঢেকে রাখতে হবে—এটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং নিপীড়ন। মেয়েদের স্বাধীনতা রক্ষাই আমাদের লক্ষ্য।”

সরকার আরও বলছে—বাল্যবয়সে ধর্মীয় পোশাক চাপিয়ে দেওয়া সাংস্কৃতিক ‘গেটো সৃষ্টি’ করে এবং অস্ট্রিয়ান মূলধারার সমাজে অন্তর্ভুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে।

মানবাধিকার

সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনা

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রিয়া আইনটিকে আখ্যা দিয়েছে—
মুসলিম মেয়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বৈষম্য”
এবং বলেছে—
এই আইন ইসলামবিরোধী বর্ণবাদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।”

আরও বলা হয়েছে—
এই নিষেধাজ্ঞা মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে ভুল ধারণা, ঘৃণা ও পূর্বধারণাকে আরও উসকে দিতে পারে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া—“এটি সামাজিক সংহতিকে ধ্বংস করবে”

অস্ট্রিয়ার মুসলিমদের সরকারি প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন IGGÖ আইনটির বিরোধিতা করে বলেছে—
এই নিষেধাজ্ঞা শিশুদের ক্ষমতায়নের বদলে তাদের কলঙ্কিত করবে, বিচ্ছিন্ন করবে এবং সামাজিক সংহতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।”

নারী–অধিকার অ্যান্টি–রেসিজম সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

  • নারী অধিকার সংগঠন আমাজোনে–এর পরিচালক অ্যাঞ্জেলিকা অ্যাটসিঙ্গার বলেন—
    হিজাব নিষিদ্ধের উদ্যোগ মেয়েদের কাছে ভুল বার্তা পাঠাবে—অন্যরা তাদের শরীর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেটি গ্রহণযোগ্য।”
  • অ্যান্টি–রেসিজম সংগঠন SOS Mitmensch আইনটি “বৈষম্যমূলক” মন্তব্য করে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

অস্ট্রিয়ার অভিবাসন–রাজনীতি ইসলামবিদ্বেষের প্রেক্ষাপট

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষিণপন্থি রাজনীতির উত্থানের ফলে ধর্মীয় পোশাক, হিজাব এবং মুসলিম অভিবাসীদের বিষয়ে নানা কঠোর নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। অস্ট্রিয়াও সেই প্রবণতারই অংশ।
হিজাব নিষিদ্ধের প্রস্তাব তাই শুধু শিক্ষা–নীতি নয়, বরং অভিবাসন–রাজনীতি ইসলামভীতি ঘিরে বৃহত্তর বিতর্কের অংশে পরিণত হয়েছে।