এআইয়ের হাতে ২০৩০ সালের মধ্যে মানবজাতির ধ্বংসের আশঙ্কা ‘শূন্য’
- Update Time : ১২:৪৮:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৬৯ Time View

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ‘শূন্য শতাংশ’ বলে মন্তব্য করেছেন চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জেনসেন হুয়াং। এআইয়ের কারণে একসময় মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে—প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন বিশেষজ্ঞের এমন সতর্কবার্তাকেও তিনি ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুয়াং বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে—এমন দাবির পেছনে কোনো তথ্য বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তাঁর ভাষায়, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ‘শূন্য শতাংশ’।
তবে এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ রয়েছে। চলতি মাসে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগের সময় সতর্ক করে বলেন, এআই ব্যবস্থার দ্রুত অগ্রগতি দশকের শেষ নাগাদ মানবজাতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ইভান হুবিঙ্গারও এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানুষের ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এ ধরনের আশঙ্কা নিয়ে প্রযুক্তি খাতের ব্যক্তিদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
এদিকে এআইয়ের ঝুঁকি শুধু মানবজাতির অস্তিত্বের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; আর্থিক বাজারেও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের উপগভর্নর সারাহ ব্রিডেন সতর্ক করে বলেছেন, এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বা এজেন্টের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন বাড়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো ভালোভাবে বোঝা জরুরি।
হোয়াটন স্কুলের একটি পডকাস্টে ব্রিডেন বলেন, আর্থিক বাজারে স্বয়ংক্রিয় লেনদেন ব্যাপক আকার নেওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা প্রয়োজন। এ ধরনের প্রযুক্তির কারণে বাজারে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে তা মোকাবিলায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিবেচনা করছে।
এআইয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় চলতি মাসে প্রযুক্তিটির উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই। তাঁর এই আহ্বানে সমর্থন জানিয়েছেন ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক।
তবে এআই উন্নয়নের গতি কমানো বা প্রযুক্তিখাতের জন্য নতুন আইন প্রণয়নের আহ্বানের সঙ্গে একমত নন হুয়াং। তাঁর মতে, এআইকে নিরাপদ রাখার জন্য বিদ্যমান আইনই যথেষ্ট। সাইবার নিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিদ্যমান দায়বদ্ধতার নিয়মগুলো আগে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা উচিত বলেও তিনি মনে করেন।
এআই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের ফলে মাইক্রোচিপের চাহিদা বেড়েছে এবং এর মাধ্যমে এনভিডিয়া উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ফলে এআই শিল্পের বিকাশের গতি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে হুয়াং বলেছেন, এআই প্রযুক্তি দায়িত্বশীলভাবে তৈরি ও ব্যবহার নিশ্চিত করা এনভিডিয়ার নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর মতে, কোম্পানির পণ্য ও সেবার নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিষ্ঠানটির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে এআই চ্যাটবট পরীক্ষার সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে অনুমতি ছাড়া সাইবার হামলা চালানোর কয়েকটি ঘটনার খবর প্রকাশের পর প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এসব আলোচনায় ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, মেটা ও গুগলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নামও এসেছে।
তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ নিয়েও বাড়ছে প্রতিবাদ
এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে বিপুলসংখ্যক তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রয়োজন হচ্ছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিবাদও শুরু হয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডেটা সেন্টার ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪৫টি ডেটা সেন্টার নির্মাণ প্রকল্প প্রতিবাদের কারণে বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত হয়েছে। এসব প্রকল্পের মোট মূল্য প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলার।
স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ—এসব বিষয়ও প্রতিবাদকারীদের উদ্বেগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
প্রায় ৩০টি অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় ডেটা সেন্টারের অবস্থান নির্ধারণ, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডেটা সেন্টার ওয়াচের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯টি অঙ্গরাজ্যে ৮৪৩টি বিরোধী সংগঠন সক্রিয় রয়েছে।
ডেটা সেন্টার ওয়াচের প্রধান বিশ্লেষক মিকেল ভিলা বলেন, নতুন নতুন সংগঠন তৈরি হচ্ছে, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও প্রশাসনিক এলাকায় বিক্ষোভ হচ্ছে এবং অনলাইনে আবেদনে স্বাক্ষরের সংখ্যাও বাড়ছে।
অন্যদিকে এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে মতভেদ থাকলেও এর নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ, সাইবার ঝুঁকি, আর্থিক বাজারে প্রভাব এবং পরিবেশগত চাপ—এসব বিষয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি—দুই দিকই বিবেচনায় রেখে প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ ব্যবহারের নীতিমালা নির্ধারণের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ


















