স্মার্টফোন প্রস্তুতকারকদের সোর্স কোড দিতে বাধ্য করতে চায় ভারত
- Update Time : ০৩:০৫:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৮৮ Time View

ভারতে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তা জোরদার করার অজুহাতে মোদি সরকার মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ডিভাইসের ‘সোর্স কোড’ সরকারের সঙ্গে শেয়ার করতে বাধ্য করার একটি অত্যন্ত বিতর্কিত প্রস্তাব সামনে এনেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ সফটওয়্যার পরিবর্তনের শর্তও আরোপের কথা বলা হয়েছে।
তবে সরকারের এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অ্যাপল, স্যামসাং ও গুগলের মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। তাদের মতে, ৮৩টি নিরাপত্তা মানসমৃদ্ধ এই প্রস্তাবের কোনো আন্তর্জাতিক নজির নেই। এটি কার্যকর হলে কোম্পানিগুলোর নিজস্ব ও অত্যন্ত গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য ফাঁসের গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হবে।
প্রায় ৭৫ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর বিশাল বাজারে অনলাইন জালিয়াতি ও তথ্য চুরি রোধে ভারত সরকার কঠোর অবস্থান নিতে চাইছে বলে জানা গেছে। রয়টার্সের হাতে আসা সরকারি ও শিল্প খাতের গোপন নথি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, নতুন ‘ইন্ডিয়ান টেলিকম সিকিউরিটি অ্যাসুরেন্স রিকোয়ারমেন্টস’-এর আওতায় ফোনের মূল অপারেটিং প্রোগ্রাম বা সোর্স কোডে সরকারের সরাসরি প্রবেশাধিকার চাওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, স্মার্টফোনের সোর্স কোড নির্দিষ্ট ভারতীয় পরীক্ষাগারে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি যেকোনো বড় সফটওয়্যার আপডেট বাজারে ছাড়ার আগে সরকারকে আগাম জানানো এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় যোগাযোগ নিরাপত্তা কেন্দ্রের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
যদিও ভারতের আইটি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সোর্স কোড সংগ্রহের বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছে, তবে শিল্প খাতের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে স্বীকার করেছে। আইটি সচিব এস কৃষ্ণন জানিয়েছেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর যৌক্তিক উদ্বেগগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এমএআইটি সরকারের এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির একটি গোপন নথিতে বলা হয়েছে, সোর্স কোড হলো সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গোপন প্রযুক্তিগত সম্পদ, যা শেয়ার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতেও এমন শর্ত নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফোনে প্রি-ইনস্টল করা অ্যাপ আনইনস্টল করার বাধ্যবাধকতা, ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং অন্তত ১২ মাসের ডিজিটাল লগ সংরক্ষণের মতো শর্তগুলোকে কোম্পানিগুলো ‘অবাস্তব’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, একটি ডিভাইসে এক বছরের লগ সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত স্টোরেজ নেই এবং নিয়মিত ম্যালওয়্যার স্ক্যান চালালে ফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।
অতীতেও সোর্স কোড সুরক্ষার প্রশ্নে স্মার্টফোন নির্মাতাদের কঠোর অবস্থান দেখা গেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চাপ সত্ত্বেও অ্যাপল সোর্স কোড দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ভারতে চীনা গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কায় সম্প্রতি নিরাপত্তা ক্যামেরার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও স্মার্টফোন খাতে একই ধরনের পদক্ষেপ শাওমি ও স্যামসাংয়ের মতো বড় কোম্পানিগুলোকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সংকট নিরসনে আইটি মন্ত্রণালয় ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) আবারও বৈঠকে বসছেন। এখন দেখার বিষয়, মোদি সরকার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের দাবিকে কতটা গুরুত্ব দেয়, নাকি কঠোর নিরাপত্তা নীতিতে অনড় থাকে।
সূত্র: রয়টার্স























