সময়: রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মার্টফোন প্রস্তুতকারকদের সোর্স কোড দিতে বাধ্য করতে চায় ভারত

নাবিল বিন বিল্লাল
  • Update Time : ০৩:০৫:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৮৮ Time View
ছবি: দ্য ইকোনোমিক টাইমস

ভারতে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তা জোরদার করার অজুহাতে মোদি সরকার মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ডিভাইসের ‘সোর্স কোড’ সরকারের সঙ্গে শেয়ার করতে বাধ্য করার একটি অত্যন্ত বিতর্কিত প্রস্তাব সামনে এনেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ সফটওয়্যার পরিবর্তনের শর্তও আরোপের কথা বলা হয়েছে।

তবে সরকারের এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অ্যাপল, স্যামসাং ও গুগলের মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। তাদের মতে, ৮৩টি নিরাপত্তা মানসমৃদ্ধ এই প্রস্তাবের কোনো আন্তর্জাতিক নজির নেই। এটি কার্যকর হলে কোম্পানিগুলোর নিজস্ব ও অত্যন্ত গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য ফাঁসের গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হবে।

প্রায় ৭৫ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর বিশাল বাজারে অনলাইন জালিয়াতি ও তথ্য চুরি রোধে ভারত সরকার কঠোর অবস্থান নিতে চাইছে বলে জানা গেছে। রয়টার্সের হাতে আসা সরকারি ও শিল্প খাতের গোপন নথি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, নতুন ‘ইন্ডিয়ান টেলিকম সিকিউরিটি অ্যাসুরেন্স রিকোয়ারমেন্টস’-এর আওতায় ফোনের মূল অপারেটিং প্রোগ্রাম বা সোর্স কোডে সরকারের সরাসরি প্রবেশাধিকার চাওয়া হচ্ছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, স্মার্টফোনের সোর্স কোড নির্দিষ্ট ভারতীয় পরীক্ষাগারে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি যেকোনো বড় সফটওয়্যার আপডেট বাজারে ছাড়ার আগে সরকারকে আগাম জানানো এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় যোগাযোগ নিরাপত্তা কেন্দ্রের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।

যদিও ভারতের আইটি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সোর্স কোড সংগ্রহের বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছে, তবে শিল্প খাতের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে স্বীকার করেছে। আইটি সচিব এস কৃষ্ণন জানিয়েছেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর যৌক্তিক উদ্বেগগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এমএআইটি সরকারের এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির একটি গোপন নথিতে বলা হয়েছে, সোর্স কোড হলো সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গোপন প্রযুক্তিগত সম্পদ, যা শেয়ার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতেও এমন শর্ত নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ফোনে প্রি-ইনস্টল করা অ্যাপ আনইনস্টল করার বাধ্যবাধকতা, ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং অন্তত ১২ মাসের ডিজিটাল লগ সংরক্ষণের মতো শর্তগুলোকে কোম্পানিগুলো ‘অবাস্তব’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, একটি ডিভাইসে এক বছরের লগ সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত স্টোরেজ নেই এবং নিয়মিত ম্যালওয়্যার স্ক্যান চালালে ফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।

অতীতেও সোর্স কোড সুরক্ষার প্রশ্নে স্মার্টফোন নির্মাতাদের কঠোর অবস্থান দেখা গেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চাপ সত্ত্বেও অ্যাপল সোর্স কোড দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ভারতে চীনা গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কায় সম্প্রতি নিরাপত্তা ক্যামেরার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও স্মার্টফোন খাতে একই ধরনের পদক্ষেপ শাওমি ও স্যামসাংয়ের মতো বড় কোম্পানিগুলোকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সংকট নিরসনে আইটি মন্ত্রণালয় ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) আবারও বৈঠকে বসছেন। এখন দেখার বিষয়, মোদি সরকার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের দাবিকে কতটা গুরুত্ব দেয়, নাকি কঠোর নিরাপত্তা নীতিতে অনড় থাকে।

সূত্র: রয়টার্স

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

নাবিল বিন বিল্লাল

নবিল বিন বিল্লাল একজন বিশিষ্ট আইটি বিশেষজ্ঞ এবং বিডিবো নিউজে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে নিবন্ধ লেখক হিসেবে খ্যাতিমান। তিনি তার প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে একটি বৃহৎ পাঠকগোষ্ঠীর জন্য জটিল প্রযুক্তিগত ধারণাগুলি সহজভাবে উপস্থাপন করার আগ্রহের সাথে নিপুণভাবে মিশিয়ে দেন। তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিস্তৃত অভিজ্ঞতা থাকার ফলে, তিনি টেক কমিউনিটিতে একটি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন, উদীয়মান প্রবণতাগুলি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ ও অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেন। বিডিবো নিউজে তার নিবন্ধগুলি তার তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে গভীর জ্ঞানের পরিচয় দেয় এবং জটিল বিষয়গুলিকে সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা প্রতিফলিত করে। প্রযুক্তি এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করার জন্য তার অঙ্গীকার তাকে শিল্পের একজন চিন্তাশীল নেতা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। নবিল বিন বিল্লাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন, যা তাকে সর্বশেষ উন্নয়ন সম্পর্কে সচেতন থাকার জন্য একটি চাহিদাসম্পন্ন কণ্ঠস্বর করে তুলেছে।

স্মার্টফোন প্রস্তুতকারকদের সোর্স কোড দিতে বাধ্য করতে চায় ভারত

Update Time : ০৩:০৫:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
ছবি: দ্য ইকোনোমিক টাইমস

ভারতে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তা জোরদার করার অজুহাতে মোদি সরকার মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ডিভাইসের ‘সোর্স কোড’ সরকারের সঙ্গে শেয়ার করতে বাধ্য করার একটি অত্যন্ত বিতর্কিত প্রস্তাব সামনে এনেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ সফটওয়্যার পরিবর্তনের শর্তও আরোপের কথা বলা হয়েছে।

তবে সরকারের এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অ্যাপল, স্যামসাং ও গুগলের মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। তাদের মতে, ৮৩টি নিরাপত্তা মানসমৃদ্ধ এই প্রস্তাবের কোনো আন্তর্জাতিক নজির নেই। এটি কার্যকর হলে কোম্পানিগুলোর নিজস্ব ও অত্যন্ত গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য ফাঁসের গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হবে।

প্রায় ৭৫ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর বিশাল বাজারে অনলাইন জালিয়াতি ও তথ্য চুরি রোধে ভারত সরকার কঠোর অবস্থান নিতে চাইছে বলে জানা গেছে। রয়টার্সের হাতে আসা সরকারি ও শিল্প খাতের গোপন নথি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, নতুন ‘ইন্ডিয়ান টেলিকম সিকিউরিটি অ্যাসুরেন্স রিকোয়ারমেন্টস’-এর আওতায় ফোনের মূল অপারেটিং প্রোগ্রাম বা সোর্স কোডে সরকারের সরাসরি প্রবেশাধিকার চাওয়া হচ্ছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, স্মার্টফোনের সোর্স কোড নির্দিষ্ট ভারতীয় পরীক্ষাগারে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি যেকোনো বড় সফটওয়্যার আপডেট বাজারে ছাড়ার আগে সরকারকে আগাম জানানো এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় যোগাযোগ নিরাপত্তা কেন্দ্রের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।

যদিও ভারতের আইটি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সোর্স কোড সংগ্রহের বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছে, তবে শিল্প খাতের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে স্বীকার করেছে। আইটি সচিব এস কৃষ্ণন জানিয়েছেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর যৌক্তিক উদ্বেগগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এমএআইটি সরকারের এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির একটি গোপন নথিতে বলা হয়েছে, সোর্স কোড হলো সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গোপন প্রযুক্তিগত সম্পদ, যা শেয়ার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতেও এমন শর্ত নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ফোনে প্রি-ইনস্টল করা অ্যাপ আনইনস্টল করার বাধ্যবাধকতা, ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং অন্তত ১২ মাসের ডিজিটাল লগ সংরক্ষণের মতো শর্তগুলোকে কোম্পানিগুলো ‘অবাস্তব’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, একটি ডিভাইসে এক বছরের লগ সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত স্টোরেজ নেই এবং নিয়মিত ম্যালওয়্যার স্ক্যান চালালে ফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।

অতীতেও সোর্স কোড সুরক্ষার প্রশ্নে স্মার্টফোন নির্মাতাদের কঠোর অবস্থান দেখা গেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চাপ সত্ত্বেও অ্যাপল সোর্স কোড দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ভারতে চীনা গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কায় সম্প্রতি নিরাপত্তা ক্যামেরার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও স্মার্টফোন খাতে একই ধরনের পদক্ষেপ শাওমি ও স্যামসাংয়ের মতো বড় কোম্পানিগুলোকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সংকট নিরসনে আইটি মন্ত্রণালয় ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) আবারও বৈঠকে বসছেন। এখন দেখার বিষয়, মোদি সরকার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের দাবিকে কতটা গুরুত্ব দেয়, নাকি কঠোর নিরাপত্তা নীতিতে অনড় থাকে।

সূত্র: রয়টার্স