সময়: বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বোরকা পরে হাজির পার্লামেন্টে, নাটকীয় প্রতিবাদ অস্ট্রেলিয়ার সিনেটর পলিন হ্যানসনের

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:১২:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১৩৮ Time View

 

অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে সোমবার (২৪ নভেম্বর) একটি অস্বাভাবিক ও উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার সৃষ্টি হয়। কুইন্সল্যান্ড থেকে নির্বাচিত সিনেটর ও অভিবাসনবিরোধী দল ‘ওয়ান ন্যাশন’-এর নেত্রী পলিন হ্যানসন বোরকা পরে সিনেট অধিবেশনে হাজির হন। তাঁর এ আচরণে পার্লামেন্টের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হন সিনেট চেয়ার। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঘটনা ব্যাপক ক্ষোভ, নিন্দা এবং নতুন করে বর্ণবাদ-বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

পটভূমি: বহুদিন ধরেই বোরকা নিষিদ্ধের প্রচারণা

পলিন হ্যানসন বহু বছর ধরেই বোরকা নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তিনি মনে করেন, বোরকা নিরাপত্তার জন্য ‘হুমকি’, এবং এটি অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ‘বেমানান’। তাঁর সেই বহু বছরের প্রচারণার অংশ হিসেবেই তিনি সোমবার পার্লামেন্টে পূর্ণ বোরকা পরে প্রবেশ করেন—যা সেখানে দ্বিতীয়বারের মতো ঘটলো।
এর আগে ২০১৭ সালেও তিনি একই কাণ্ড করেছিলেন, যা নিয়ে তখনও দেশজুড়ে বিস্তর আলোচনা এবং সমালোচনা হয়েছিল।

বিল উত্থাপনে বাধা—এরপর নাটকীয় প্রতিবাদ

দিনের শুরুতে হ্যানসন একটি বিল উত্থাপন করতে চেয়েছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল জনসমক্ষে বোরকা নিষিদ্ধ করা। কিন্তু সিনেটের অন্যান্য সদস্যরা তাঁর প্রস্তাবটি উপস্থাপন করার সুযোগ না দিয়ে তা বাতিল করে দেন।
বিল বাতিল হওয়ার পর তিনি চেম্বার থেকে বের হন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো শরীর ঢাকা কালো বোরকা পরে আবার পার্লামেন্ট হলে প্রবেশ করে সৃষ্টি করেন চরম অস্থিরতা।

সিনেটে তাঁর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই অধিবেশন স্থগিত করতে হয়। বিভিন্ন পক্ষ থেকে তাঁকে বোরকা খুলে আসতে বলা হলেও তিনি অস্বীকৃতি জানান।

অন্য সিনেটরদের কঠোর প্রতিক্রিয়া: বর্ণবাদের সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ

ঘটনার পরপরই সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে ক্ষোভের ঝড় ওঠে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের মুসলিম গ্রিনস সিনেটর মেহরিন ফারুকি বলেন—
“পলিন হ্যানসন একজন বর্ণবাদী। তাঁর আচরণ শুধু উস্কানিমূলক নয়, বরং স্পষ্টভাবে মুসলিম সম্প্রদায়কে হেয় করার চেষ্টা।”

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার স্বতন্ত্র সিনেটর ফাতিমা পেইমান মন্তব্য করেন—
“এটি লজ্জাজনক এবং অস্ট্রেলিয়ার বহুত্ববাদী মূল্যবোধের বিরুদ্ধে। যারা আমাদের সমাজে বিভাজন তৈরি করতে চায়, তাদের এই আচরণ অত্যন্ত ক্ষতিকর।”

সরকারি দলের সিনেট নেতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং আরও কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়ে বলেন—
“এটি পার্লামেন্টের প্রতি অসম্মান। পলিন হ্যানসন অস্ট্রেলিয়ান সিনেটের যোগ্য নন।”
তিনি প্রস্তাব দেন—বোরকা খুলতে অস্বীকৃতি জানানোয় হ্যানসনকে সাময়িক বরখাস্ত করা উচিত।

নিষিদ্ধ না করলে আমি পরতেই থাকবো’—হ্যানসনের মন্তব্য

হ্যানসন পরে ফেসবুকে লিখেছেন—
“যদি আপনারা না চান আমি বোরকা পরি, তাহলে বোরকা নিষিদ্ধ করুন।”

তাঁর এই বক্তব্য আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, এটি মুসলিম নারীদের পোশাক নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানোর একটি উদ্দেশ্যমূলক পদক্ষেপ।
মানবাধিকারকর্মীরা মন্তব্য করেছেন—একজন সিনেটরের কাছ থেকে এমন ‘নাটকীয় প্রতিবাদ’ শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীনই নয়, বরং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।

২০১৭ সালের ঘটনা আবার স্মরণে

২০১৭ সালে তিনি সংসদে বোরকা পরে ঢোকার পর সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল জর্জ ব্র্যান্ডিস দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে তাঁকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন—
“আপনি আজ সারা দেশের মুসলিম নারীদের হৃদয়ে গভীর আঘাত দিয়েছেন।”

সেই ঘটনার মতো এবারও দেশব্যাপী প্রতিক্রিয়া একই রকম তীব্র।

বর্ণবাদ সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা—নতুন করে জাতীয় বিতর্ক

অস্ট্রেলিয়ায় বহুসংস্কৃতিবাদ জাতীয় পরিচয়ের বড় অংশ হলেও অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি একটি বড় আলোচ্য বিষয়। পলিন হ্যানসনের এই পদক্ষেপ জাতীয় পর্যায়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে—
ধর্মীয় পোশাক কি রাজনীতির মাঠে ব্যবহারের যন্ত্র হয়ে উঠছে?
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিরাপত্তা—এই দুইয়ের ভারসাম্য কোথায়?

বহু বিশ্লেষক বলছেন, হ্যানসনের এ পদক্ষেপ মূলত তাঁর রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ানোর একটি প্রচেষ্টা, যেখানে ইসলামফোবিয়া ও বিভাজনমূলক রাজনীতি তাঁর কৌশলের প্রধান কেন্দ্রে।

সূত্র: বিবিসি

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বোরকা পরে হাজির পার্লামেন্টে, নাটকীয় প্রতিবাদ অস্ট্রেলিয়ার সিনেটর পলিন হ্যানসনের

Update Time : ১০:১২:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫

 

অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে সোমবার (২৪ নভেম্বর) একটি অস্বাভাবিক ও উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার সৃষ্টি হয়। কুইন্সল্যান্ড থেকে নির্বাচিত সিনেটর ও অভিবাসনবিরোধী দল ‘ওয়ান ন্যাশন’-এর নেত্রী পলিন হ্যানসন বোরকা পরে সিনেট অধিবেশনে হাজির হন। তাঁর এ আচরণে পার্লামেন্টের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হন সিনেট চেয়ার। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ঘটনা ব্যাপক ক্ষোভ, নিন্দা এবং নতুন করে বর্ণবাদ-বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

পটভূমি: বহুদিন ধরেই বোরকা নিষিদ্ধের প্রচারণা

পলিন হ্যানসন বহু বছর ধরেই বোরকা নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তিনি মনে করেন, বোরকা নিরাপত্তার জন্য ‘হুমকি’, এবং এটি অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ‘বেমানান’। তাঁর সেই বহু বছরের প্রচারণার অংশ হিসেবেই তিনি সোমবার পার্লামেন্টে পূর্ণ বোরকা পরে প্রবেশ করেন—যা সেখানে দ্বিতীয়বারের মতো ঘটলো।
এর আগে ২০১৭ সালেও তিনি একই কাণ্ড করেছিলেন, যা নিয়ে তখনও দেশজুড়ে বিস্তর আলোচনা এবং সমালোচনা হয়েছিল।

বিল উত্থাপনে বাধা—এরপর নাটকীয় প্রতিবাদ

দিনের শুরুতে হ্যানসন একটি বিল উত্থাপন করতে চেয়েছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল জনসমক্ষে বোরকা নিষিদ্ধ করা। কিন্তু সিনেটের অন্যান্য সদস্যরা তাঁর প্রস্তাবটি উপস্থাপন করার সুযোগ না দিয়ে তা বাতিল করে দেন।
বিল বাতিল হওয়ার পর তিনি চেম্বার থেকে বের হন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো শরীর ঢাকা কালো বোরকা পরে আবার পার্লামেন্ট হলে প্রবেশ করে সৃষ্টি করেন চরম অস্থিরতা।

সিনেটে তাঁর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই অধিবেশন স্থগিত করতে হয়। বিভিন্ন পক্ষ থেকে তাঁকে বোরকা খুলে আসতে বলা হলেও তিনি অস্বীকৃতি জানান।

অন্য সিনেটরদের কঠোর প্রতিক্রিয়া: বর্ণবাদের সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ

ঘটনার পরপরই সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে ক্ষোভের ঝড় ওঠে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের মুসলিম গ্রিনস সিনেটর মেহরিন ফারুকি বলেন—
“পলিন হ্যানসন একজন বর্ণবাদী। তাঁর আচরণ শুধু উস্কানিমূলক নয়, বরং স্পষ্টভাবে মুসলিম সম্প্রদায়কে হেয় করার চেষ্টা।”

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার স্বতন্ত্র সিনেটর ফাতিমা পেইমান মন্তব্য করেন—
“এটি লজ্জাজনক এবং অস্ট্রেলিয়ার বহুত্ববাদী মূল্যবোধের বিরুদ্ধে। যারা আমাদের সমাজে বিভাজন তৈরি করতে চায়, তাদের এই আচরণ অত্যন্ত ক্ষতিকর।”

সরকারি দলের সিনেট নেতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং আরও কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়ে বলেন—
“এটি পার্লামেন্টের প্রতি অসম্মান। পলিন হ্যানসন অস্ট্রেলিয়ান সিনেটের যোগ্য নন।”
তিনি প্রস্তাব দেন—বোরকা খুলতে অস্বীকৃতি জানানোয় হ্যানসনকে সাময়িক বরখাস্ত করা উচিত।

নিষিদ্ধ না করলে আমি পরতেই থাকবো’—হ্যানসনের মন্তব্য

হ্যানসন পরে ফেসবুকে লিখেছেন—
“যদি আপনারা না চান আমি বোরকা পরি, তাহলে বোরকা নিষিদ্ধ করুন।”

তাঁর এই বক্তব্য আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, এটি মুসলিম নারীদের পোশাক নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানোর একটি উদ্দেশ্যমূলক পদক্ষেপ।
মানবাধিকারকর্মীরা মন্তব্য করেছেন—একজন সিনেটরের কাছ থেকে এমন ‘নাটকীয় প্রতিবাদ’ শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীনই নয়, বরং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।

২০১৭ সালের ঘটনা আবার স্মরণে

২০১৭ সালে তিনি সংসদে বোরকা পরে ঢোকার পর সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল জর্জ ব্র্যান্ডিস দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে তাঁকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন—
“আপনি আজ সারা দেশের মুসলিম নারীদের হৃদয়ে গভীর আঘাত দিয়েছেন।”

সেই ঘটনার মতো এবারও দেশব্যাপী প্রতিক্রিয়া একই রকম তীব্র।

বর্ণবাদ সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা—নতুন করে জাতীয় বিতর্ক

অস্ট্রেলিয়ায় বহুসংস্কৃতিবাদ জাতীয় পরিচয়ের বড় অংশ হলেও অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি একটি বড় আলোচ্য বিষয়। পলিন হ্যানসনের এই পদক্ষেপ জাতীয় পর্যায়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে—
ধর্মীয় পোশাক কি রাজনীতির মাঠে ব্যবহারের যন্ত্র হয়ে উঠছে?
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিরাপত্তা—এই দুইয়ের ভারসাম্য কোথায়?

বহু বিশ্লেষক বলছেন, হ্যানসনের এ পদক্ষেপ মূলত তাঁর রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ানোর একটি প্রচেষ্টা, যেখানে ইসলামফোবিয়া ও বিভাজনমূলক রাজনীতি তাঁর কৌশলের প্রধান কেন্দ্রে।

সূত্র: বিবিসি