সময়: বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৃত প্রেমিকের শুক্রাণু দিয়ে মা হলেন ইসরাইলি চিকিৎসক

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:২৮:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১৫১ Time View

 

মৃত প্রেমিকের শুক্রাণু দিয়ে মা হলেন ইসরাইলি চিকিৎসক
ইসরাইল–গাজা যুদ্ধের মাঝেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে ঘটল অভাবনীয় এক বিস্ময়

ইসরাইল–গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে এমন এক ঘটনা ঘটেছে, যা বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। মৃত প্রেমিকের মৃত্যুর কয়েক মিনিটের মাথায় তার শুক্রাণু সংগ্রহ করে অবশেষে মা হলেন এক ইসরাইলি শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। প্রেম, বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক দৃঢ়তার এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিচ্ছে এই ঘটনা।

ঘটনার শুরু ক্যাপ্টেন নেতানেল সিলবার্গ–এর মৃত্যুর মাধ্যমে। গাজায় সামরিক অভিযানের সময় প্রাণ হারান তিনি। খবরটি পৌঁছায় তার হবু স্ত্রী ডা. হাদাস লেভি–র কাছে, যিনি তখনও হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আঘাত সামলানোর সময়ও পাননি তিনি। কারণ, তাদের একসাথে পরিবারের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না।

মৃত্যুর পর মাত্র ২০ মিনিটের মাথায় শুক্রাণু সংগ্রহ—সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

ডা. লেভি জানতেন, পোস্টমর্টেম স্পার্ম রিট্রিভাল (PSR) পদ্ধতি ব্যবহার করতে হলে সময় অত্যন্ত অল্প। অক্সিজেনহীন পরিবেশে মৃত্যু পরবর্তী সময়ে শুক্রাণু খুব দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ আবেদন করেন এ প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য।

জেরুজালেমের Hadassah Hospital–এ বিশেষজ্ঞদের একটি দল শুরু করে এক অত্যন্ত জটিল ও সময়–সংবেদনশীল অপারেশন। প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে চলে ল্যাবের নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও পুনরুজ্জীবন প্রচেষ্টা।

অবশেষে উদ্ধার করা যায় মাত্র ৯টি কার্যকরী শুক্রাণু—যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাধারণ মানদণ্ডে অত্যন্ত কম। এত সামান্য কোষ দিয়ে IVF–এর মাধ্যমে গর্ভধারণ সম্ভব হবে কিনা—তা নিয়ে সংশয় ছিল বিজ্ঞানীদের মধ্যেই।

বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছিল—আইনি নৈতিকতা নিয়ে

আইনি–নৈতিক সংকট: প্রেমিক হলেও ছিলেন অবিবাহিত—তাহলে কি অধিকার আছে?

কারণ নেতানেল ও ডা. লেভি তখনো বিবাহিত ছিলেন না। ফলে মৃত ব্যক্তির শুক্রাণু ব্যবহার করার অধিকার আদৌ তার আছে কিনা—এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

অনেক দেশেই PSR নিয়ে কঠোর আইন আছে। সম্মতি, উত্তরাধিকার, নৈতিক অধিকার—এসব বিষয় জটিলভাবে জড়িয়ে থাকে। ইসরাইলও বহুদিন ধরে এই বিতর্কে বিভক্ত।

তবুও হার মানেননি ডা. লেভি। তিনি জানান—তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা, স্বপ্ন ও পরিবার গঠনের ইচ্ছাই ছিল এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে।

তিনি বলেন,
“এই শিশুটি আমার প্রতিরোধ—আমাদের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেঁচে ওঠা উত্তরাধিকার। সে আমাদের ভালোবাসারই বহনকারী।”

১৮ মাসের সংগ্রামের পর অলৌকিক গর্ভধারণ

দীর্ঘ আইনি, নৈতিক ও চিকিৎসাগত বাধা অতিক্রম করে অবশেষে IVF প্রক্রিয়ায় যান ডা. লেভি।

২০২৪ সালের অক্টোবরের দিকে, নেতানেলের মৃত্যুর প্রায় দেড় বছর পর, সফলভাবে গর্ভধারণ করেন তিনি। মাত্র ৯টি শুক্রাণু দিয়ে নিষেক—চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা একে আখ্যা দেন
অলৌকিক ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়।”

ডা. লেভির ভাষায়—
“এটা যেন বিজ্ঞান–কল্পকাহিনির একটি অধ্যায়। কিন্তু এটি বাস্তব, এবং এটি আমাদের।”

এ বছর তিনি জন্ম দেন এক সুস্থ পুত্রসন্তানকে—যাকে অনেকে বলছেন, বিপর্যয়ের ছাই থেকে জন্ম নেওয়া জীবন–প্রতীক।’

PSR কীভাবে কাজ করে—সংক্ষেপে প্রযুক্তির ধাপসমূহ

পোস্টমর্টেম স্পার্ম রিট্রিভাল (PSR) প্রযুক্তির সূচনা ১৯৮০–এর দশকে। প্রথম এ পদ্ধতিতে শিশুর জন্ম হয় ১৯৯৯ সালে। সাধারণত এ প্রক্রিয়ায় যা করা হয়—

  • মৃত্যু পরবর্তী ২৪–৩৬ ঘণ্টার মধ্যে শুক্রাণু সংগ্রহ
  • ত্বকের ভেতর সূচ ঢুকিয়ে এপিডিডাইমাল অ্যাসপিরেশন মাধ্যমে সংগ্রহ
  • এরপর শুক্রাণুগুলো হিমায়িত করে সংরক্ষণ
  • পরে IVF–এর মাধ্যমে ডিম্বাণুর সঙ্গে নিষেক করিয়ে গর্ভধারণ

যদিও প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি খুব জটিল নয়, তবুও নৈতিকতা, ধর্মীয় মতবাদ ও পারিবারিক অধিকারের প্রশ্নে বহু দেশে এটি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়মনীতির প্রয়োগ রয়েছে।

বিশ্বযোগ্য এক প্রশ্ন—ভালোবাসা, বিজ্ঞান আর নৈতিকতার সীমানা কোথায়?

ডা. লেভির এই গল্প এখন বিশ্বের বহু দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ঘটনাটি সামনে এনে দিয়েছে গভীর কিছু প্রশ্ন:

  • সঙ্গীর মৃত্যুর পর পিতৃত্ব/মাতৃত্বের অধিকার কার?
  • উন্নত প্রযুক্তি কি নৈতিক সীমানা লঙ্ঘন করছে?
  • আধুনিক বিজ্ঞান কি মানুষের ভালোবাসার পরিধি আরও বিস্তৃত করছে?

ডা. লেভির কাছে উত্তর স্পষ্ট—
তার সন্তান জীবনের প্রতীক, সেই ভবিষ্যতের উত্তরাধিকার যা তিনি ও নেতানেল একসাথে দেখেছিলেন। মৃত্যু সে স্বপ্ন থামাতে পারেনি।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মৃত প্রেমিকের শুক্রাণু দিয়ে মা হলেন ইসরাইলি চিকিৎসক

Update Time : ১১:২৮:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫

 

মৃত প্রেমিকের শুক্রাণু দিয়ে মা হলেন ইসরাইলি চিকিৎসক
ইসরাইল–গাজা যুদ্ধের মাঝেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে ঘটল অভাবনীয় এক বিস্ময়

ইসরাইল–গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে এমন এক ঘটনা ঘটেছে, যা বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। মৃত প্রেমিকের মৃত্যুর কয়েক মিনিটের মাথায় তার শুক্রাণু সংগ্রহ করে অবশেষে মা হলেন এক ইসরাইলি শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। প্রেম, বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক দৃঢ়তার এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিচ্ছে এই ঘটনা।

ঘটনার শুরু ক্যাপ্টেন নেতানেল সিলবার্গ–এর মৃত্যুর মাধ্যমে। গাজায় সামরিক অভিযানের সময় প্রাণ হারান তিনি। খবরটি পৌঁছায় তার হবু স্ত্রী ডা. হাদাস লেভি–র কাছে, যিনি তখনও হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আঘাত সামলানোর সময়ও পাননি তিনি। কারণ, তাদের একসাথে পরিবারের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না।

মৃত্যুর পর মাত্র ২০ মিনিটের মাথায় শুক্রাণু সংগ্রহ—সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

ডা. লেভি জানতেন, পোস্টমর্টেম স্পার্ম রিট্রিভাল (PSR) পদ্ধতি ব্যবহার করতে হলে সময় অত্যন্ত অল্প। অক্সিজেনহীন পরিবেশে মৃত্যু পরবর্তী সময়ে শুক্রাণু খুব দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ আবেদন করেন এ প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য।

জেরুজালেমের Hadassah Hospital–এ বিশেষজ্ঞদের একটি দল শুরু করে এক অত্যন্ত জটিল ও সময়–সংবেদনশীল অপারেশন। প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে চলে ল্যাবের নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও পুনরুজ্জীবন প্রচেষ্টা।

অবশেষে উদ্ধার করা যায় মাত্র ৯টি কার্যকরী শুক্রাণু—যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাধারণ মানদণ্ডে অত্যন্ত কম। এত সামান্য কোষ দিয়ে IVF–এর মাধ্যমে গর্ভধারণ সম্ভব হবে কিনা—তা নিয়ে সংশয় ছিল বিজ্ঞানীদের মধ্যেই।

বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছিল—আইনি নৈতিকতা নিয়ে

আইনি–নৈতিক সংকট: প্রেমিক হলেও ছিলেন অবিবাহিত—তাহলে কি অধিকার আছে?

কারণ নেতানেল ও ডা. লেভি তখনো বিবাহিত ছিলেন না। ফলে মৃত ব্যক্তির শুক্রাণু ব্যবহার করার অধিকার আদৌ তার আছে কিনা—এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

অনেক দেশেই PSR নিয়ে কঠোর আইন আছে। সম্মতি, উত্তরাধিকার, নৈতিক অধিকার—এসব বিষয় জটিলভাবে জড়িয়ে থাকে। ইসরাইলও বহুদিন ধরে এই বিতর্কে বিভক্ত।

তবুও হার মানেননি ডা. লেভি। তিনি জানান—তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা, স্বপ্ন ও পরিবার গঠনের ইচ্ছাই ছিল এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে।

তিনি বলেন,
“এই শিশুটি আমার প্রতিরোধ—আমাদের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেঁচে ওঠা উত্তরাধিকার। সে আমাদের ভালোবাসারই বহনকারী।”

১৮ মাসের সংগ্রামের পর অলৌকিক গর্ভধারণ

দীর্ঘ আইনি, নৈতিক ও চিকিৎসাগত বাধা অতিক্রম করে অবশেষে IVF প্রক্রিয়ায় যান ডা. লেভি।

২০২৪ সালের অক্টোবরের দিকে, নেতানেলের মৃত্যুর প্রায় দেড় বছর পর, সফলভাবে গর্ভধারণ করেন তিনি। মাত্র ৯টি শুক্রাণু দিয়ে নিষেক—চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা একে আখ্যা দেন
অলৌকিক ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়।”

ডা. লেভির ভাষায়—
“এটা যেন বিজ্ঞান–কল্পকাহিনির একটি অধ্যায়। কিন্তু এটি বাস্তব, এবং এটি আমাদের।”

এ বছর তিনি জন্ম দেন এক সুস্থ পুত্রসন্তানকে—যাকে অনেকে বলছেন, বিপর্যয়ের ছাই থেকে জন্ম নেওয়া জীবন–প্রতীক।’

PSR কীভাবে কাজ করে—সংক্ষেপে প্রযুক্তির ধাপসমূহ

পোস্টমর্টেম স্পার্ম রিট্রিভাল (PSR) প্রযুক্তির সূচনা ১৯৮০–এর দশকে। প্রথম এ পদ্ধতিতে শিশুর জন্ম হয় ১৯৯৯ সালে। সাধারণত এ প্রক্রিয়ায় যা করা হয়—

  • মৃত্যু পরবর্তী ২৪–৩৬ ঘণ্টার মধ্যে শুক্রাণু সংগ্রহ
  • ত্বকের ভেতর সূচ ঢুকিয়ে এপিডিডাইমাল অ্যাসপিরেশন মাধ্যমে সংগ্রহ
  • এরপর শুক্রাণুগুলো হিমায়িত করে সংরক্ষণ
  • পরে IVF–এর মাধ্যমে ডিম্বাণুর সঙ্গে নিষেক করিয়ে গর্ভধারণ

যদিও প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি খুব জটিল নয়, তবুও নৈতিকতা, ধর্মীয় মতবাদ ও পারিবারিক অধিকারের প্রশ্নে বহু দেশে এটি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়মনীতির প্রয়োগ রয়েছে।

বিশ্বযোগ্য এক প্রশ্ন—ভালোবাসা, বিজ্ঞান আর নৈতিকতার সীমানা কোথায়?

ডা. লেভির এই গল্প এখন বিশ্বের বহু দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ঘটনাটি সামনে এনে দিয়েছে গভীর কিছু প্রশ্ন:

  • সঙ্গীর মৃত্যুর পর পিতৃত্ব/মাতৃত্বের অধিকার কার?
  • উন্নত প্রযুক্তি কি নৈতিক সীমানা লঙ্ঘন করছে?
  • আধুনিক বিজ্ঞান কি মানুষের ভালোবাসার পরিধি আরও বিস্তৃত করছে?

ডা. লেভির কাছে উত্তর স্পষ্ট—
তার সন্তান জীবনের প্রতীক, সেই ভবিষ্যতের উত্তরাধিকার যা তিনি ও নেতানেল একসাথে দেখেছিলেন। মৃত্যু সে স্বপ্ন থামাতে পারেনি।