সময়: বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘তোমার স্ত্রী কয়টা?’— হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সরাসরি প্রশ্নে অপ্রস্তুত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আল–শারা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১২:১৮:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২৫৭ Time View

ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক মহলে এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন মার্কিন  প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল–শারার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি এমন এক প্রশ্ন ছুড়ে দেন, যা শুধু উপস্থিত কর্মকর্তাদেরই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও মুহূর্তে সরগরম করে তোলে। ট্রাম্প সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, তোমার স্ত্রী কয়টা?”

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, আল–শারা হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন পাশের একটি ফটক দিয়ে, প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী মূল ফটক দিয়ে নয়। ইতোমধ্যেই সাংবাদিকদের নানা অপ্রিয় প্রশ্নে কিছুটা বিব্রত ছিলেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট। তবে তার আসল অস্বস্তি তৈরি হয় হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে—একটি হালকা মুহূর্তে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে।

বিব্রতকর মুহূর্তের সূচনা

সাক্ষাৎ শুরু হয় আপাত উষ্ণ অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ট্রাম্প হাসিমুখে আল–শারাকে স্বাগত জানাচ্ছেন এবং নিজের ডেস্ক থেকে সোনালি ঢাকনাযুক্ত ব্র্যান্ডেড কোলোন স্প্রে হাতে তুলে নিচ্ছেন। ট্রাম্প বলেন,
“এই পারফিউমটা পুরুষদের জন্য। এটা আমার প্রিয় গন্ধ, বিশ্বাস করো, দারুণ!”
কিন্তু আল–শারা তেমন কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেননি। তখন ট্রাম্প আরেকটি বোতল বাড়িয়ে দেন এবং বলেন,
“এইটা তোমার স্ত্রীর জন্য।”

এরপরই ট্রাম্পের রসিক প্রশ্ন—
তোমার কয়জন স্ত্রী আছে? একজন?”

আল–শারা মুচকি হেসে জবাব দেন, “আমার একজনই স্ত্রী আছেন।”
এই উত্তরে ট্রাম্প হেসে তার কাঁধে চাপড় দেন এবং বলেন,
তোমাদের ক্ষেত্রে আমি কখনই নিশ্চিত হতে পারি না।”

ইসলামে চারজন স্ত্রী রাখার অনুমতির প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে অনেকে “অযথা সংবেদনশীল” বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, তিনি কেবল হালকা মেজাজে রসিকতা করছিলেন।

কূটনৈতিক শীতলতা শারার নতুন ইমেজ

আল–শারার এই ওয়াশিংটন সফর ছিল তার আন্তর্জাতিক ইমেজ পুনর্গঠনের প্রচারণার অংশ। তিনি দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের ছায়া থেকে বেরিয়ে এখন এক নতুন বার্তা প্রচার করছেন—তার নেতৃত্বাধীন দল হায়াত তাহরির আল–শাম আর পশ্চিমা বিশ্বের শত্রু নয়, বরং সিরিয়ার পুনর্গঠনের অংশীদার।

কিন্তু ট্রাম্পের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ তাকে যেমন আলোচনায় এনেছে, তেমনি ট্রাম্প প্রশাসনকেও ফেলেছে এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক বিপাকে। ট্রাম্পের কঠোরপন্থী সমর্থক, বিশেষত বিশ্লেষক লরা লুমার এই বৈঠকের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন,
একজন সাবেক জঙ্গি নেতাকে হোয়াইট হাউসে ডাকা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অবমাননা।”

অভ্যর্থনায় বৈষম্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা

শারার আগমন উপলক্ষে হোয়াইট হাউসে কঠোর নিরাপত্তা জারি করা হয়। তবুও তাকে প্রচলিত প্রোটোকল অনুযায়ী সম্মান দেওয়া হয়নি। সাধারণ রাষ্ট্রীয় অতিথিদের মতো মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ বা লিমোজিন থেকে আনুষ্ঠানিক নামানোর কোনো আয়োজন ছিল না। এমনকি সিরিয়ার পতাকাও হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে উত্তোলন করা হয়নি।

বৈঠকের কূটনৈতিক ফলাফল

ট্রাম্প–শারা বৈঠকের পরদিন সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয়, তারা এখন থেকে আইসিস–বিরোধী বৈশ্বিক জোটে যোগ দিচ্ছে। এর বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়ার ওপর আরোপিত ‘সিজার অ্যাক্ট’ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আংশিকভাবে শিথিল করে। তবে স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন এখনো প্রয়োজন।

বৈঠকের শেষে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন,
সে এসেছে এক ভয়ানক কঠিন জায়গা থেকে, এবং সে নিজেও এক কঠিন মানুষ। আমি তাকে পছন্দ করি।”
এই মন্তব্যে অনেক কূটনীতিকই বুঝতে পারেন, ট্রাম্প শারাকে একটি নতুন ভূমিকায় দেখতে আগ্রহী।

ব্যক্তিজীবনে আল–শারা

আহমেদ আল–শারার স্ত্রী লতিফা আল–দ্রৌবি একজন শিক্ষিতা নারী। ১৯৮৪ সালে জন্ম নেওয়া লতিফা দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে শারার সঙ্গে পরিচিত হন। ২০১২ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তাদের তিন সন্তান রয়েছে।

ওয়াশিংটন সফরের এই ঘটনাটি, বিশেষ করে “স্ত্রী কয়টা” মন্তব্যটি, একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আলোচনার ঝড় তুলেছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মহলেও এটি ট্রাম্পের কূটনৈতিক আচরণের এক নতুন উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে—যেখানে রসিকতা ও রাজনীতি একসঙ্গে মিশে যায়, কিন্তু বার্তাটা অনেক সময় কূটনৈতিক সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

‘তোমার স্ত্রী কয়টা?’— হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সরাসরি প্রশ্নে অপ্রস্তুত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আল–শারা

Update Time : ১২:১৮:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫

ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক মহলে এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন মার্কিন  প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল–শারার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি এমন এক প্রশ্ন ছুড়ে দেন, যা শুধু উপস্থিত কর্মকর্তাদেরই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও মুহূর্তে সরগরম করে তোলে। ট্রাম্প সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, তোমার স্ত্রী কয়টা?”

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, আল–শারা হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন পাশের একটি ফটক দিয়ে, প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী মূল ফটক দিয়ে নয়। ইতোমধ্যেই সাংবাদিকদের নানা অপ্রিয় প্রশ্নে কিছুটা বিব্রত ছিলেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট। তবে তার আসল অস্বস্তি তৈরি হয় হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে—একটি হালকা মুহূর্তে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে।

বিব্রতকর মুহূর্তের সূচনা

সাক্ষাৎ শুরু হয় আপাত উষ্ণ অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ট্রাম্প হাসিমুখে আল–শারাকে স্বাগত জানাচ্ছেন এবং নিজের ডেস্ক থেকে সোনালি ঢাকনাযুক্ত ব্র্যান্ডেড কোলোন স্প্রে হাতে তুলে নিচ্ছেন। ট্রাম্প বলেন,
“এই পারফিউমটা পুরুষদের জন্য। এটা আমার প্রিয় গন্ধ, বিশ্বাস করো, দারুণ!”
কিন্তু আল–শারা তেমন কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেননি। তখন ট্রাম্প আরেকটি বোতল বাড়িয়ে দেন এবং বলেন,
“এইটা তোমার স্ত্রীর জন্য।”

এরপরই ট্রাম্পের রসিক প্রশ্ন—
তোমার কয়জন স্ত্রী আছে? একজন?”

আল–শারা মুচকি হেসে জবাব দেন, “আমার একজনই স্ত্রী আছেন।”
এই উত্তরে ট্রাম্প হেসে তার কাঁধে চাপড় দেন এবং বলেন,
তোমাদের ক্ষেত্রে আমি কখনই নিশ্চিত হতে পারি না।”

ইসলামে চারজন স্ত্রী রাখার অনুমতির প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে অনেকে “অযথা সংবেদনশীল” বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, তিনি কেবল হালকা মেজাজে রসিকতা করছিলেন।

কূটনৈতিক শীতলতা শারার নতুন ইমেজ

আল–শারার এই ওয়াশিংটন সফর ছিল তার আন্তর্জাতিক ইমেজ পুনর্গঠনের প্রচারণার অংশ। তিনি দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের ছায়া থেকে বেরিয়ে এখন এক নতুন বার্তা প্রচার করছেন—তার নেতৃত্বাধীন দল হায়াত তাহরির আল–শাম আর পশ্চিমা বিশ্বের শত্রু নয়, বরং সিরিয়ার পুনর্গঠনের অংশীদার।

কিন্তু ট্রাম্পের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ তাকে যেমন আলোচনায় এনেছে, তেমনি ট্রাম্প প্রশাসনকেও ফেলেছে এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক বিপাকে। ট্রাম্পের কঠোরপন্থী সমর্থক, বিশেষত বিশ্লেষক লরা লুমার এই বৈঠকের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন,
একজন সাবেক জঙ্গি নেতাকে হোয়াইট হাউসে ডাকা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অবমাননা।”

অভ্যর্থনায় বৈষম্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা

শারার আগমন উপলক্ষে হোয়াইট হাউসে কঠোর নিরাপত্তা জারি করা হয়। তবুও তাকে প্রচলিত প্রোটোকল অনুযায়ী সম্মান দেওয়া হয়নি। সাধারণ রাষ্ট্রীয় অতিথিদের মতো মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ বা লিমোজিন থেকে আনুষ্ঠানিক নামানোর কোনো আয়োজন ছিল না। এমনকি সিরিয়ার পতাকাও হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে উত্তোলন করা হয়নি।

বৈঠকের কূটনৈতিক ফলাফল

ট্রাম্প–শারা বৈঠকের পরদিন সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয়, তারা এখন থেকে আইসিস–বিরোধী বৈশ্বিক জোটে যোগ দিচ্ছে। এর বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়ার ওপর আরোপিত ‘সিজার অ্যাক্ট’ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আংশিকভাবে শিথিল করে। তবে স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন এখনো প্রয়োজন।

বৈঠকের শেষে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন,
সে এসেছে এক ভয়ানক কঠিন জায়গা থেকে, এবং সে নিজেও এক কঠিন মানুষ। আমি তাকে পছন্দ করি।”
এই মন্তব্যে অনেক কূটনীতিকই বুঝতে পারেন, ট্রাম্প শারাকে একটি নতুন ভূমিকায় দেখতে আগ্রহী।

ব্যক্তিজীবনে আল–শারা

আহমেদ আল–শারার স্ত্রী লতিফা আল–দ্রৌবি একজন শিক্ষিতা নারী। ১৯৮৪ সালে জন্ম নেওয়া লতিফা দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে শারার সঙ্গে পরিচিত হন। ২০১২ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তাদের তিন সন্তান রয়েছে।

ওয়াশিংটন সফরের এই ঘটনাটি, বিশেষ করে “স্ত্রী কয়টা” মন্তব্যটি, একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আলোচনার ঝড় তুলেছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মহলেও এটি ট্রাম্পের কূটনৈতিক আচরণের এক নতুন উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে—যেখানে রসিকতা ও রাজনীতি একসঙ্গে মিশে যায়, কিন্তু বার্তাটা অনেক সময় কূটনৈতিক সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করে।