প্রেম আড়ালেই স্বস্তি: অনলাইনে সম্পর্ক প্রকাশে অনীহা বাড়ছে তরুণীদের মধ্যে
- Update Time : ১১:৪৮:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ৩১৭ Time View

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের জীবন, ভাবনা ও অনুভূতির প্রায় সবকিছুই প্রকাশ করার এই যুগে এক আশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে—প্রেম বা দাম্পত্য সম্পর্ক প্রকাশ্যে আনতে আগ্রহ কমছে, বিশেষ করে তরুণী ও নারীদের মধ্যে। পশ্চিমা সমাজে এই প্রবণতা এতটাই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে যে, ব্রিটিশ ভোগ ম্যাগাজিন পর্যন্ত প্রশ্ন তুলেছে—“প্রেমিক থাকা কি এখন লজ্জার বিষয়?”
‘সফট লঞ্চ’: আড়ালেই ভালোবাসার ঘোষণা
ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে এখন অনেকেই সঙ্গীর মুখ দেখান না। বদলে দেখা যায় হাত ধরা, কফির কাপ, ছায়া কিংবা পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষের ছবি। এই প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘সফট লঞ্চ’। সম্পর্ক আছে—এই ইঙ্গিত দেওয়া হয়, কিন্তু কার সঙ্গে—তা স্পষ্ট করা হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কাজ করছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, সামাজিক বিচার এড়িয়ে চলা এবং নিজস্ব পরিচয় ও আত্মনির্ভরতার বার্তা দেওয়ার প্রবণতা। সম্পর্ক যেন পরিচয়ের একমাত্র বা প্রধান উপাদান না হয়ে দাঁড়ায়—এটাই অনেকের চাওয়া।
আত্মনির্ভরতার বার্তা ও নারীর নতুন পরিচয়
৩৩ হাজার ফলোয়ারের ইনফ্লুয়েন্সার তাওয়ানা মুসভাবুরি জানান, তিনি সচেতনভাবেই প্রেমিকের মুখ আড়াল করেন। তার ভাষায়, “আমি চাই মানুষ আমাকে একজন শক্তিশালী, স্বনির্ভর নারী হিসেবে দেখুক। আমার সাফল্য যেন কোনো পুরুষের সঙ্গে যুক্ত না হয়।”
এই মনোভাবই দেখায়, আজকের অনেক তরুণী সম্পর্ককে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবেই রাখতে চান, জনসমক্ষে পরিচয়ের অংশ বানাতে নয়।
সম্পর্ক আর ‘অর্জন’ নয়
ভোগ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আলোচিত লেখায় লেখক শঁতে জোসেফ বলেন, নারীদের সম্পর্কবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই সামাজিক স্বীকৃতি চান, কিন্তু “বয়ফ্রেন্ড-পাগল” তকমা নিতে রাজি নন। তার মতে, প্রেমিক থাকা এখন আর কোনো সামাজিক অর্জন হিসেবে দেখা হয় না; বরং কখনো কখনো তা নারীর স্বাধীন পরিচয়ের পথে বাধা বলেও বিবেচিত হচ্ছে।
ইনফ্লুয়েন্সারদের
দক্ষিণ লন্ডনের কনটেন্ট ক্রিয়েটর স্টেফানি ইয়েবোয়াহ বলেন, প্রেমিকের ছবি পোস্ট করার পর তিনি প্রায় এক হাজার ফলোয়ার হারান। তার অভিজ্ঞতা, দর্শকরা তার কনটেন্ট থেকে ব্যক্তিগত জীবনের উপস্থিতি মেনে নিতে পারেননি।
কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক ড. জিলিয়ান ব্রুকস ব্যাখ্যা করে বলেন, “ইনফ্লুয়েন্সাররা আসলে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা নান্দনিকতা বিক্রি করেন। সেই ব্র্যান্ডের বাইরে কিছু এলে দর্শক বিভ্রান্ত হয় এবং আগ্রহ হারায়।”
সাধারণ নারীদের দোটানা
এই প্রবণতা শুধু ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২৫ বছর বয়সী মিল্লি বলেন, “আমি বাগদত্তের ছবি দিতে দ্বিধায় থাকি। কারণ আমি চাই না মানুষ ভাবুক আমি তার ওপর নির্ভরশীল।”
২০ বছর বয়সী শার্লটের মতে, বন্ধুত্বের তুলনায় সম্পর্ক অনেক বেশি ব্যক্তিগত হওয়া উচিত। “অনলাইনে ছবি দিলে একটা নিখুঁত সম্পর্ক দেখানোর চাপ তৈরি হয়, যা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না,” বলেন তিনি।
কু-নজর, ঈর্ষা ও ডিজিটাল স্থায়িত্ব
২১ বছর বয়সী আথেরা জানান, তার অনেক বন্ধু কু-নজরের ভয়ে সম্পর্কের ছবি পোস্ট করেন না। অনেক সংস্কৃতিতে ঈর্ষাপূর্ণ দৃষ্টি বা ‘ইভিল আই’ ক্ষতির কারণ হতে পারে—এই বিশ্বাস এখনো শক্তভাবে টিকে আছে।
মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজমনোবিজ্ঞানী ড. গোয়েনডোলিন সাইডম্যান বলেন, “মানুষ এখন বুঝতে পারছে, অনলাইনে একবার কিছু পোস্ট করলে তা মুছে ফেলা কঠিন। ডিজিটাল স্মৃতি স্থায়ী হয়ে যায়। তাই ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, আজকের তরুণীরা প্রেম লুকোচ্ছে বলে নয়—বরং তারা তাদের পরিচয়, স্বাধীনতা ও গোপনীয়তাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। সম্পর্ক এখন আর প্রদর্শনের বিষয় নয়; বরং নিজের মতো করে বাঁচার পথচলার এক ব্যক্তিগত অধ্যায়।






















