হিংসা মানুষকে অন্যের আগে নিজেকেই ধ্বংস করে
- Update Time : ০২:২৮:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
- / ৮৯ Time View

মানুষের অন্তরের সবচেয়ে ভয়াবহ রোগগুলোর একটি হলো হিংসা (হাসাদ)। এটি এমন এক আগুন, যা প্রথমে অন্যের কল্যাণ দেখে কষ্ট পায়, তারপর ধীরে ধীরে নিজের হৃদয়, ঈমান, আমল ও মানসিক শান্তিকে গ্রাস করে। হিংসুক মানুষ কখনো শান্তিতে থাকতে পারে না। তার অন্তরে সর্বদা অস্থিরতা, হতাশা ও অসন্তোষ কাজ করে। অন্যের সুখ, সফলতা কিংবা আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত তাকে পীড়া দেয়। ফলে তার হৃদয় জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মতো হয়ে ওঠে, যেখান থেকে ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ, মিথ্যাচার ও প্রতিহিংসার স্ফুলিঙ্গ বের হতে থাকে।
হিংসা কী?
ইসলামী পরিভাষায় হিংসা বা হাসাদ হলো—আল্লাহ অন্য কাউকে যে নিয়ামত দান করেছেন, তা তার কাছ থেকে চলে যাক—এমন কামনা করা এবং তা দেখে অন্তরে কষ্ট অনুভব করা।
মহান আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের সম্পর্কে বলেন:
“যদি তোমাদের কোনো কল্যাণ স্পর্শ করে, তাতে তারা অসন্তুষ্ট হয়। আর যদি তোমাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তাতে তারা আনন্দিত হয়।”
(সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১২০)
এটাই হিংসার প্রকৃত চিত্র। হিংসুক ব্যক্তি অন্যের সুখ সহ্য করতে পারে না এবং অন্যের কষ্টে আনন্দ খুঁজে পায়।
হিংসা—একটি আত্মবিধ্বংসী আগুন
হিংসা অন্যকে যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে হিংসুকের নিজের। হিংসুক ব্যক্তি কখনো মানসিক প্রশান্তি পায় না। তার হৃদয় সর্বদা রাগ, ক্ষোভ ও হতাশায় জ্বলতে থাকে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“বলে দাও, তোমরা তোমাদের রাগ নিয়ে মরো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত।”
(সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে গ্রাস করে, যেমন আগুন কাঠকে
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯০৫)
অর্থাৎ, বছরের পর বছর ইবাদত, দান-সদকা ও সৎকর্মের সওয়াবও হিংসার কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
ইসলামের ইতিহাসে হিংসার ভয়াবহ উদাহরণ
১. শয়তানের হিংসা
সৃষ্টির শুরুতেই শয়তান হিংসার শিকার হয়েছিল। আল্লাহ যখন আদম (আ.)-কে সম্মানিত করে ফেরেশতাদের সিজদার নির্দেশ দিলেন, তখন ইবলিস অহংকার ও হিংসার বশবর্তী হয়ে অস্বীকার করল।
তার যুক্তি ছিল:
“আমি তার চেয়ে উত্তম। তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছ এবং তাকে সৃষ্টি করেছ মাটি থেকে।”
(সুরা আরাফ, আয়াত: ১২)
এই হিংসা ও অহংকারের কারণেই সে চিরতরে আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত হয়।
২. কাবিলের হিংসা
আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল তার ভাই হাবিলকে হিংসার কারণে হত্যা করেছিল। পৃথিবীর প্রথম হত্যাকাণ্ডের পেছনেও ছিল হিংসা ও বিদ্বেষ।
৩. ইহুদিদের হিংসা
আহলে কিতাবের অনেকে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি হিংসা পোষণ করেছিল, কারণ শেষ নবী তাদের বংশ থেকে আসেননি।
আল্লাহ বলেন:
“আহলে কিতাবের অনেকেই চায় তোমাদের ঈমান আনার পর তোমাদের আবার কুফরিতে ফিরিয়ে নিতে, তাদের অন্তরের বিদ্বেষের কারণে।”
(সুরা বাকারা, আয়াত: ১০৯)
৪. ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের হিংসা
নবী ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা পিতার ভালোবাসার কারণে তার প্রতি হিংসান্বিত হয়ে তাকে কূপে নিক্ষেপ করেছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-কেই মর্যাদার সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছিলেন।
হিংসা কেন জন্ম নেয়?
১. অতিরিক্ত লোভ
২. অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতা
৩. নেতৃত্ব বা মর্যাদা হারানোর ভয়
৪. অন্যের সফলতা সহ্য করতে না পারা
৫. আল্লাহর তাকদিরের ওপর অসন্তুষ্টি
অনেক মানুষ সবসময় মনে করে, পৃথিবীর সব ভালো কিছু তার প্রাপ্য। অন্যের উন্নতি দেখলে তারা নিজের ব্যর্থতার কারণ খুঁজে না নিয়ে হিংসার আগুনে পুড়তে থাকে।
হিংসা থেকে বাঁচার ইসলামী উপায়
১. আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা
আল্লাহ তাআলা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন:
“এবং আমি আশ্রয় চাই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।”
(সুরা ফালাক, আয়াত: ৫)
তাই নিয়মিত সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করা উচিত।
২. মুমিনদের জন্য দোয়া করা
কোরআনের একটি সুন্দর দোয়া:
“হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্ববর্তী মুমিন ভাইদের ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের অন্তরে মুমিনদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না।”
(সুরা হাশর, আয়াত: ১০)
৩. অন্যের কল্যাণ কামনা করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না; বরং আল্লাহর বান্দা হয়ে ভাই ভাই হয়ে যাও।”
(জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৩৫)
৪. আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা
যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে, আল্লাহ প্রত্যেককে তাঁর হিকমত অনুযায়ী রিজিক, সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন, সে কখনো হিংসায় আক্রান্ত হয় না।
হিংসা এমন একটি রোগ, যা মানুষের হৃদয়কে অন্ধকার করে দেয়, সম্পর্ক নষ্ট করে, নেক আমল ধ্বংস করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। হিংসুক ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করার আগে নিজের শান্তি, নিজের ঈমান এবং নিজের আমলকে ধ্বংস করে ফেলে।
তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো—অন্যের সুখে আনন্দিত হওয়া, আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা, অন্তরকে বিদ্বেষমুক্ত রাখা এবং সবসময় এই দোয়া করা:
“হে আল্লাহ! আমার অন্তরকে হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে পবিত্র করে দিন এবং আমাকে আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন।”
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হিংসা ও বিদ্বেষের ব্যাধি থেকে হেফাজত করুন এবং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ দান করুন। আমিন।






















