সময়: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

করের আওতায় আসছে মুদি দোকান, বিউটি পার্লারসহ ১৬টি খাত

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৬:২৪:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
  • / ১২১ Time View

 

২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার মুদি দোকান, বিউটি পার্লার, রেস্তোরাঁ, পোশাকের দোকান, ইলেকট্রনিকস পণ্যের দোকানসহ ১৬টি নতুন ব্যবসা খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে। সরকারের যুক্তি—করের আওতা বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি করা এবং উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য রাজস্বভিত্তি শক্তিশালী করা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই নতুন ভ্যাটের বোঝা শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে?

বাস্তবতা হলো, কোনো ব্যবসায়ী নিজের পকেট থেকে ভ্যাট দেন না; তিনি তা পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় করেন। ফলে মুদি দোকান, পোশাকের দোকান, মিষ্টির দোকান কিংবা বিউটি পার্লার—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কোথায়?

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ওষুধ, শিক্ষা ও চিকিৎসা—সব কিছুর দামই গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমন অবস্থায় মুদি দোকানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

একজন দিনমজুর, একজন পোশাক শ্রমিক কিংবা একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি যখন বাজারে যাবেন, তখন হয়তো তিনি সরাসরি “ভ্যাট” শব্দটি দেখবেন না, কিন্তু পণ্যের বাড়তি দামের মাধ্যমে সেই ভ্যাটের বোঝা তাকেই বহন করতে হবে।

সরকার কি অন্য কোনো পথ নিতে পারত?

অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে, নতুন করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর করের চাপ বাড়ানোর আগে প্রয়োজন—

  • বড় কর ফাঁকিদাতাদের শনাক্ত করা;
  • অর্থ পাচার বন্ধ করা;
  • খেলাপি ঋণ আদায় করা;
  • কালো টাকা ও অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া;
  • কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা।

প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের কারণে রাষ্ট্র রাজস্ব হারায়। সেই অর্থ উদ্ধার করতে না পেরে যদি সরকার আবারও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত খাতগুলোতে নতুন ভ্যাট আরোপ করে, তাহলে তা জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করতেই পারে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়বেন

দেশের অধিকাংশ মুদি দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ কিংবা বিউটি পার্লার খুব সীমিত মূলধনে পরিচালিত হয়। ভ্যাট ব্যবস্থার জটিল হিসাব-নিকাশ, রিটার্ন দাখিল ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য নতুন ঝামেলা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হতে পারে।

ফলে অনেকেই হয়তো ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হবেন অথবা পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেবেন।

রাজস্ব প্রয়োজন, কিন্তু ভারসাম্যও প্রয়োজন

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কর আদায় অবশ্যই প্রয়োজন। উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো—সবকিছুই রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু করনীতি এমন হওয়া উচিত, যাতে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ না করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত না করে।

সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—রাজস্ব বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখা।

নতুন ভ্যাটনীতি বাস্তবায়নের আগে তাই প্রয়োজন ব্যাপক জনপরামর্শ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বিবেচনা এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবের গভীর মূল্যায়ন। অন্যথায় রাজস্ব বাড়লেও জনগণের কষ্ট আরও বেড়ে যেতে পারে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

করের আওতায় আসছে মুদি দোকান, বিউটি পার্লারসহ ১৬টি খাত

Update Time : ০৬:২৪:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

 

২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার মুদি দোকান, বিউটি পার্লার, রেস্তোরাঁ, পোশাকের দোকান, ইলেকট্রনিকস পণ্যের দোকানসহ ১৬টি নতুন ব্যবসা খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে। সরকারের যুক্তি—করের আওতা বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি করা এবং উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য রাজস্বভিত্তি শক্তিশালী করা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই নতুন ভ্যাটের বোঝা শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে?

বাস্তবতা হলো, কোনো ব্যবসায়ী নিজের পকেট থেকে ভ্যাট দেন না; তিনি তা পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় করেন। ফলে মুদি দোকান, পোশাকের দোকান, মিষ্টির দোকান কিংবা বিউটি পার্লার—সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কোথায়?

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ওষুধ, শিক্ষা ও চিকিৎসা—সব কিছুর দামই গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমন অবস্থায় মুদি দোকানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

একজন দিনমজুর, একজন পোশাক শ্রমিক কিংবা একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি যখন বাজারে যাবেন, তখন হয়তো তিনি সরাসরি “ভ্যাট” শব্দটি দেখবেন না, কিন্তু পণ্যের বাড়তি দামের মাধ্যমে সেই ভ্যাটের বোঝা তাকেই বহন করতে হবে।

সরকার কি অন্য কোনো পথ নিতে পারত?

অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে, নতুন করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর করের চাপ বাড়ানোর আগে প্রয়োজন—

  • বড় কর ফাঁকিদাতাদের শনাক্ত করা;
  • অর্থ পাচার বন্ধ করা;
  • খেলাপি ঋণ আদায় করা;
  • কালো টাকা ও অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া;
  • কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা।

প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের কারণে রাষ্ট্র রাজস্ব হারায়। সেই অর্থ উদ্ধার করতে না পেরে যদি সরকার আবারও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত খাতগুলোতে নতুন ভ্যাট আরোপ করে, তাহলে তা জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করতেই পারে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়বেন

দেশের অধিকাংশ মুদি দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ কিংবা বিউটি পার্লার খুব সীমিত মূলধনে পরিচালিত হয়। ভ্যাট ব্যবস্থার জটিল হিসাব-নিকাশ, রিটার্ন দাখিল ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য নতুন ঝামেলা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হতে পারে।

ফলে অনেকেই হয়তো ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হবেন অথবা পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেবেন।

রাজস্ব প্রয়োজন, কিন্তু ভারসাম্যও প্রয়োজন

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কর আদায় অবশ্যই প্রয়োজন। উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো—সবকিছুই রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু করনীতি এমন হওয়া উচিত, যাতে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ না করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত না করে।

সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—রাজস্ব বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখা।

নতুন ভ্যাটনীতি বাস্তবায়নের আগে তাই প্রয়োজন ব্যাপক জনপরামর্শ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বিবেচনা এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবের গভীর মূল্যায়ন। অন্যথায় রাজস্ব বাড়লেও জনগণের কষ্ট আরও বেড়ে যেতে পারে।