সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি: উন্নয়নের বাংলাদেশ, নাকি অর্থ পাচারের বাংলাদেশ?
- Update Time : ০৬:০৮:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
- / ১২৬ Time View

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে নাভিশ্বাস তুলছে; অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমাকৃত অর্থ এক বছরে প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশিত এই তথ্য শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে।
২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার সমান। আগের বছর এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অবশ্য বাস্তবতা হলো, সুইস ব্যাংকে থাকা সব অর্থই অবৈধ বা পাচারকৃত নয়। আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঞ্চয়, বিদেশে বসবাসরত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বৈধ আমানত কিংবা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ হিসেবেও সেখানে অর্থ জমা থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ যখন বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ডলার ঘাটতি এবং বিনিয়োগ সংকট মোকাবিলা করছে, তখন বিদেশে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ এত দ্রুত বাড়ছে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার নিয়ে বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার, ওভার-ইনভয়েসিং, আন্ডার-ইনভয়েসিং, হুন্ডি, ভুয়া আমদানি-রপ্তানি, বিদেশে সম্পদ ক্রয় এবং অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং ব্যাংকিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও একই সময়ে দেশের সম্পদ বিদেশে স্থানান্তরের প্রবণতা কমেনি।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, অর্থ পাচার শুধু অর্থনীতির ক্ষতি করে না; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়। কারণ একজন সাধারণ নাগরিক যখন কর দেয়, নিয়ম মেনে ব্যবসা করে, ব্যাংকে সঞ্চয় রাখে এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে, তখন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নিতে পারে, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অর্থ পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি—এমন ধারণা এখন নতুন করে সামনে এসেছে। অনেকেই আশা করেছিলেন, সরকার পরিবর্তনের পর আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং বিদেশে অর্থ পাচারের প্রবণতা কমবে। কিন্তু সুইস ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশি ঋণ পরিশোধ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের জন্য নতুন বিনিয়োগের সন্ধান করছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থ যদি বিদেশের ব্যাংকে জমা হতে থাকে, তাহলে দেশীয় বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যে অর্থ দিয়ে নতুন কারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিল্প প্রকল্প গড়ে উঠতে পারত, সেই অর্থ বিদেশি আর্থিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে।
এখানে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোন অর্থ বৈধ এবং কোন অর্থ অবৈধ, তা নির্ধারণ করা। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়; তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত অর্থ পাচারকারীদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।
সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তথ্য বিনিময় চুক্তিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি। অতীতে সুইস ব্যাংকের গোপনীয়তা অর্থ পাচারকারীদের জন্য আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় সেই সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পেশাদার তদন্ত থাকলে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা অসম্ভব নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অর্থ পাচারকে কেবল একটি অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর ইস্যু। দেশের সম্পদ বিদেশে চলে গেলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকে—বাড়তি কর, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে।
আজ যখন লাখো মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা, যখন পেনশনভোগী ও নিম্নআয়ের মানুষ টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন, তখন সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর এখন দায়িত্ব—এই অর্থের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধান করা, অবৈধ অর্থ পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনা এবং দেশের জনগণকে নিশ্চিত করা যে বাংলাদেশের অর্থ বাংলাদেশের উন্নয়নেই ব্যবহৃত হবে, বিদেশি ব্যাংকের ভল্টে নয়।
অন্যথায় উন্নয়নের সব পরিসংখ্যান, প্রবৃদ্ধির সব গল্প এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সব দাবি সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েই থাকবে।














