সময়: সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরকীয়া: পরিবার ও সমাজ ধ্বংসের নীরব ব্যাধি

সাজেদা আক্তার
  • Update Time : ০৭:০২:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ২৫৮ Time View

 

পরিবার হলো সমাজের মৌলিক ভিত্তি। সুস্থ পরিবার ছাড়া সুস্থ সমাজ কল্পনা করা যায় না। অথচ আধুনিক যুগে প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে যে ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তার অন্যতম হলো পরকীয়া। এটি শুধু একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; বরং এর প্রভাব পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত।

পরকীয়ার অর্থ বাস্তবতা

পরকীয়া বলতে বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে অবৈধ প্রেম, যৌন সম্পর্ক বা আবেগগত সম্পর্ককে বোঝায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি সরাসরি শারীরিক সম্পর্ক না হলেও অন্তরের ব্যভিচার, গোপন যোগাযোগ ও আবেগের লেনদেন দিয়েই শুরু হয়। ইসলাম এ ধরনের সব পথকেই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

কুরআনের দৃষ্টিতে পরকীয়া

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে শুধু ব্যভিচার নয়, বরং তার দিকে নিয়ে যায় এমন সব পথ থেকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন—

“আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।”
— (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩২)

এই আয়াতে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, নিকটেও যেও না’—অর্থাৎ কথাবার্তা, দৃষ্টি, মেসেজ, গোপন সাক্ষাৎ—সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন—

“মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।”
— (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০)

“আর মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে…”
— (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১)

হাদিসে পরকীয়ার ভয়াবহতা

রাসূলুল্লাহ (সা.) পরকীয়াকে শুধু শরীরের নয়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও অন্তরের গুনাহ হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন—

“চোখের ব্যভিচার হলো তাকানো, কানের ব্যভিচার হলো শোনা, জিহ্বার ব্যভিচার হলো কথা বলা, হাতের ব্যভিচার হলো স্পর্শ করা, পায়ের ব্যভিচার হলো এগিয়ে যাওয়া, আর অন্তর কামনা করে—এরপর লজ্জাস্থান তা সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে।”

/> — (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

আরেক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন—

“যখন কোনো জাতির মধ্যে ব্যভিচার প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মধ্যে এমন রোগ ও মহামারি ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিল না।”
— (ইবনে মাজাহ)

পরিবারে পরকীয়ার ধ্বংসাত্মক প্রভাব

পরকীয়া প্রথম আঘাত হানে স্বামী-স্ত্রীর বিশ্বাসের ওপর। সংসারে অবিশ্বাস, সন্দেহ, ঝগড়া ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। এর ফলাফল হিসেবে দেখা দেয়—

  • দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া
  • তালাক ও বিচ্ছেদ
  • শিশুদের মানসিক ট্রমা
  • সন্তানদের নৈতিক অবক্ষয়
  • একক পরিবারে দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতা

শিশুরা যখন বাবা-মায়ের বিশ্বাসঘাতকতা প্রত্যক্ষ করে, তখন তাদের মধ্যে হতাশা, আক্রমণাত্মক আচরণ ও ধর্মবিমুখতা সৃষ্টি হয়।

সমাজে পরকীয়ার প্রভাব

পরকীয়া শুধু একটি পরিবার ধ্বংস করে না, বরং পুরো সমাজকে অসুস্থ করে তোলে। এর সামাজিক প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • সামাজিক মূল্যবোধের পতন
  • অবৈধ সন্তান ও পরিচয় সংকট
  • নারীর নিরাপত্তাহীনতা
  • পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি
  • অপরাধপ্রবণতা ও আত্মহত্যা

ইসলাম যে সমাজব্যবস্থাকে ‘হায়া’ ও ‘তাকওয়া’র ওপর দাঁড় করিয়েছে, পরকীয়া সেই ভিত্তিকেই ভেঙে দেয়।

পরকীয়া থেকে মুক্তির ইসলামী পথ

ইসলাম শুধু নিষেধই করেনি, বরং সমাধানের পথও দেখিয়েছে—

  1. দৃষ্টি সংযম পর্দা রক্ষা
  2. সময়মতো বিয়ে সহজ করা
  3. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা খোলামেলা যোগাযোগ
  4. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযম
  5. তাকওয়া আল্লাহভীতি জাগ্রত করা

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

“হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ এটি দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে।”
— (সহিহ বুখারি)

পরকীয়া কোনো আধুনিক স্বাধীনতা নয়; এটি একটি ধ্বংসাত্মক ব্যাধি। ইসলাম মানবজীবন, পরিবার ও সমাজকে রক্ষা করতেই এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ব্যক্তি যদি আল্লাহভীতিতে নিজেকে সংযত করে, পরিবারে দায়িত্বশীলতা গড়ে ওঠে এবং সমাজ যদি নৈতিকতার পক্ষে দাঁড়ায়—তবেই এই নীরব ব্যাধি থেকে মুক্তি সম্ভব।

পরকীয়া থেকে বাঁচা মানেই পরিবার বাঁচানো, সমাজ বাঁচানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ করা।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

সাজেদা আক্তার

সাজেদা আক্তার একজন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী এবং দক্ষ কলামিস্ট, যিনি সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বিডিবো নিউজে, তিনি সমাজ, পরিবার এবং জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে লেখেন। একজন অভিজ্ঞ কলামিস্ট হিসেবে, তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় সমাজিক বিষয়, পারিবারিক গতিশীলতা এবং বিভিন্ন জীবনধারা সম্পর্কিত ভাবনাপ্রসূত বিষয়গুলি নিয়ে লেখেন। সামাজিক প্রবণতাগুলি বিশ্লেষণ ও প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা তাকে এই ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্থান দিয়েছে। সাজেদা আক্তারের কাজ শুধু পাঠকদের তথ্য প্রদান করে না, বরং তাদের অনুপ্রাণিতও করে, যা তাকে সাংবাদিকতা এবং সমাজবিজ্ঞানের জগতে সম্মানিত একটি কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

পরকীয়া: পরিবার ও সমাজ ধ্বংসের নীরব ব্যাধি

Update Time : ০৭:০২:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

 

পরিবার হলো সমাজের মৌলিক ভিত্তি। সুস্থ পরিবার ছাড়া সুস্থ সমাজ কল্পনা করা যায় না। অথচ আধুনিক যুগে প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে যে ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তার অন্যতম হলো পরকীয়া। এটি শুধু একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; বরং এর প্রভাব পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত।

পরকীয়ার অর্থ বাস্তবতা

পরকীয়া বলতে বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে অবৈধ প্রেম, যৌন সম্পর্ক বা আবেগগত সম্পর্ককে বোঝায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি সরাসরি শারীরিক সম্পর্ক না হলেও অন্তরের ব্যভিচার, গোপন যোগাযোগ ও আবেগের লেনদেন দিয়েই শুরু হয়। ইসলাম এ ধরনের সব পথকেই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

কুরআনের দৃষ্টিতে পরকীয়া

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে শুধু ব্যভিচার নয়, বরং তার দিকে নিয়ে যায় এমন সব পথ থেকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন—

“আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।”
— (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩২)

এই আয়াতে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, নিকটেও যেও না’—অর্থাৎ কথাবার্তা, দৃষ্টি, মেসেজ, গোপন সাক্ষাৎ—সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন—

“মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।”
— (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০)

“আর মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে…”
— (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১)

হাদিসে পরকীয়ার ভয়াবহতা

রাসূলুল্লাহ (সা.) পরকীয়াকে শুধু শরীরের নয়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও অন্তরের গুনাহ হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন—

“চোখের ব্যভিচার হলো তাকানো, কানের ব্যভিচার হলো শোনা, জিহ্বার ব্যভিচার হলো কথা বলা, হাতের ব্যভিচার হলো স্পর্শ করা, পায়ের ব্যভিচার হলো এগিয়ে যাওয়া, আর অন্তর কামনা করে—এরপর লজ্জাস্থান তা সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে।”

/> — (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

আরেক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন—

“যখন কোনো জাতির মধ্যে ব্যভিচার প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মধ্যে এমন রোগ ও মহামারি ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিল না।”
— (ইবনে মাজাহ)

পরিবারে পরকীয়ার ধ্বংসাত্মক প্রভাব

পরকীয়া প্রথম আঘাত হানে স্বামী-স্ত্রীর বিশ্বাসের ওপর। সংসারে অবিশ্বাস, সন্দেহ, ঝগড়া ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। এর ফলাফল হিসেবে দেখা দেয়—

  • দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া
  • তালাক ও বিচ্ছেদ
  • শিশুদের মানসিক ট্রমা
  • সন্তানদের নৈতিক অবক্ষয়
  • একক পরিবারে দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতা

শিশুরা যখন বাবা-মায়ের বিশ্বাসঘাতকতা প্রত্যক্ষ করে, তখন তাদের মধ্যে হতাশা, আক্রমণাত্মক আচরণ ও ধর্মবিমুখতা সৃষ্টি হয়।

সমাজে পরকীয়ার প্রভাব

পরকীয়া শুধু একটি পরিবার ধ্বংস করে না, বরং পুরো সমাজকে অসুস্থ করে তোলে। এর সামাজিক প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • সামাজিক মূল্যবোধের পতন
  • অবৈধ সন্তান ও পরিচয় সংকট
  • নারীর নিরাপত্তাহীনতা
  • পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি
  • অপরাধপ্রবণতা ও আত্মহত্যা

ইসলাম যে সমাজব্যবস্থাকে ‘হায়া’ ও ‘তাকওয়া’র ওপর দাঁড় করিয়েছে, পরকীয়া সেই ভিত্তিকেই ভেঙে দেয়।

পরকীয়া থেকে মুক্তির ইসলামী পথ

ইসলাম শুধু নিষেধই করেনি, বরং সমাধানের পথও দেখিয়েছে—

  1. দৃষ্টি সংযম পর্দা রক্ষা
  2. সময়মতো বিয়ে সহজ করা
  3. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা খোলামেলা যোগাযোগ
  4. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযম
  5. তাকওয়া আল্লাহভীতি জাগ্রত করা

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

“হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ এটি দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে।”
— (সহিহ বুখারি)

পরকীয়া কোনো আধুনিক স্বাধীনতা নয়; এটি একটি ধ্বংসাত্মক ব্যাধি। ইসলাম মানবজীবন, পরিবার ও সমাজকে রক্ষা করতেই এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ব্যক্তি যদি আল্লাহভীতিতে নিজেকে সংযত করে, পরিবারে দায়িত্বশীলতা গড়ে ওঠে এবং সমাজ যদি নৈতিকতার পক্ষে দাঁড়ায়—তবেই এই নীরব ব্যাধি থেকে মুক্তি সম্ভব।

পরকীয়া থেকে বাঁচা মানেই পরিবার বাঁচানো, সমাজ বাঁচানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ করা।