দুঃস্বপ্নের রাত
- Update Time : ০৯:৪৩:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২৫০ Time View

নাবিল আর নাফিস—আমার দুই ছেলে। আমার হৃদয়, আমার স্পন্দন। ২০২৬ সালের ১লা জানুয়ারি নাফিসের ফল প্রকাশিত হলো। সে নবম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করল। আনন্দে বুক ভরে উঠল। তার ঠিক চার দিন পর, ৫ জানুয়ারি, সে অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষাও শেষ করল। একজন বাবা হিসেবে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই বলার ছিল না।
এরপর ৮ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার। আমি আর আমার স্ত্রী—নাবিল ও নাফিসের মা—গ্রামে যাই আমাদের জমিজমা সংক্রান্ত একটি বিষয়ে। পরিকল্পনা ছিল, শুক্রবারই ফিরে আসব। কিন্তু ফ্রিদ কাকা,খরশেদ মামা, সবুজ কাকা সহ সবাই বললেন, “তুমি শনিবার যেও। আমাদের পারিবারিক কবরস্থানের সীমানা নির্ধারণ হবে, তুমি থাকলে ভালো হয়।” রাজি হলাম।
শুক্রবার রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ রাত ১২টা ০৫ মিনিট। আমার মোবাইলে কল।আমার স্ত্রী রিসিভ করলেন। ফোনের ওপাশে আমার ভাগ্নি আশা মনি—যিনি সদ্য মাস্টার্স করেছেন, যাকে বাসায় রেখে আমরা গ্রামে গিয়েছিলাম। ফোনে সে চিৎকার করে কাঁদছিল—
“তাড়াতাড়ি বাসায় আসেন, আমার ভাই নাফিস মরে যাচ্ছে!”
মাথা ঘুরে গেল। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই বলল, “আমরা হাসপাতালে যাচ্ছি, আপনারা আসেন।”
কোথায় গ্রাম, কোথায় শহর, গভীর রাত—গাড়ি পাবো কোথায়? পরিচিত সবাইকে ফোন করলাম। কেউই রাজি হলো না। শেষ পর্যন্ত আমার ছোট ভাই ইকবাল—সুনামগঞ্জ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে কর্মরত—তার মাধ্যমে ফোনে একটি সিএনজি জোগাড় হলো। তখন প্রায় রাত ১২টা ৩০।
সবাই বলছিল, সাবধানে যাবেন। দেশে এখন বিচার নেই, ডাকাতের ভয়। আমার বাবা—৮০ বছরের বৃদ্ধ—কাঁদছিলেন, শুধু বলছিলেন, “নাফিসের কী হলো?” তিনি আমাদের জন্য দোয়া করে দিলেন। আল্লাহর ওপর ভরসা করে যাত্রা শুরু করলাম।
আলহামদুলিল্লাহ, পুরো পথে কোনো বিপদ হয়নি। হাইওয়ে পুলিশ আমাদের থামাল, সালাম দিল, বলল—“স্যার, চলে যান।” সংবাদপত্রে লেখালেখির কারণে অনেক অফিসার আমাকে চেনেন। জানি না তারা আমাকে চিনেছিলেন কি না, তবে সম্মান দেখিয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাইওয়ে পুলিশকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
প্রায় এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছালাম। রাস্তা ছিল ফাঁকা। আশা মনিকে ফোন দিলাম। সে বলল, ডাক্তার হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়েছে। ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।
বাসায় ঢুকে দেখি—নাফিস ঘুমাচ্ছে। ডাক দিলাম। কোনো সাড়া নেই। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে তাকে নাশতা খাওয়ালাম। জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছিল? নাফিস বলল, “রাত ১১টার পর কী হয়েছে আমি জানি না। এমনকি কখন, কীভাবে আমাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে—তাও জানি না।”
তাহলে আসলে কী হয়েছিল?
ওই রাতে প্রায় ১১টার দিকে নাবিল বলেছিল, “তুমি ওঠো, আমি বেড রেডি করছি। তুমি অপেক্ষা করো।”
এর মধ্যে নাফিস আমাদের বেডরুমে এসে পড়ে, কিন্তু নাবিল খেয়াল করেনি। প্রায় ২০ মিনিট পর নাবিল এসে দেখে—আমাদের বেডরুমে, আমার পিসির সামনে চেয়ারে বসে নাফিস কাঁপছে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ছুঁতেই সে ঢলে পড়ে। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। চোখ বন্ধ। কথা বলছে না।
নাবিল তখন চিৎকার করে আশাকে ডাকে!
অথচ নাফিস ছিল সম্পূর্ণ সুস্থ। আলহামদুলিল্লাহ, তার কোনো অসুস্থতা ছিল না।
পরদিন ডাক্তার দেখানো হলো। ডাক্তার আমার খুব কাছের মানুষ। সব শুনলেন, পরীক্ষা করলেন। বললেন, নাফিসের কোনো শারীরিক সমস্যা নেই। নাফিসকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি একা ছিলে? কিছু দেখেছ? ইলেকট্রিক শক খেয়েছ?”
নাফিস বলল, “না।”
তখন ডাক্তার বললেন, “আপনি আর কখনো বাচ্চাদের একা রেখে যাবেন না।”
প্রেশার মাপার সময় তিনি দেখলেন নাফিসের হাতে আঁচড়ের দাগ। নাফিস দেখাল—পায়েও আঁচড় আছে, কিন্তু কীভাবে হয়েছে সে জানে না।
ডাক্তার সাহেব রাশিয়ায় পড়াশোনা করেছেন। তিনি একজন কুরআনের হাফেজও। তিনি আমাকে বললেন,
“আপনি বুঝে নিন। আমি বাচ্চার সামনে আর কিছু বলবো না। একজন আলেমকে দেখান।”
সেই রাতটা ছিল দূর স্বপ্নের রাত—ভয়ংকর, অজানা, শীতল।
আজও ভাবলে শরীর কেঁপে ওঠে।
আল্লাহ আমাদের হেফাজত করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।






















