ধর্মান্তর, গোপন বিয়ে ও এক অনন্ত প্রেম: ধর্মেন্দ্র–হেমা মালিনীর অজানা অধ্যায়
- Update Time : ০৯:৫৬:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
- / ২২২ Time View

বলিউডের ইতিহাসে প্রেমের কাহিনি অনেক। কিন্তু ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনীর সম্পর্ক যেন এক অনন্ত অধ্যায়—যেখানে আছে মোহ, দ্বিধা, সামাজিক বাধা, গোপনতা, ত্যাগ আর স্থায়ী প্রেমের সাক্ষ্য। সময়ের স্রোত বয়ে গেছে বহু দূর, কিন্তু ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুর পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছে এই কিংবদন্তি প্রেম।
প্রথম দেখাতেই মুগ্ধতা
হেমা মালিনী তাঁর আত্মজীবনী ‘হেমা মালিনী: বিয়ন্ড দ্য ড্রিম গার্ল’-এ প্রথম সাক্ষাতের মুহূর্তকে স্মৃতির পটে ধরে রেখেছেন। একটি অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠতে যাবেন—ঠিক তখনই শুনলেন, ধর্মেন্দ্র শশী কাপুরকে পাঞ্জাবিতে বলছেন, “মেয়েটা খুব সুন্দর।”
সেই মুহূর্তেই তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় রাজ কাপুরের ‘ড্রিম গার্ল’ নামে। দুই সুপারস্টারের মাঝে দাঁড়িয়ে হেমার মনে জন্ম নেয় অস্বস্তি, নার্ভাসনেস ও কৌতূহলের মিশেল। কে জানত, এই কিছু সেকেন্ডের ঘটনার ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠবে বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রেমকাহিনিগুলোর একটি!
সেট থেকে শুরু হয় যাত্রা: ‘তুম হাসিন ম্যায় জওয়ান’
১৯৭০ সালে ‘তুম হাসিন ম্যায় জওয়ান’ ছবির সেটই তাঁদের সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তখন ধর্মেন্দ্র ছিলেন দু’ সন্তানের বাবা; পরিবার, ক্যারিয়ার—সবই স্থিতিশীল। কিন্তু হেমাকে দেখা মাত্র তাঁর মনে জন্ম নেয় নতুন অনুভূতির ঢেউ।
হেমাও পরবর্তী সময়ে বলেন—
“ধর্মেন্দ্রকে দেখলেই বোঝা যেত, এ মানুষটিই আমার জীবনের সঙ্গী হতে পারেন।”
সেই থেকে শুরু। একের পর এক ছবি—শোলে, সীতা অউর গীতা, নসীব, আন্ধা কানুন—মোট ৪২টি সিনেমায় তাঁদের রসায়ন দর্শকদের হৃদয় জয় করে। পর্দার রোম্যান্স আড়ালে আড়ালে বাস্তবেও গাঢ় হতে থাকে।

ধর্মেন্দ্র–হেমার প্রেমে প্রথম আঘাত: অনীতা রাজ অধ্যায়
ধর্মেন্দ্র ছিলেন প্রকাশ কৌরের স্বামী। এমন সময় শোনা যায় অভিনেত্রী অনীতা রাজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার গুঞ্জন। গুঞ্জন পৌঁছে যায় সংসারেও। খবরটি হেমার কানে গেলে তিনি আহত হন। ধর্মেন্দ্রকে সতর্ক করেন এবং নিজেকে সরিয়ে নেন।
পাঁচ বছরের প্রেম, কিন্তু বিয়েতে অদম্য বাধা
হেমা মালিনীর পরিবার শুরু থেকেই দ্বিধায় ছিল। কারণ ধর্মেন্দ্র তখনো বিবাহিত এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌর কোনোভাবেই বিবাহবিচ্ছেদে রাজি ছিলেন না। হিন্দু আইনে দ্বিতীয় বিয়ে সম্ভব হচ্ছিল না। বিতর্ক, সামাজিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে বিয়ে ছিল প্রায় অসম্ভব।
তবুও প্রেম থেমে থাকেনি।
চরম সিদ্ধান্ত: ধর্মান্তর ও গোপন বিয়ে
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে দুজনই নেন এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। ধর্মেন্দ্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। নতুন নাম রাখা হয়—দিলাওয়ার খান। হেমাও ধর্মান্তরিত হয়ে নাম নেন আইশা।
মাত্র দুই সাক্ষী রেখে সম্পন্ন হয় তাঁদের প্রথম বিবাহ। পরে আবার দক্ষিণ ভারতীয় রীতি মেনে আরেকটি আনুষ্ঠানিক বিয়ে করেন তাঁরা।
এই সিদ্ধান্ত তাঁদের ক্যারিয়ার, সমাজ—সব জায়গাতেই আলোড়ন তোলে। তবে দুজনই ছিলেন অটল; তাঁরা জানতেন, জীবনের বাকি পথ তাঁরা একসঙ্গেই হাঁটতে চান।

নতুন জীবনের সূচনা ও দুই কন্যার আগমন
১৯৮১ সালে জন্ম হয় তাঁদের প্রথম কন্যা এশা দেওল। এরপর ১৯৮৫ সালে আসে তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান আহানা দেওল।
ধর্মেন্দ্র তাঁর সন্তানদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল। শুটিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও ছুটে যেতেন ছোট দুই মেয়ের কাছে—যে ভালোবাসার কথা সাক্ষাৎকারে বহুবার বলেছেন এশা-আহানা।
প্রকাশ কৌরের অভিমত: তিক্ততা নয়, বরং একটি স্বীকারোক্তি
১৯৮১ সালে স্টারডাস্ট–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ধর্মেন্দ্রর স্ত্রী প্রকাশ কৌর বলেন—
“শুধু আমার স্বামী কেন, যে কোনো পুরুষই হেমাকে পছন্দ করত। তিনি নিখুঁত স্বামী নন, কিন্তু অসাধারণ বাবা।”
প্রকাশ কখনো হেমাকে সরাসরি দোষারোপ করেননি। তবে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন—
“আমি বুঝতে পারি হেমার অনুভূতি। কিন্তু আমি যদি হেমার জায়গায় থাকতাম, আমি তাঁর মতো কাজ করতাম না। একজন স্ত্রী ও মা হিসেবে এটা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না।”
এ বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের অস্থিরতা, এক নারীর অসহায়ত্ব এবং আরেক নারীর সামাজিক সমালোচনার বিরুদ্ধে লড়াই।
ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুর পর প্রেমকাহিনির পুনরুজ্জীবন
ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুর পর বলিউডের ইতিহাসচর্চায় নতুন করে ফিরে এসেছে এই প্রেমগাথা। কেউ বলছেন এটি সাহসিকতা, কেউ বলেন সামাজিক নিয়ম ভেঙে এগোনোর এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত। আবার অনেকেই মনে করেন, প্রেম—যা সত্যিকারের—কোনো বাধাই তাকে দীর্ঘদিন থামিয়ে রাখতে পারে না।
ধর্মেন্দ্র–হেমার সম্পর্ক প্রমাণ করে দিয়েছে,
প্রেম সবসময়ই প্রচলিত নিয়ম মেনে চলেনা; কখনো তা নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করে নেয়।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, হেমা মালিনীর আত্মজীবনী ‘বিয়ন্ড দ্য ড্রিম গার্ল’।
















