মন্দিরে ধর্ষণ ও গণকবর! ৫০০ লাশ গুমের অভিযোগে উত্তাল ভারত
- Update Time : ০৬:০৬:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
- / ২২২ Time View

ভারতের কর্ণাটকের বিখ্যাত তীর্থস্থান ধর্মস্থল এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এই পবিত্র স্থানটিকে ঘিরে সামনে এসেছে এক ভয়াবহ, মানবতা লজ্জিত করা অভিযোগ—প্রায় দুই দশক ধরে সেখানে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে শতাধিক নারী, যাদের অধিকাংশই কিশোরী। গুম করা হয়েছে তাদের মরদেহ—কখনো পুড়িয়ে, কখনো কবর দিয়ে, আবার কখনো মন্দির প্রাঙ্গণের ভেতরেই মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি নতুন করে সামনে আসে এক পরিচ্ছন্নতা কর্মীর বিস্ফোরক জবানবন্দির মাধ্যমে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মী অভিযোগ করেছেন, তিনি নিজেই ১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে বহু নারী ও কিশোরীর দেহ কবর দিয়েছেন বা পোড়ানোর কাজে বাধ্য হয়েছেন।
গণকবরের সন্ধান, ১০০’র বেশি কঙ্কাল উদ্ধার
সম্প্রতি মন্দিরের পেছনের নির্জন এলাকা খনন করে পাওয়া গেছে একের পর এক গণকবর। ভারতীয় গণমাধ্যম NDTV, The Wire ও Scroll.in-এর বরাত দিয়ে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫০০টির মতো গণকবর চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্য থেকে ১০০টির বেশি মানব কঙ্কাল উদ্ধার হয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই নারীদেহের।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জবানবন্দিতে উঠে আসে ভয়ংকর বিবরণ—
“আমি বহুবার দেখেছি, মেয়েদের শরীরে কোনো পোশাক ছিল না। তাদের দেহে জখমের দাগ, শ্বাসরোধের চিহ্ন, রক্তক্ষরণের প্রমাণ ছিল। তারা সবাই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। কেউ কেউ ছিল মাত্র ১২-১৩ বছরের কিশোরী। এমনকি একজন শিক্ষার্থীও ছিল, যাকে এক রাতে মন্দিরে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।”
সেই কর্মী তার বক্তব্যের পক্ষে কিছু চিত্র ও ভিডিও ফুটেজ পুলিশের কাছে জমা দিয়েছেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে কঙ্কাল ও পোড়ানো দেহাবশেষ।
ভিকটিম পরিবারদের স্বীকারোক্তি, নিখোঁজের নতুন তদন্ত দাবি
এই অভিযোগের পর ধর্মস্থল সংলগ্ন এলাকায় একাধিক নিখোঁজের পুরনো মামলা পুনরায় আলোচনায় এসেছে। সুজাতা নামের এক নারী অভিযোগ করেছেন, ২০০৩ সালে তার কিশোরী মেয়ে অনন্যা ধর্মস্থল ঘুরতে গিয়ে নিখোঁজ হন। তিনি মনে করছেন, মেয়েটিও মন্দির কর্তৃপক্ষের যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। “অনন্যা নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো সন্ধান মেলেনি। আজ যখন জানতে পারছি এই গণকবরের কথা, বুক কাঁপে। আমি চাই, মাটি খুঁড়ে হলেও প্রমাণ বের হোক,” বলেন সুজাতা।
সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক চাপ
ঘটনার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে তীব্র জনরোষ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে #JusticeForTempleVictims, #ShameOnBJP ট্রেন্ড। বহু বিশ্লেষক দাবি করছেন, ধর্মস্থল মন্দিরের ওই সময়কার প্রশাসনে শাসক দল বিজেপি-র প্রভাবশালী নেতাদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, নারীবাদী সংগঠন ও বুদ্ধিজীবী মহল প্রশ্ন তুলেছেন—কেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় সরকার এখনো কোনও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের ঘোষণা দেননি? অনেকের দাবি, হিন্দুত্বের নাম করে অপরাধ ঢাকার এই রাজনীতি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।
বিচারবিভাগীয় তদন্ত ও আন্তর্জাতিক নজরদারি দাবি
মামলাটি নিয়ে এখন ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টে পৃথক রিট দায়ের করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও এর মধ্যে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। Amnesty International এবং Human Rights Watch ইতিমধ্যেই ঘটনাটি পর্যবেক্ষণে রেখেছে বলে জানা গেছে।
শেষ কথা
একটি তীর্থস্থান, যেখানে মানুষ যায় প্রার্থনার জন্য, শান্তি খুঁজতে, সেই জায়গাটিই যখন যৌন সহিংসতা ও গণহত্যার নারকীয় আস্তানা হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্র, সমাজ এবং ধর্ম—তিনটির দায়ই উঠে আসে প্রশ্নবিদ্ধভাবে। ভারত এখন দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়াবহ আত্মবিশ্লেষণের সামনে।
এমন নৃশংসতা কি শুধু ‘একটা জায়গা’র ঘটনা, নাকি পুরো ব্যবস্থার নিষ্ক্রিয়তা এবং মদদপুষ্ট গোপন অপরাধচক্রের নমুনা? তদন্তে যদি প্রমাণ মেলে—তবে তা হবে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ যৌন সহিংসতা ও নারী হত্যার গণআসামিরা জড়িত একটি অধ্যায়।













