জামায়াতের ৩৪ এমপির মুখে তালা, আখতারুজ্জামান একাই কেন প্রতিবাদী?
- Update Time : ০২:১৩:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ৮৭ Time View

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক লাগেজ, ট্রলি ও জমজমের পানি নিয়ে যাত্রী ভোগান্তির ঘটনা নতুন করে দেশের মানুষের সামনে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে মদিনা থেকে আসা একটি ফ্লাইটে দীর্ঘ সময় লাগেজ ও জমজমের পানি না পাওয়াকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। (BBC)
ঘটনাটির সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র হয়ে উঠেছেন জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়া সাবেক সংসদ সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর আখতারুজ্জামান। বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী ভোগান্তির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি বিমানবন্দর কর্মকর্তাদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, হুমকি এবং নিরাপত্তাকর্মীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে মামলা হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে নেওয়া হলে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। অভিযোগগুলোর বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান। (bdnews24.com)
এখানেই সাধারণ মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিমানবন্দরে যখন এত বড় একটি ভোগান্তির ঘটনা ঘটল, তখন সেখানে উপস্থিত জামায়াতের এতজন সংসদ সদস্যের ভূমিকা কী ছিল?

গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৩৫ জন জামায়াত এমপি থাকার কথা বলা হয়েছে। আবার মামলার নথিতে ৩৪ জনের একটি দল/প্রতিনিধি দলের কথা উল্লেখ রয়েছে। একই ঘটনায় জামায়াতের চারজন এমপি—রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, মোহাম্মদ কামাল হোসেন, সালাহউদ্দীন আইউবী ও জাহাঙ্গীর হুসাইন—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। (Daily Naya Diganta (দৈনিক নয়া দিগন্ত))
অর্থাৎ, পুরোপুরি বলা যাবে না যে জামায়াতের এমপিরা কেউই প্রতিবাদ করেননি। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
দেশের মানুষ কেন সেই প্রতিবাদের দৃশ্যমান নেতৃত্ব দেখল না? কেন একজন সাবেক
কারণ সংসদ সদস্যরা শুধু নিজেদের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। তারা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। বিমানবন্দরে একজন প্রবাসী শ্রমিক, একজন বয়স্ক মানুষ, একজন নারী কিংবা একজন সাধারণ যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগেজের জন্য অপেক্ষা করলে সেই ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাদের দায়িত্বের অংশ।
আর এই জায়গাতেই আখতারুজ্জামানের ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তার প্রতিবাদের ধরন নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। সরকারি কর্মকর্তা বা নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে তার কথাবার্তা এবং আচরণ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, যার সত্যতা তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগটি বাস্তব ছিল। বিমান কর্তৃপক্ষও ঘটনার পর দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। (bdnews24.com)
তাহলে প্রশ্ন হলো—সমস্যা যদি সত্যিই থেকে থাকে, তাহলে সমস্যা সমাধানের জন্য আরও শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক প্রতিবাদ কোথায়?
একজন এমপি যদি প্রতিবাদ করেন, তাকে গ্রেপ্তার করা হলো—এটি নিয়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও প্রকাশ্যে তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি আখতারুজ্জামানকে ভুক্তভোগী যাত্রীদের প্রতিবাদের কণ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বিমানবন্দরের অনিয়ম ও যাত্রী হয়রানির তদন্তের কথা বলেছেন। জামায়াতের পক্ষ থেকেও তার মুক্তির দাবি এবং বিমানবন্দরের ঘটনা তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে। (The Daily Star)
কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন আরও সরল—
৩৫ জন এমপি থাকলে জনগণের সামনে তাদের সম্মিলিত কণ্ঠ কোথায়?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—“এতজন জনপ্রতিনিধি থাকার পর একজন আখতারুজ্জামানকেই কেন সামনে আসতে হলো?”
আরও একটি প্রশ্ন উঠছে—আমরা ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচন করি কেন?
শুধু সংসদে বসার জন্য নয়; জনগণের সমস্যা, ভোগান্তি, দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্যও।
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বিদেশ থেকে দেশে ফিরে বিমানবন্দরে যদি তাদের লাগেজ, ট্রলি, ইমিগ্রেশন কিংবা অন্যান্য সেবায় হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু একটি বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়—এটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িত।
তাই জামায়াতের এমপিদের প্রতি জনগণের প্রশ্ন হওয়া স্বাভাবিক—
আপনারা যদি সেদিন একই সমস্যার ভুক্তভোগী হয়ে থাকেন, তাহলে আরও জোরালোভাবে কেন কথা বললেন না?
চারজন এমপি লিখিত অভিযোগ করেছেন—এটি অবশ্যই একটি পদক্ষেপ। কিন্তু জনগণ জানতে চায়, সেই অভিযোগের অগ্রগতি কী? বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার জন্য কারা দায়ী? কেন যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলো? ভবিষ্যতে একই ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে সংসদে বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে?
জনগণ কোনো রাজনৈতিক দলের এমপির মুখে তালা দেখতে চায় না। তারা চায় সত্যের পক্ষে কথা বলা প্রতিনিধি।
আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদের ভাষা ও আচরণ নিয়ে তদন্ত হোক, অভিযোগের বিচার হোক—কিন্তু একই সঙ্গে বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী হয়রানির অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।
কারণ প্রশ্নটি শুধু আখতারুজ্জামানের নয়।
প্রশ্নটি ৩৫ জন এমপিরও নয়।
প্রশ্নটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের—আমরা যাদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাই, তারা জনগণের ভোগান্তির সময়ে কতটা দৃশ্যমানভাবে জনগণের পাশে দাঁড়ান?
জনগণ এখন উত্তর চায়।









