বিবিসির বিশ্লেষণ জাইমা রহমানকে সামনে আনা বিএনপির কৌশলগত বদল
- Update Time : ০৯:৩৪:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১২২ Time View

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই পারিবারিক উত্তরাধিকারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানকে ঘিরে যে আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা দলটির রাজনৈতিক কৌশলে একটি সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
দলীয় কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও জাইমা রহমানের উপস্থিতি, বক্তব্য এবং সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়তা বিএনপির ভেতরে ও বাইরে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর পরিবারের সঙ্গে দেশে ফেরার পর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন আলোচনা ও কর্মসূচিতে তার নাম উঠে আসছে, যা অনেকের কাছেই একটি পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কৌশল বলে মনে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাইমা রহমানকে সামনে আনার মাধ্যমে বিএনপি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে। তাদের ধারণা, তাকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে দলীয় নেতৃত্বে তার ভূমিকা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তরুণ ও নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই তাকে সামনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ তৈরির কৌশল হিসেবেও বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি আলোচনার দিক হলো, জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপরীতে বিএনপি নারীদের কীভাবে উপস্থাপন করতে চায়। সে বিবেচনায় জাইমা রহমানকে একটি প্রতীকী উপস্থিতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে। যদিও এর আগে নির্বাচনী প্রচারে তারেক রহমানের সঙ্গে মাঝে মাঝে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে দেখা গেছে, এখনো পর্যন্ত জাইমা রহমান সরাসরি কোনো নির্বাচনী মঞ্চে অংশ নেননি।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমানের জন্ম ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায়। ঢাকার বারিধারার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যে ম্যারি মাউন্ট গার্লস স্কুলে অধ্যয়ন করেন এবং কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর তিনি ইনার টেম্পল থেকে বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন।
গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আইন পেশায় কাজ করার আগ্রহের কথা জানান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, আইন পেশার মাধ্যমে মানুষের জীবনের গল্প জানা এবং সেগুলোর আইনগত সমাধান খুঁজে বের করার দায়িত্ব তাকে অনুপ্রাণিত করে।
২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমান মুক্তি পেয়ে পরিবারসহ লন্ডনে চলে যান। দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার আগেই জাইমা রহমান ইউরোপভিত্তিক প্রবাসী ভোটারদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল সভায় অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবেও তাকে দেখা যায়।
দেশে ফেরার আগে নিজের ‘নিজের গল্প’ শীর্ষক লেখায় জাইমা রহমান উল্লেখ করেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি নেপথ্যে থেকে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন এবং দেশে ফিরে বাবাকে সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করতে চান।
ঢাকায় ফেরার পর ১৮ জানুয়ারি ‘উইমেন শেপিং দ্য নেশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন তিনি। এরপর বিএনপির বিভিন্ন আয়োজনে তার উপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব নতুন কিছু নয়। বিএনপির রাজনীতিও দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবারকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। সে কারণেই জাইমা রহমানকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, জাইমা রহমানকে সামনে এনে বিএনপি তরুণ, নারী এবং জেন-জি ভোটারদের কাছে একটি ভিন্ন ও আধুনিক বার্তা পৌঁছাতে চাইছে। একই সঙ্গে ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদের বিপরীতে দলটির অবস্থানও তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত একজন তরুণ নারী হিসেবে তাকে উপস্থাপন করা হলেও ভবিষ্যতে তিনি কতটা সফল রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতে পারবেন, তা নির্ভর করবে সময় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।
















