সময়: শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে একদলীয় শাসন কায়েম করার চেষ্টা করা হচ্ছে: জামায়াত আমির

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:৪৯:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
  • / ৮৩ Time View
নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরে কর্মী সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ও ডা. শফিকুর রহমান সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন যে দেশে ধীরে ধীরে দলীয়করণের মাধ্যমে একদলীয় শাসন কায়েমের চেষ্টা চলছে। তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

শুক্রবার নারায়ণগঞ্জে অনুষ্ঠিত এক কর্মী সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, দেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ PLC-সহ বিভিন্ন ব্যাংকের বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জামায়াত আমির অতীত ইতিহাসের উদাহরণ টেনে বলেন, বাংলাদেশের জনগণ কখনোই একদলীয় শাসন দীর্ঘ সময় মেনে নেয়নি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাকশাল ব্যবস্থার পরিণতি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। তাঁর মতে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে একই ধরনের রাজনৈতিক সংকট আবারও তৈরি হতে পারে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যকার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশে এ ধরনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দল সরকারের সিদ্ধান্ত, নিয়োগ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি কতটুকু এবং তা প্রমাণের জন্য কী ধরনের তথ্য-উপাত্ত রয়েছে।

বাজেট নিয়েও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন জামায়াত প্রধান। তাঁর দাবি, বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করলেই জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত হয় না। যদি দুর্নীতি, অপচয়, ঘুষ ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা না যায়, তাহলে সেই বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের মতো এখনো যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে জনগণের আস্থা অর্জন করা কঠিন হবে।

বিশেষভাবে তিনি রাজনৈতিক চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি জানান। তাঁর ভাষায়, সরকার পরিবর্তন হলেও যদি প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তন না হয়, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রধান উপায়।

জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন বা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের অবদান খাটো করে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির পেছনে আন্দোলনকারী জনগণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

অন্যদিকে সরকারের সমর্থকরা বলছেন, বর্তমান প্রশাসন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘদিনের নানা সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক বিরোধীরা সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপকে দলীয়করণ হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত রয়েছে শক্তিশালী সরকার ও কার্যকর বিরোধী দলের ভারসাম্যের মধ্যে। একদিকে সরকারের দায়িত্ব জনগণের আস্থা রক্ষা করা, অন্যদিকে বিরোধী দলের দায়িত্ব গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শত্রুতায় পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দক্ষতা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই উচিত উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। কারণ বাংলাদেশের জনগণ আর সংঘাত, বিভাজন ও অস্থিতিশীলতা নয়; তারা চায় জবাবদিহিমূলক শাসন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বাংলাদেশে একদলীয় শাসন কায়েম করার চেষ্টা করা হচ্ছে: জামায়াত আমির

Update Time : ০৫:৪৯:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরে কর্মী সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ও ডা. শফিকুর রহমান সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন যে দেশে ধীরে ধীরে দলীয়করণের মাধ্যমে একদলীয় শাসন কায়েমের চেষ্টা চলছে। তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

শুক্রবার নারায়ণগঞ্জে অনুষ্ঠিত এক কর্মী সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, দেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ PLC-সহ বিভিন্ন ব্যাংকের বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জামায়াত আমির অতীত ইতিহাসের উদাহরণ টেনে বলেন, বাংলাদেশের জনগণ কখনোই একদলীয় শাসন দীর্ঘ সময় মেনে নেয়নি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাকশাল ব্যবস্থার পরিণতি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। তাঁর মতে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে একই ধরনের রাজনৈতিক সংকট আবারও তৈরি হতে পারে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যকার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশে এ ধরনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। প্রায় প্রতিটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দল সরকারের সিদ্ধান্ত, নিয়োগ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি কতটুকু এবং তা প্রমাণের জন্য কী ধরনের তথ্য-উপাত্ত রয়েছে।

বাজেট নিয়েও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন জামায়াত প্রধান। তাঁর দাবি, বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করলেই জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত হয় না। যদি দুর্নীতি, অপচয়, ঘুষ ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা না যায়, তাহলে সেই বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের মতো এখনো যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে জনগণের আস্থা অর্জন করা কঠিন হবে।

বিশেষভাবে তিনি রাজনৈতিক চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি জানান। তাঁর ভাষায়, সরকার পরিবর্তন হলেও যদি প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তন না হয়, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাই জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রধান উপায়।

জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন বা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের অবদান খাটো করে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির পেছনে আন্দোলনকারী জনগণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

অন্যদিকে সরকারের সমর্থকরা বলছেন, বর্তমান প্রশাসন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘদিনের নানা সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক বিরোধীরা সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপকে দলীয়করণ হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত রয়েছে শক্তিশালী সরকার ও কার্যকর বিরোধী দলের ভারসাম্যের মধ্যে। একদিকে সরকারের দায়িত্ব জনগণের আস্থা রক্ষা করা, অন্যদিকে বিরোধী দলের দায়িত্ব গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শত্রুতায় পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে দক্ষতা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই উচিত উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। কারণ বাংলাদেশের জনগণ আর সংঘাত, বিভাজন ও অস্থিতিশীলতা নয়; তারা চায় জবাবদিহিমূলক শাসন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।