প্রধানমন্ত্রী বনাম বিরোধী দল: বাজেট বিতর্কের কেন্দ্রে জনগণ
- Update Time : ০৬:১৮:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
- / ৬৩ Time View

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট সবসময়ই রাজনৈতিক বিতর্ক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাজেটকে “জনগণের বাজেট” হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, যারা এটিকে “জনবিরোধী” বা “গণবিরোধী” বলছে, তারা জনগণের প্রকৃত বন্ধু হতে পারে না। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো বলছে, এই বাজেট সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবের পরিবর্তে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সত্য কোথায়? বাজেট কি সত্যিই জনকল্যাণমুখী, নাকি সমালোচকদের আশঙ্কার মধ্যেও বাস্তবতার কিছু অংশ লুকিয়ে আছে?
জাতীয় বাজেট মূলত একটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। সরকার কোথায় ব্যয় করবে, কার জন্য ভর্তুকি দেবে, কোন খাতে বিনিয়োগ করবে এবং রাজস্ব কোথা থেকে সংগ্রহ করবে—এসবের সমন্বিত পরিকল্পনাই বাজেট। তাই কোনো বাজেটকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, কৃষক সহায়তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রতিবন্ধী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর প্রত্যাহার। নিঃসন্দেহে এসব উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে তা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
কিন্তু বাজেটের সমালোচকদের উদ্বেগও একেবারে অমূলক নয়। দেশের অর্থনীতি এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং রাজস্ব ঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বাজারে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ নাভিশ্বাস তুলছে। এমন বাস্তবতায় জনগণ জানতে চায়—বাজেটের ঘোষিত সুবিধাগুলো বাস্তবে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা কমাতে পারবে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো রাজস্ব সংগ্রহ। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। যদি সেই অর্থের বড় অংশ পরোক্ষ কর, ভ্যাট কিংবা মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে আদায় করা হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত এর বোঝা সাধারণ জনগণের কাঁধেই গিয়ে পড়ে। বিরোধীদের মূল আপত্তিও এখানেই। তাদের মতে, সামাজিক কর্মসূচির ঘোষণা যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, যদি বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে সেই সুবিধার বড় অংশ কার্যত বিলীন হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বাস্তবতা হলো—সরকার বাজেটকে জনবান্ধব বলে দাবি করে, আর বিরোধীরা সেটিকে জনবিরোধী বলে সমালোচনা করে। কিন্তু জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা বক্তৃতা নয়, ফলাফল দেখতে চায়। একটি বাজেটের সফলতা নির্ধারিত হয় না সংসদে করতালির মাধ্যমে; বরং নির্ধারিত হয় বাজারে চালের দাম, কৃষকের উৎপাদন খরচ, চাকরিপ্রার্থীর কর্মসংস্থান, রোগীর চিকিৎসা ব্যয় এবং মধ্যবিত্তের জীবনমান দিয়ে।
এ কারণেই বাজেট নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমালোচনা অপরাধ নয়; বরং গঠনমূলক সমালোচনা নীতিনির্ধারণকে আরও শক্তিশালী করে। তবে সমালোচনা যেন তথ্যভিত্তিক হয় এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষের সীমা অতিক্রম না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আজ যারা বাজেটকে “চানাচুরের বাজেট” বলছেন, তাদেরও বিকল্প অর্থনৈতিক রূপরেখা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। একইভাবে সরকারকেও শুধু সমালোচকদের দোষারোপ না করে বাস্তব ফলাফল দেখানোর মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, কোনো বাজেটকে “জনগণের বাজেট” অথবা “জনবিরোধী বাজেট” হিসেবে চূড়ান্তভাবে আখ্যায়িত করার সময় এখনো আসেনি। বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে এর বাস্তবায়ন, বাজার পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হয় তার ওপর। ইতিহাস বলে, বাজেটের সাফল্য নির্ধারণ করে রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং জনগণের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা।


















