এনসিপির নেতৃত্বে ডিসেম্বরে আসছে নতুন রাজনৈতিক জোট: জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘তৃতীয় শক্তি’ গঠনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত
- Update Time : ০৯:১৫:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
- / ১০১ Time View

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিসেম্বর মাসে নতুন এক রাজনৈতিক বলয়ের উত্থান ঘটতে যাচ্ছে। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি–জামায়াতের বাইরে তৃতীয় শক্তি হিসেবে পাঁচটির বেশি দল ও প্ল্যাটফর্ম মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন জোট ঘোষণা করবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। বিজয়ের মাসেই এ জোটের জন্ম ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার ঝড় উঠেছে।
এ জোট কেবল আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক পুনর্গঠন, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং জুলাই সনদ ঘোষণার সময় দেয়া জনগণের প্রত্যাশা পূরণে একটি শক্তিশালী প্রেশার গ্রুপ হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চায়।
নতুন জোটে কারা আসছে?
জোটে অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইতোমধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–র নেতৃত্বে পাঁচটি দল ও প্ল্যাটফর্ম প্রাথমিকভাবে একমত হয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় থাকা দলগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)
- আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি
- রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন
- ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ)
- গণতন্ত্র মঞ্চের অন্তর্ভুক্ত একটি দল (রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন বাদে)
এর সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্যসহ আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। তবে আপাতত পাঁচটি দল ও সংগঠনই মূল কাঠামো গড়ে তুলছে।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ইত্তেফাককে বলেন,
“রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান আছে এমন দলগুলোকে নিয়েই নতুন রাজনৈতিক বলয় গঠনের আলোচনা চলছে। জোটটি সফলভাবে গঠিত হলে দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্র সংস্কার এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কাজ করবে।”
পেছনের গল্প: আগের উদ্যোগ কেন থেমে গিয়েছিল?
গত অক্টোবরে একই ধরনের জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবুও সেই সময় আপ
চলতি মাসের ৫ তারিখে পল্টনে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছয়টি দল—গণঅধিকার পরিষদ, এনসিপি, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, এবি পার্টি এবং গণতন্ত্র মঞ্চের একটি দল—জরুরি বৈঠকে বসে। সেখানে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কেবল আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নয়; বরং জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
জোট ঘোষণা সামনে: আরও দল যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা
গত রবিবার ফেনীতে অনুষ্ঠিত এক সভায় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন,
“অতি দ্রুত নতুন জোট ঘোষণা করা হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যেসব দল সামনে থেকে ভূমিকা রেখেছে, তাদেরকেই অগ্রাধিকার দিয়ে জোটটি গঠন হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, জোটে এনসিপিসহ আরও কয়েকটি দল যুক্ত হচ্ছে এবং শেষ মুহূর্তে আরও কয়েকটি দল যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় ঘোষণায় কিছুটা দেরি হচ্ছে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যেই জোট সম্পর্কে জনগণের সামনে স্পষ্ট ঘোষণা দেয়া হবে।
নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,
“জোটের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সুদূরপ্রসারী। তবে আসন্ন নির্বাচনেও এ জোট একতাবদ্ধ থাকবে—এটাই আমাদের মূল অভিপ্রায়।”
জুলাই সনদের শক্তি: কেন এত গুরুত্ব পাচ্ছে?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের দাবির ভিত্তিতে যে সনদ প্রস্তাব করা হয়, তাতে—
- ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
- দুর্নীতি দমন কমিশনের পুনর্গঠন
- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের জবাবদিহিতা
- নিরাপত্তা বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কার
- মানবাধিকার নিশ্চয়তা
ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে নতুন রাষ্ট্রপরিকল্পনার রূপরেখা দেওয়া হয়। নতুন জোটের দলগুলো বিশ্বাস করে, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নই পারে একটি কার্যকর পথনির্দেশ দিতে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘তৃতীয় শক্তি’—সম্ভাবনা নাকি নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা?
নতুন জোটের ঘোষণা সামনে রেখে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বহুদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় একটি শক্তির অভাব ছিল। বিএনপি–জামায়াত ও আওয়ামী লীগ–মহাজোটের বাইরে বিকল্প কোনো বলয় না থাকায় রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। এবার জুলাই আন্দোলনের তরুণদের নেতৃত্ব এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তৃতীয় শক্তিকে দৃশ্যমান করতে পারে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়—
- দলের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য
- আদর্শিক অবস্থান নির্দিষ্ট করা
- মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্ব তৈরি
- জনগণের আস্থা অর্জন
- নির্বাচনী লড়াইয়ের বাস্তবতা
এসবই জোটকে মোকাবিলা করতে হবে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে এনসিপির নেতৃত্বে ডিসেম্বরে নতুন রাজনৈতিক জোট ঘোষণার প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে তৃতীয় শক্তির এই উদ্যোগ আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
















