সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন হত্যা: দুই পেশাদার শুটার রুবেল ও ইব্রাহিম গ্রেপ্তার

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:১৭:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১৭৪ Time View

পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত দুই পেশাদার শুটারকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রুবেল ও ইব্রাহিম। তারা দুজনই দীর্ঘদিন ধরে ভাড়াটে শুটার হিসেবে কাজ করছিলেন এবং মামুন হত্যার পর সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন।

গোয়েন্দা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করে জানান, মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে রুবেল ও ইব্রাহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বলেন, “তারা হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের সীমান্তে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে ডিবির একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে।”

এর আগে সোমবার (১০ নভেম্বর) দুপুরে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তারিক সাইফ মামুন নামের এক ব্যক্তিকে। হত্যাকাণ্ডটি ঘটে দিনের আলোয়, জনাকীর্ণ এলাকায়, যখন মামুন আদালতে হাজিরা দিয়ে আফতাবনগরের বাসায় ফেরার পথে ছিলেন।

স্বজনরা জানিয়েছেন, মামুন পুরনো একটি মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার পর রাস্তার পাশে নিজের গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা দুই অস্ত্রধারী তার ওপর গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশের তথ্যমতে, নিহত তারিক সাইফ মামুন ছিলেন ‘ইমন-মামুন’ গ্রুপের অন্যতম প্রধান সদস্য এবং তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। একসময় তিনি ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগী ছিলেন। তবে অপরাধ জগতের প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ইমন ও মামুনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান সামী বলেন, “নিহত মামুন হচ্ছেন সেই কুখ্যাত ইমন-মামুন গ্রুপের মামুন। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলার রেকর্ড রয়েছে।”

ভয়াবহ

সিসিটিভি ফুটেজ প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা

প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিওচিত্র এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে মামুন দ্রুত দৌড়ে ন্যাশনাল হাসপাতালের গেটের ভেতরে প্রবেশ করছেন। তার পিছু পিছু দুই অস্ত্রধারী গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসছে। তারা মাত্র তিন-চার সেকেন্ডের মধ্যে কাছ থেকে গুলি ছুড়ে হত্যা মিশন সম্পন্ন করে।

দুজনের মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক ছিল। একজনের পরনে ছিল হাফহাতা জামা, অন্যজনের ফুলহাতা শার্ট। গুলি ছোড়ার পর তারা অস্ত্র কোমরে গুঁজে হাসপাতালের গেটের বাঁ দিকের রাস্তা ধরে পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলাকারীরা একটি মোটরসাইকেলে এসেছিল এবং গুলি চালানোর পর সেটিতে করেই দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।

এক প্রত্যক্ষদর্শীর ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ মামুন হাসপাতালে গেটের ভেতরে মাটিতে পড়ে আছেন, পাশে পড়ে আছে তার স্যান্ডেল ও সানগ্লাস। আশপাশের মানুষ আতঙ্কে ছুটোছুটি করছেন। এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলছেন, “এই ডাক্তার ডাকেন, তাড়াতাড়ি ডাক্তার নিয়ে আসেন!”

ন্যাশনাল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একটি সূত্র জানায়, মামুনকে ট্রলিতে করে আনার পর চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখেন, তিনি ইতোমধ্যেই মারা গেছেন। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. ফারুক বলেন, “দুপুর ১২টার পর গুলিবিদ্ধ মামুনকে মৃত অবস্থায় ঢামেকে আনা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য তার মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে।”

জনমনে উদ্বেগ আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন

দিনদুপুরে ব্যস্ত এলাকায় প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ করে হত্যা করায় জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, নিহত ব্যক্তি যেই হোন না কেন, এমন ফিল্মি কায়দায় খুনের ঘটনা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, মামলার অগ্রগতি দ্রুত হচ্ছে এবং গ্রেপ্তার দুই শুটারকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী ও গোষ্ঠীকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তারা আশা করছে, পুরো নেটওয়ার্ক শিগগিরই চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন হত্যা: দুই পেশাদার শুটার রুবেল ও ইব্রাহিম গ্রেপ্তার

Update Time : ১০:১৭:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫

পুরান ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত দুই পেশাদার শুটারকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রুবেল ও ইব্রাহিম। তারা দুজনই দীর্ঘদিন ধরে ভাড়াটে শুটার হিসেবে কাজ করছিলেন এবং মামুন হত্যার পর সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন।

গোয়েন্দা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করে জানান, মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে রুবেল ও ইব্রাহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বলেন, “তারা হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের সীমান্তে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে ডিবির একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে।”

এর আগে সোমবার (১০ নভেম্বর) দুপুরে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তারিক সাইফ মামুন নামের এক ব্যক্তিকে। হত্যাকাণ্ডটি ঘটে দিনের আলোয়, জনাকীর্ণ এলাকায়, যখন মামুন আদালতে হাজিরা দিয়ে আফতাবনগরের বাসায় ফেরার পথে ছিলেন।

স্বজনরা জানিয়েছেন, মামুন পুরনো একটি মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার পর রাস্তার পাশে নিজের গাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা দুই অস্ত্রধারী তার ওপর গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশের তথ্যমতে, নিহত তারিক সাইফ মামুন ছিলেন ‘ইমন-মামুন’ গ্রুপের অন্যতম প্রধান সদস্য এবং তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। একসময় তিনি ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগী ছিলেন। তবে অপরাধ জগতের প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ইমন ও মামুনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান সামী বলেন, “নিহত মামুন হচ্ছেন সেই কুখ্যাত ইমন-মামুন গ্রুপের মামুন। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলার রেকর্ড রয়েছে।”

ভয়াবহ সিসিটিভি ফুটেজ প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা

প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিওচিত্র এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে মামুন দ্রুত দৌড়ে ন্যাশনাল হাসপাতালের গেটের ভেতরে প্রবেশ করছেন। তার পিছু পিছু দুই অস্ত্রধারী গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসছে। তারা মাত্র তিন-চার সেকেন্ডের মধ্যে কাছ থেকে গুলি ছুড়ে হত্যা মিশন সম্পন্ন করে।

দুজনের মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক ছিল। একজনের পরনে ছিল হাফহাতা জামা, অন্যজনের ফুলহাতা শার্ট। গুলি ছোড়ার পর তারা অস্ত্র কোমরে গুঁজে হাসপাতালের গেটের বাঁ দিকের রাস্তা ধরে পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলাকারীরা একটি মোটরসাইকেলে এসেছিল এবং গুলি চালানোর পর সেটিতে করেই দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।

এক প্রত্যক্ষদর্শীর ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ মামুন হাসপাতালে গেটের ভেতরে মাটিতে পড়ে আছেন, পাশে পড়ে আছে তার স্যান্ডেল ও সানগ্লাস। আশপাশের মানুষ আতঙ্কে ছুটোছুটি করছেন। এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলছেন, “এই ডাক্তার ডাকেন, তাড়াতাড়ি ডাক্তার নিয়ে আসেন!”

ন্যাশনাল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একটি সূত্র জানায়, মামুনকে ট্রলিতে করে আনার পর চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখেন, তিনি ইতোমধ্যেই মারা গেছেন। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. ফারুক বলেন, “দুপুর ১২টার পর গুলিবিদ্ধ মামুনকে মৃত অবস্থায় ঢামেকে আনা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য তার মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে।”

জনমনে উদ্বেগ আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন

দিনদুপুরে ব্যস্ত এলাকায় প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণ করে হত্যা করায় জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, নিহত ব্যক্তি যেই হোন না কেন, এমন ফিল্মি কায়দায় খুনের ঘটনা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, মামলার অগ্রগতি দ্রুত হচ্ছে এবং গ্রেপ্তার দুই শুটারকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী ও গোষ্ঠীকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তারা আশা করছে, পুরো নেটওয়ার্ক শিগগিরই চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।