পটপরিবর্তনেও বহাল তবিয়তে আওয়ামী আমলের ওসিরা
- Update Time : ০৬:৫২:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
- / ১৫৯ Time View

পটপরিবর্তনেও বহাল তবিয়তে আওয়ামী আমলের ওসিরা
তদন্তে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শুরু, প্রশাসনের ভেতরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া বহু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এখনও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পরও তাদের অনেককেই শুধু এক থানার পরিবর্তে অন্য থানায় স্থানান্তর করা হয়েছে— কার্যত “পরিবর্তনের নামে পুনর্বিন্যাস” বলেই অনেকে দেখছেন। এমনকি রাজধানীর বাইরে থেকে কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকেও এনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায় নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
পুরনোদের প্রভাব, নতুনদের অপেক্ষা
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের সময় ওসি পদে দায়িত্ব না পাওয়া বহু পুলিশ পরিদর্শক এখনও সেই পদে পদায়নের অপেক্ষায় আছেন। অথচ আওয়ামী আমলের পুরনো ওসিরা একের পর এক থানায় রদবদল হয়ে দায়িত্বে বহাল থাকায় প্রশাসনের ভেতরে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
ডিএমপির অন্তর্গত বেশ কয়েকটি থানায় ওসি বদলের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান। প্রাথমিক তালিকায় কদমতলী, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, আদাবর, সবুজবাগ, ওয়ারী, তুরাগ, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল, মিরপুর ও তেজগাঁও থানার নাম রয়েছে। এরই মধ্যে অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তরা পশ্চিম, উত্তরা পূর্ব, কলাবাগান ও পল্লবী থানার ওসিদের বদলি করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ব্যাখ্যা
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন,
“২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে যারা ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, আমরা তাদের শনাক্ত করছি। সবাইকে একসঙ্গে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। প্রথমে দেখা হচ্ছে, কে তিনটি নির্বাচনে দায়িত্বে ছিলেন, কে দুটি, আর কে একটি নির্বাচনে ছিলেন— সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন,
“সবাইকে বাদ দিয়ে নতুনদের আনা বাস্তবসম্মত নয়। কেউ যদি একটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেও কোনো অনিয়ম বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগের মুখোমুখি না হন, তবে তাকে দায়িত্বে রাখা যেতে পারে।”
ডিএমপির অবস্থান
ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেন,
“ফ্যাসিবাদ আমলে দায়িত্বে থাকা কোনো ওসি বর্তমানে ডিএমপিতে আছেন কি না, বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব। যাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাত, অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের কাউকেই রাখা হবে না।”
বিতর্কিত পদায়ন ও প্রভাবশালী ওসিরা
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বহু ওসি গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে রাজধানীতে স্থান পেয়েছেন।
- কদমতলীর ওসি মোহাম্মদ আইয়ুব পূর্বে কুমিল্লার লালমাই ও নাঙ্গলকোট থানায় দায়িত্বে ছিলেন।
- ডেমরার ওসি মাহমুদুর রহমান এর আগে চুয়াডাঙ্গা ও ভোলায় কর্মরত ছিলেন।
- যাত্রাবাড়ীর ওসি কামরুজ্জামান কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের একাধিক থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
- কামরাঙ্গীরচরের ওসি আমিনুল ইসলাম–এর বিরুদ্ধে একাধিক সম্পত্তি মালিকানার অভিযোগ রয়েছে।
- তুরাগের ওসি মনিরুল ইসলাম, আদাবরের এসএম জাকারিয়া, সবুজবাগের মো. ইয়াছিন, মিরপুরের সাজ্জাদ রোমান এবং মোহাম্মদপুরের রফিক আহমেদ— এঁরাও পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্বে ছিলেন।
প্রশাসনে অসন্তোষ ও ভেতরকার টানাপোড়েন
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে ওসি পদে দায়িত্ব না পেয়ে বহু যোগ্য পরিদর্শক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের ভেতরেও বিভাজন ও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। অনেকে অভিযোগ করছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন হওয়ায় যোগ্য কর্মকর্তারা বারবার বঞ্চিত হচ্ছেন।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মো. সরওয়ার জানান,
“আগের সরকারের আমলে দায়িত্বে থাকা ওসিদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের অপসারণ করা হবে। ভবিষ্যতে যোগ্য কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপট
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের জন্য রাজনৈতিক আমলে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্বিন্যাস অপরিহার্য। ওসিদের পদে দীর্ঘদিন একই ব্যক্তিদের বহাল থাকা শুধু পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসনের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে না, বরং নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও জনআস্থার জন্যও তা বিপজ্জনক।
তারা মনে করেন, সরকারের উচিত হবে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়ায় থানাভিত্তিক ওসিদের পুনর্বিন্যাস করা এবং যারা দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছেন, তাদের বদলি করা। তবেই মাঠ প্রশাসনে নতুন আস্থা ও নিরপেক্ষতা ফিরে আসবে।










