জুলাই সনদ বাস্তবায়ন: গণভোটের আদেশ মধ্য নভেম্বরে জারির প্রস্তুতি
- Update Time : ১০:৫৮:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৩৫ Time View

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন: গণভোটের আদেশ মধ্য নভেম্বরে জারির প্রস্তুতি
বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা
চলতি মাসের মাঝামাঝি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ জারি করার প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত খসড়া আদেশ এখন চূড়ান্ত করার পর্যায়ে রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে সরকারই আদেশের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করবে— এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন একাধিক উপদেষ্টা।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে খসড়া আদেশটি উপস্থাপন করা হতে পারে। গণভোটের সময়সূচি ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজে।
উপদেষ্টাদের বিশেষ দায়িত্ব বণ্টন
যমুনা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। তাঁদের ওপর খসড়া আদেশটি চূড়ান্ত করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
গত সোমবার অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সাত দিনের মধ্যে সরকারকে মতামত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে আজ রোববার। এখন পর্যন্ত কোনো ঐক্যমত্য না আসায় সরকার নিজেই পরবর্তী সিদ্ধান্তের পথে অগ্রসর হচ্ছে।
উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, “সমঝোতার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে দলগুলো যদি একমত না হয়, সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে। সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত।”
১৩ নভেম্বরের বৈঠকে আসছে চূড়ান্ত খসড়া
সূত্র জানায়, আগামী ১৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়া উত্থাপিত হতে পারে। এর আগে কোনো বিশেষ বা জরুরি বৈঠকের সম্ভাবনা নেই।
গত ৩০ অক্টোবরের বৈঠকে অধিকাংশ উপদেষ্টা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আগামী ফেব্রুয়ারির
এ বিষয়ে ফাওজুল কবির খান বলেন, “গণভোটের সময় ও পদ্ধতি নির্ধারণ করবেন প্রধান উপদেষ্টা। তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।”
রাজনৈতিক সমঝোতার লক্ষণ ক্ষীণ
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত ২৮ অক্টোবর সরকারকে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ জারির মাধ্যমে গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করে। তবে সুপারিশে কোথাও স্পষ্ট করা হয়নি, আদেশ কে জারি করবে এবং গণভোট কবে হবে— এই দুই সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে বলা হয়েছে।
কমিশনের খসড়া অনুযায়ী, গণভোটে অনুমোদিত হলে সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ শেষ করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে, অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি সংবিধান সংশোধনী বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস বলে গণ্য হবে।
দ্বিতীয় খসড়ায় বলা হয়, গণভোট অনুষ্ঠিত হবে আদেশ এবং সংবিধান সংস্কারের তপশিলে অন্তর্ভুক্ত ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর। এর মধ্যে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনর্বিন্যাস, এবং বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা জোরদার— এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে।
বিএনপি বনাম জামায়াত-এনসিপি: অবস্থান দুই মেরুতে
বিএনপি মনে করে, গণভোট হওয়া উচিত প্রজ্ঞাপন আকারে, এবং তাতে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। তাদের মতে, যে দল কোনো প্রস্তাবে ভিন্নমত দিয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে সেই অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করতে পারবে। বিএনপি আরও চায়, গণভোট নির্বাচনসঙ্গে এক দিনেই অনুষ্ঠিত হোক।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নোট অব ডিসেন্টমুক্ত গণভোটের পক্ষে। তাদের মতে, ভিন্নমত থাকলে সনদের ঐক্য নষ্ট হবে। এই দুই দলসহ আরও আটটি দল নির্বাচনের আগে গণভোট চেয়ে আন্দোলনে নেমেছে।
তবে গত ছয় দিনেও রাজনৈতিক সংলাপ বা সমঝোতার কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “প্রধান উপদেষ্টা ডাকলে আমরা আলোচনায় যাব, অন্য কারও আহ্বানে নয়।”
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানান, “বিএনপিকে আলোচনায় ডাকলেও তারা সাড়া দেয়নি।”
এনসিপিসহ নয় দলের মধ্যস্থতা এবং উপদেষ্টাদের সরাসরি যোগাযোগ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, “আর কোনো আলোচনা ডাকা হবে না। নির্বাচনী প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে।”
গণভোট ও আদেশ নিয়ে নতুন বিতর্ক
২০১১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাতিল করে। তবে গত বছরের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট গণভোট-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়।
বিএনপি ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় গণভোটে সম্মতি দিলেও, তাদের নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “বর্তমান সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান নেই। এটি সংসদে পাস করে সংবিধানে যুক্ত করার পরই গণভোট হতে পারে।”
অন্যদিকে, জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, “যদি বিধান না থাকত, তবে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ও ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া কীভাবে গণভোট করলেন? নভেম্বরে নির্বাচনের আগে গণভোটই হতে হবে।”
জামায়াত ও এনসিপি দাবি তুলেছে, আদেশটি জারি করতে হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার মাধ্যমে, আওয়ামী লীগ-মনোনীত রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নয়।
ইতিহাসের দৃষ্টান্ত টেনে সরকারপক্ষ জানায়, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ও পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান একাধিক আদেশ জারি করেন। ফলে বর্তমান আদেশও রাষ্ট্রপতির মাধ্যমেই জারি করা হবে, তবে তা গণঅভ্যুত্থানের ক্ষমতাবলে আইনানুগভাবে হবে।
জুলাই সনদে সংস্কার প্রস্তাব ৮৪টি, বিএনপির ভিন্নমত ১৫টিতে
গত ১৭ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা যে জুলাই সনদে সই করেছেন, তাতে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট আছে।
এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি,
- সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনে অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতি,
- প্রশাসনিক পুনর্গঠন,
- এবং বিচার বিভাগের পুনর্নির্মাণ।
জামায়াত ও এনসিপির আশঙ্কা, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এই নোট অব ডিসেন্ট ব্যবহার করে নিজেদের মতো করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের চেষ্টা করবে। এজন্য তারা বলছে, গণভোটে
সবশেষে বলা যায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে মধ্য নভেম্বরে আদেশ জারি ও গণভোট আয়োজনের, তবে রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের কোনো লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়। বিএনপি ও জামায়াতের ভিন্ন অবস্থান, আইনগত জটিলতা, এবং নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে সামনে এক জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায় অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য।










