ই-মানি ইস্যু করতে পারবে ব্যাংক-বহির্ভূত প্রতিষ্ঠান: বাংলাদেশ ব্যাংকের খসড়া প্রবিধান প্রকাশ
- Update Time : ০৭:৩০:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৭৭ Time View

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও আর্থিক খাতে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি ‘রেগুলেশনস ফর ই-মানি ইস্যুয়ারস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি খসড়া প্রবিধান প্রকাশ করেছে, যা ব্যাংক-বহির্ভূত দেশি ও বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও ই-মানি ইস্যু করার সুযোগ দেবে। খসড়াটি বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে জনমতের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
এই নতুন কাঠামো কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ব্যাংক-নির্ভর মোবাইল ও অনলাইন আর্থিক সেবা পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটবে। এখন থেকে ব্যাংক ও স্বাধীন ডিজিটাল ফিন্যান্স কোম্পানি— উভয়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে ই-মানি ইস্যু করতে পারবে।
বিদ্যমান অপারেটরদের নতুন লাইসেন্স নিতে হবে
খসড়া প্রবিধানে বলা হয়েছে, বিদ্যমান মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (PSP) অপারেটরদের — তারা ব্যাংক-নির্ভর হোক বা না হোক — এই প্রবিধান কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে।
বর্তমানে দেশে বিকাশ, রকেট, নগদ, টালি-পে, পাঠাও-পে ও সেবা পে’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ই-মানি সেবা পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠান মোবাইল ও অনলাইন লেনদেনের মাধ্যমে ভার্চুয়াল অর্থ তৈরি ও স্থানান্তর করে থাকে।
নীতিমালার লক্ষ্য: নিরাপত্তা ও গ্রাহক সুরক্ষা
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই খসড়া প্রবিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো ই-মানি খাতে গ্রাহক সুরক্ষা, আর্থিক স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে, এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল ফিন্যান্স খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খসড়া অনুযায়ী, নতুন কাঠামো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ এবং ই-মানির নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
দুই ধরণের ই-মানি ইস্যুকারী
প্রবিধানে দুই ধরনের ই-মানি ইস্যুকারীর কথা বলা হয়েছে—
- অনুমোদিত ইএমআই (Authorized EMI): ব্যাংক বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যারা ই-মানি ইস্যু করতে পারবে।
- ডেডিকেটেড ইএমআই (Dedicated EMI): ব্যাংক-বহির্ভূত সত্তা, যারা শুধুমাত্র ই-মানি ও সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট সেবা পরিচালনা করবে।
মূলধন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো
আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর, বিশেষ করে ডেডিকেটেড ইএমআইদের ন্যূনতম ৫০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকতে হবে। তাদের তিন বছরের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। পাশাপাশি, গ্রাহকের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে ‘ট্রাস্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট’ স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ও সুশাসনের কঠোর নির্দেশনা
ই-মানি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো, বিশ্বস্ত প্রযুক্তি ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া বজায় রাখতে হবে। বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, জালিয়াতি শনাক্তকরণ, সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে বোর্ড অডিট কমিটি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে, যাতে নিয়মিত অভ্যন্তরীণ তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
শাস্তির বিধান
প্রবিধান লঙ্ঘন করলে ন্যূনতম ৫০ লাখ টাকা জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল, এমনকি দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা পর্যন্ত হতে পারে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানে ডিজিটাল ফিন্যান্স কাঠামো
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই প্রবিধান বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ডিজিটাল ফিন্যান্স খাত চীন, ভারত ও মালয়েশিয়ার মতো দেশের ই-মানি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
চূড়ান্ত প্রবিধান জারির আগে অংশীজনদের লিখিত মতামত ও প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের আর্থিক খাত আরও উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও উদ্ভাবননির্ভর হবে—যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।











