সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাপের কামড়ে অ্যান্টিভেনম সব উপজেলায় নিশ্চিত করা হবে

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:৪৪:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫
  • / ১৫২ Time View

বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে জীবনহানির ঝুঁকিতে পড়েন। এই গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যার গুরুত্ব বিবেচনা করে দেশের সব উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম বা সাপের বিষনাশক ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর।

সম্প্রতি হাইকোর্টের বিচারপতি ফাহমিদা কাদেরের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি উপজেলা সদরেই যেন অন্তত দুটি অনুমোদিত ফার্মেসিতে অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায়—সে বিষয়ে সিভিল সার্জনদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সাপের কামড়ের পর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবা পাওয়া সহজ হবে এবং অযথা জীবনহানি রোধ করা সম্ভব হবে।

রিট আবেদনকারী অ্যাডভোকেট মীর এ কে এম নূরুন্নবী শনিবার সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ১৭ আগস্ট হাইকোর্ট উপজেলা পর্যায়ে অ্যান্টিভেনম সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছিল। সেই রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর এই নির্দেশ জারি করেছে। ওই আদেশে স্বাস্থ্য সচিব, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলা হয়।

রিটের প্রাথমিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয় গত ১৮ আগস্ট, যেখানে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুর অংশ নেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মীর এ কে এম নূরুন্নবী এবং সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট ইসমাঈল হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শফিকুর রহমান ও তানিম খান, এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ইকরামুল কবির।

এর আগে অ্যাডভোকেট নূরুন্নবী হাইকোর্টে এই রিট দাখিল করেন, যেখানে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে দেশে সাপের কামড়ে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬১০ জন দংশনের শিকার হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন জানান, শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৪১৬ জন সাপের দংশনে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৯১টি বিষধর সাপের দংশন এবং ১৮টি চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) সাপের কামড়। এই দংশনের ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫ জন চন্দ্রবোড়ার কামড়ে প্রাণ হারান।

স্বাস্থ্য অধিদফতর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাসেলস ভাইপার নিয়ে নানা গুজব ও ভয়ভীতির সৃষ্টি হয়েছে, যা জনমনে অযথা আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। বাস্তবে সাপদংশন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

২০২২ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশে প্রায় চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন, যার মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। বিষধর সাপগুলোর মধ্যে গোখরা, কালাচ (ক্রেইট), চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) ও সবুজ সাপ অন্যতম। এছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলে কিছু সামুদ্রিক সাপের কামড়ের ঘটনাও ঘটে থাকে।

চন্দ্রবোড়া সাপটি ভাইপারিড পরিবারভুক্ত একটি অত্যন্ত বিষধর প্রজাতি। ১৯২০ সালের দিকে থেকেই বাংলাদেশের রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলে এর উপস্থিতি ও কামড়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ২০১৩ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে চন্দ্রবোড়ার কামড়ের প্রথম আধুনিক চিকিৎসা রেকর্ড লিপিবদ্ধ হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সাপের বিস্তার দেশের ২৭টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

ডা. রোবেদ আমিন বলেন, বিষধর সাপের কামড়ে একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা হলো অ্যান্টিভেনম। এই ওষুধ সাধারণত ঘোড়ার শরীরে সাপের বিষ প্রয়োগ করে তার রক্ত থেকে প্রস্তুত করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন করা হয় না; বরং ভারত থেকে আমদানি করা হয়। সেখানে দেশের চারটি প্রধান বিষধর সাপের (গোখরা, কালাচ, চন্দ্রবোড়া ও সবুজ সাপ) বিষ দিয়ে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর সেই অ্যান্টিভেনম সংগ্রহ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করে থাকে। যদিও অ্যান্টিভেনমের ক্রয়, সংরক্ষণ, বিতরণ এবং প্রয়োগ পরবর্তী পর্যবেক্ষণের বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি, তবুও এর কার্যকারিতা ও সুফল স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উপজেলা পর্যায়ে অ্যান্টিভেনমের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে উপকৃত হবে। বর্তমানে সাপের কামড়ের পর অনেক রোগী সময়মতো অ্যান্টিভেনম না পাওয়ায় বড় শহরে নিয়ে যেতে হয়, ফলে বিলম্বে মৃত্যু ঘটে। তাই সরকারের এই উদ্যোগকে তাঁরা একটি ‘জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিভেনম সরবরাহের পাশাপাশি সাপদংশন বিষয়ে গ্রামীণ জনগণকে সচেতন করা, প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং হাসপাতালে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই বাংলাদেশে সাপদংশনে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাপের কামড়ে অ্যান্টিভেনম সব উপজেলায় নিশ্চিত করা হবে

Update Time : ০২:৪৪:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে জীবনহানির ঝুঁকিতে পড়েন। এই গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যার গুরুত্ব বিবেচনা করে দেশের সব উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম বা সাপের বিষনাশক ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর।

সম্প্রতি হাইকোর্টের বিচারপতি ফাহমিদা কাদেরের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিটি উপজেলা সদরেই যেন অন্তত দুটি অনুমোদিত ফার্মেসিতে অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায়—সে বিষয়ে সিভিল সার্জনদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সাপের কামড়ের পর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবা পাওয়া সহজ হবে এবং অযথা জীবনহানি রোধ করা সম্ভব হবে।

রিট আবেদনকারী অ্যাডভোকেট মীর এ কে এম নূরুন্নবী শনিবার সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ১৭ আগস্ট হাইকোর্ট উপজেলা পর্যায়ে অ্যান্টিভেনম সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছিল। সেই রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর এই নির্দেশ জারি করেছে। ওই আদেশে স্বাস্থ্য সচিব, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলা হয়।

রিটের প্রাথমিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয় গত ১৮ আগস্ট, যেখানে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুর অংশ নেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মীর এ কে এম নূরুন্নবী এবং সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট ইসমাঈল হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শফিকুর রহমান ও তানিম খান, এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ইকরামুল কবির।

এর আগে অ্যাডভোকেট নূরুন্নবী হাইকোর্টে এই রিট দাখিল করেন, যেখানে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে দেশে সাপের কামড়ে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৬১০ জন দংশনের শিকার হয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন জানান, শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৪১৬ জন সাপের দংশনে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৯১টি বিষধর সাপের দংশন এবং ১৮টি চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) সাপের কামড়। এই দংশনের ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫ জন চন্দ্রবোড়ার কামড়ে প্রাণ হারান।

স্বাস্থ্য অধিদফতর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাসেলস ভাইপার নিয়ে নানা গুজব ও ভয়ভীতির সৃষ্টি হয়েছে, যা জনমনে অযথা আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। বাস্তবে সাপদংশন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

২০২২ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশে প্রায় চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন, যার মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। বিষধর সাপগুলোর মধ্যে গোখরা, কালাচ (ক্রেইট), চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) ও সবুজ সাপ অন্যতম। এছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলে কিছু সামুদ্রিক সাপের কামড়ের ঘটনাও ঘটে থাকে।

চন্দ্রবোড়া সাপটি ভাইপারিড পরিবারভুক্ত একটি অত্যন্ত বিষধর প্রজাতি। ১৯২০ সালের দিকে থেকেই বাংলাদেশের রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলে এর উপস্থিতি ও কামড়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ২০১৩ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে চন্দ্রবোড়ার কামড়ের প্রথম আধুনিক চিকিৎসা রেকর্ড লিপিবদ্ধ হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সাপের বিস্তার দেশের ২৭টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

ডা. রোবেদ আমিন বলেন, বিষধর সাপের কামড়ে একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা হলো অ্যান্টিভেনম। এই ওষুধ সাধারণত ঘোড়ার শরীরে সাপের বিষ প্রয়োগ করে তার রক্ত থেকে প্রস্তুত করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন করা হয় না; বরং ভারত থেকে আমদানি করা হয়। সেখানে দেশের চারটি প্রধান বিষধর সাপের (গোখরা, কালাচ, চন্দ্রবোড়া ও সবুজ সাপ) বিষ দিয়ে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর সেই অ্যান্টিভেনম সংগ্রহ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করে থাকে। যদিও অ্যান্টিভেনমের ক্রয়, সংরক্ষণ, বিতরণ এবং প্রয়োগ পরবর্তী পর্যবেক্ষণের বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি, তবুও এর কার্যকারিতা ও সুফল স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উপজেলা পর্যায়ে অ্যান্টিভেনমের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে উপকৃত হবে। বর্তমানে সাপের কামড়ের পর অনেক রোগী সময়মতো অ্যান্টিভেনম না পাওয়ায় বড় শহরে নিয়ে যেতে হয়, ফলে বিলম্বে মৃত্যু ঘটে। তাই সরকারের এই উদ্যোগকে তাঁরা একটি ‘জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিভেনম সরবরাহের পাশাপাশি সাপদংশন বিষয়ে গ্রামীণ জনগণকে সচেতন করা, প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং হাসপাতালে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই বাংলাদেশে সাপদংশনে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।