ইসরায়েলের স্পর্শকাতর ভিডিও ফাঁস: মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তোলপাড় মধ্যপ্রাচ্য
- Update Time : ১০:০২:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫
- / ২৯৫ Time View

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবারও তীব্র আলোড়ন তুলেছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর এক ভয়াবহ কেলেঙ্কারি। সম্প্রতি একটি স্পর্শকাতর ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসতেই তাতে দেখা যায়, ইসরায়েলি সেনারা এক নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি বন্দিকে নির্মমভাবে নির্যাতন ও ধর্ষণ করছে। এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষোভের ঝড় উঠলেও ইসরায়েলের অভ্যন্তরে মূল বিতর্ক ঘুরে গেছে ভিডিওটি ফাঁস করার ব্যক্তি— দেশটির শীর্ষ সামরিক আইনজীবী মেজর জেনারেল ইয়িফাত টোমের-ইয়েরুশালমি—কে কেন্দ্র করে।
ভয়াবহ ঘটনার পটভূমি
২০২৪ সালের ৫ জুলাই, দক্ষিণ ইসরায়েলের সামরিক আটক কেন্দ্র স্দে তেইমান-এ ঘটে এই নৃশংস ঘটনা। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা মিলে একজন ফিলিস্তিনি বন্দিকে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি যৌনভাবে লাঞ্ছিত করছে। তদন্ত সূত্রে জানা যায়, নির্যাতনের পর ওই বন্দির শরীরে ছিন্নভিন্ন অন্ত্র, ফুসফুসে গুরুতর আঘাত ও একাধিক পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়। পরে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এই ভয়াবহ ঘটনার ভিডিওটি সম্প্রতি ফাঁস করেন মেজর জেনারেল ইয়িফাত টোমের-ইয়েরুশালমি, যিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান সামরিক আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেন যে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং মানবিক বিবেকের তাড়নায় তিনি ফুটেজটি ফাঁস করেছেন।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া
তবে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে তুমুল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ভিডিও ফাঁসকে “ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ জনসংযোগ বিপর্যয়” বলে আখ্যা দেন। তার ঘনিষ্ঠ মহল এবং ডানপন্থী সমর্থকরা টোমেরকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে অভিযুক্ত করেন এবং তার বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালান।
অন্যদিকে, দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ভিডিও ফাঁসের ঘটনাকে “রাষ্ট্রবিরোধী অপবাদমূলক কর্মকাণ্ড” বলে মন্তব্য করেন। ফলে ধর্ষণ ও নির্যাতনের মূল অপরাধ আড়ালে চলে যায়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে টোমেরের কর্মকাণ্ড।
রহস্যময় পদত্যাগ ও নিখোঁজ হওয়া
ভিডিও ফাঁসের পর টোমের-ইয়েরুশালমি ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর পদত্যাগ করেন এবং পরবর্তীতে নিখোঁজ হন। কয়েক ঘণ্টা পর একটি সন্দেহভাজন আত্মহত্যার নোট উদ্ধার করে পুলিশ তাকে খুঁজে বের করে। কিন্তু ঘটনাটিকে আত্মহত্যার প্রচেষ্টা হিসেবে না দেখে কর্তৃপক্ষ উল্টো তার বিরুদ্ধে মামলা করে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে। এতে অনেকেই ধারণা করছেন, ইসরায়েল সরকার ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ধর্ষণ মামলার তদন্ত এখন আড়ালে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— যে ভয়াবহ অপরাধের কারণে এই ভিডিও ফাঁস হয়েছিল, সেই ধর্ষণের তদন্তই এখন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অভিযুক্ত পাঁচ সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলেও, তাদের আদালতে হাজির করা হয় মুখ ঢেকে। তারা নিজেদের “দেশপ্রেমিক সৈনিক” দাবি করে বলেন, “আমরা শুধু জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছি।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারা ধর্ষণকেও রাষ্ট্ররক্ষার অংশ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, যা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
ইসরায়েলি সাংবাদিক অরলি নয় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “এই মুহূর্তে কেউ ধর্ষণ ও নির্যাতনের কথা বলছে না, সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কে ভিডিওটি ফাঁস করল, কেন করল— সেটি নিয়ে। যেন আসল অপরাধ নয়, বরং ‘ডিপ স্টেট’ ষড়যন্ত্রই এখন আলোচনার মূল বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, “নেতানিয়াহুর সরকার বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে— বিশেষ করে বিচার বিভাগের সংস্কার নিয়ে চলমান দ্বন্দ্ব, দুর্নীতি মামলা, এবং গাজা যুদ্ধের ব্যর্থ কৌশল নিয়ে। তাই এই ধর্ষণকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে সরকার নিজেদের ইমেজ বাঁচানোর চেষ্টা করছে।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবাধিকার উদ্বেগ
জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইতিমধ্যে ঘটনাটির স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তারা বলেছে, “এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।”
তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি, বরং গণমাধ্যমে তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপ বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, এই ভিডিও ফাঁস ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর “অমানবিক বাস্তবতা” বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি দমননীতির আরেকটি নগ্ন উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হবে।
এই পুরো ঘটনাটি ইসরায়েলের বিচারব্যবস্থা, সেনা নৈতিকতা এবং সরকারের স্বচ্ছতার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে একজন সামরিক কর্মকর্তা মানবতার দায়ে সত্য প্রকাশের সাহস দেখিয়েছেন, অন্যদিকে সেই সাহসিকতাকেই রাষ্ট্রদ্রোহের নাম দিয়ে দমন করার চেষ্টা চলছে। আর এর মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— একজন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি বন্দির উপর এমন নির্মম নির্যাতনের দায় কে নেবে?
এই ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত মনে করিয়ে দেয়, সত্যকে চেপে রাখা যায় না। কোনো রাষ্ট্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, মানবতার প্রতি অন্যায় একদিন না একদিন প্রকাশিত হবেই।










