সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিলুপ্ত হলো একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা ৫ ব্যাংকের পর্ষদ, আজই দায়িত্ব নিচ্ছেন প্রশাসক

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৪:৫১:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২৭১ Time View

 

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি বেসরকারি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার (৫ নভেম্বর) বিকেলেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, এবং একই দিন থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে বসছেন প্রশাসকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শওকত উল আলম
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্বে থাকবেন নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ বদিউল আলম দিদার,
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব পেয়েছেন নির্বাহী পরিচালক মো. সালাহ উদ্দীন
এছাড়া, ইউনিয়ন ব্যাংকের দায়িত্বে থাকবেন পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হাসেম এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্বে থাকছেন পরিচালক মকসুদুল আলম

একীভূতকরণের পটভূমি

এর আগে গত ৯ অক্টোবর, সংকটে থাকা এই পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করার প্রস্তাব অনুমোদন দেয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। ব্যাংকগুলো হলো—
১. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
২. গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
৩. ইউনিয়ন ব্যাংক
৪. এক্সিম ব্যাংক
৫. সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে একটি নতুন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপ নেবে। ব্যাংকটির জন্য দুটি নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল— ইউনাইটেড ইসলামিক ব্যাংক’ এবং সম্মিলিত ইসলামিক ব্যাংক’। এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন বাণিজ্যিক ও পেশাদার ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হবে।

আমানতকারীদের নিরাপত্তা কর্মসংস্থান

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের আশ্বাস অনুযায়ী, এই একীভূতকরণের ফলে কোনো কর্মচারী চাকরি হারাবেন না, এবং কোনো আমানতকারী তাদের আমানত হারাবেন না। সব সম্পদ ও দায়ভার নতুন ব্যাংকটি গ্রহণ করবে এবং নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

মূলধন কাঠামো

নতুন ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা, আর পরিশোধিত মূলধন

নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা
এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা, যার ১০ হাজার কোটি টাকা নগদে প্রদান করা হবে এবং বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা ‘সুকুক বন্ড’ ইস্যুর মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে।

সুকুক’ হলো শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি বন্ড, যা সুদভিত্তিক বন্ডের বিকল্প। এটি আরবি শব্দ, যার অর্থ আইনি দলিল বা চুক্তিপত্র।

বেইল-ইন প্রক্রিয়া

বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করা হবে বেইল-ইন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের আমানতের একটি অংশ শেয়ার হিসেবে রূপান্তর করা হবে। রেজল্যুশন পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তীতে এই শেয়ারগুলো পুনরায় মূল অর্থে পরিশোধ করা হবে।
‘বেইল-ইন’ প্রক্রিয়ায় সাধারণত ব্যাংকের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় বাহ্যিক সহায়তার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও দায়কে পুনর্গঠন করা হয়, যাতে ব্যাংকটি টিকে থাকতে পারে।

ভবিষ্যত কাঠামো

নতুন ব্যাংকটি প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রমালিকানাধীন থাকবে, তবে পর্যায়ক্রমে মালিকানা বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো ইসলামী ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এই একীভূতকরণ দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় পুনর্গঠন উদ্যোগ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান তারল্য সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাতটিতে স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে প্রশাসকদের কার্যকর পদক্ষেপ, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন একটি সাহসী অর্থনৈতিক সংস্কারের দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা ও দক্ষতার নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বিলুপ্ত হলো একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা ৫ ব্যাংকের পর্ষদ, আজই দায়িত্ব নিচ্ছেন প্রশাসক

Update Time : ০৪:৫১:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫

 

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি বেসরকারি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার (৫ নভেম্বর) বিকেলেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, এবং একই দিন থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে বসছেন প্রশাসকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শওকত উল আলম
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্বে থাকবেন নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ বদিউল আলম দিদার,
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব পেয়েছেন নির্বাহী পরিচালক মো. সালাহ উদ্দীন
এছাড়া, ইউনিয়ন ব্যাংকের দায়িত্বে থাকবেন পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হাসেম এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্বে থাকছেন পরিচালক মকসুদুল আলম

একীভূতকরণের পটভূমি

এর আগে গত ৯ অক্টোবর, সংকটে থাকা এই পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করার প্রস্তাব অনুমোদন দেয় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। ব্যাংকগুলো হলো—
১. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
২. গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
৩. ইউনিয়ন ব্যাংক
৪. এক্সিম ব্যাংক
৫. সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে একটি নতুন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপ নেবে। ব্যাংকটির জন্য দুটি নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল— ইউনাইটেড ইসলামিক ব্যাংক’ এবং সম্মিলিত ইসলামিক ব্যাংক’। এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন বাণিজ্যিক ও পেশাদার ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হবে।

আমানতকারীদের নিরাপত্তা কর্মসংস্থান

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের আশ্বাস অনুযায়ী, এই একীভূতকরণের ফলে কোনো কর্মচারী চাকরি হারাবেন না, এবং কোনো আমানতকারী তাদের আমানত হারাবেন না। সব সম্পদ ও দায়ভার নতুন ব্যাংকটি গ্রহণ করবে এবং নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

মূলধন কাঠামো

নতুন ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা, আর পরিশোধিত

মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা
এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা, যার ১০ হাজার কোটি টাকা নগদে প্রদান করা হবে এবং বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা ‘সুকুক বন্ড’ ইস্যুর মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে।

সুকুক’ হলো শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি বন্ড, যা সুদভিত্তিক বন্ডের বিকল্প। এটি আরবি শব্দ, যার অর্থ আইনি দলিল বা চুক্তিপত্র।

বেইল-ইন প্রক্রিয়া

বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করা হবে বেইল-ইন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের আমানতের একটি অংশ শেয়ার হিসেবে রূপান্তর করা হবে। রেজল্যুশন পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তীতে এই শেয়ারগুলো পুনরায় মূল অর্থে পরিশোধ করা হবে।
‘বেইল-ইন’ প্রক্রিয়ায় সাধারণত ব্যাংকের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় বাহ্যিক সহায়তার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও দায়কে পুনর্গঠন করা হয়, যাতে ব্যাংকটি টিকে থাকতে পারে।

ভবিষ্যত কাঠামো

নতুন ব্যাংকটি প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রমালিকানাধীন থাকবে, তবে পর্যায়ক্রমে মালিকানা বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো ইসলামী ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এই একীভূতকরণ দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় পুনর্গঠন উদ্যোগ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান তারল্য সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাতটিতে স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে প্রশাসকদের কার্যকর পদক্ষেপ, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন একটি সাহসী অর্থনৈতিক সংস্কারের দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা ও দক্ষতার নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে।