উগান্ডা থেকে নিউইয়র্ক—সর্বকনিষ্ঠ ও প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানি
- Update Time : ১০:৪৬:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫
- / ২২৫ Time View

মাত্র এক বছর আগেও জোহরান মামদানি ছিলেন এক অচেনা নাম—রাজনীতির মূলধারার বাইরে, প্রবাসী সমাজের এক তরুণ সংগঠক। আজ তিনি ৩৪ বছর বয়সে নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় এবং সর্বকনিষ্ঠ মেয়র—যার বিজয় আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। উগান্ডা থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত তার যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি অভিবাসী, মুসলিম এবং শ্রমজীবী মানুষের এক যৌথ বিজয়ের প্রতীক।
ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে মামদানির উত্থান ছিল যেন এক বজ্রপাতের মতো—অপ্রত্যাশিত, অথচ শক্তিশালী। করপোরেট অর্থায়ন বা ক্ষমতাবান দাতাদের আশ্রয় ছাড়াই তিনি গড়ে তুলেছেন জনগণনির্ভর এক প্রচারণা। তরুণ ভোটার, অভিবাসী শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত নাগরিকদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তার হাস্যরসাত্মক কিন্তু গভীর মানবিক বার্তাগুলো। তার প্রচারণার স্লোগান—“জীবন এত কঠিন হতে হবে না”—রাতারাতি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
তার টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম প্রচারণা রাজনীতিতে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করে। কখনও “হালালফ্লেশন” শব্দের মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতির ব্যঙ্গ, কখনও কনি আইল্যান্ডের ঠান্ডা জলে ঝাঁপ দেওয়ার অঙ্গীকার—মামদানি প্রমাণ করেছেন যে রাজনীতি কেবল বিতর্কের বিষয় নয়, এটি হতে পারে মানুষের হাসি-কান্নার সঙ্গে মিশে থাকা এক আন্দোলন। তার প্রতিশ্রুতি ছিল স্পষ্ট: ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, সহজলভ্য মুদি দোকান, শিশু যত্নে সহায়তা, গণপরিবহনে বিনিয়োগ এবং শহরের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন।
মানবিক রাজনীতির মুখ
মামদানির প্রচারণা ছিল এক অনন্য রাজনৈতিক পাঠ। তিনি কখনও বিলাসবহুল অফিস থেকে নয়, বরং সাবওয়ে ট্রেনে, কর্মস্থলে বা নাইট শিফটের কারখানায় গিয়ে কথা বলেছেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। কখনও ম্যারাথনে দৌড়ানোর সময় ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে স্লোগান তুলেছেন, আবার কখনও সাবওয়ে ট্রেনে আকস্মিক এক বিয়ের সাক্ষী হয়ে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তার একটি আলোচিত ভিডিওতে কৃষ্ণাঙ্গ ও অভিবাসী ভোটাররা ব্যাখ্যা করেছিলেন কেন তারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন বা ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন—যা দেখিয়েছে, মামদানি রাজনীতিকে বিভাজনের নয়, বোঝাপড়ার জায়গা হিসেবে দেখেন।
পরিবার ও শিক্ষাজীবন
উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় জন্ম নেওয়া জোহরান মামদানির বেড়ে ওঠা এক সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ পরিবারে। তার মা মীরা নায়ার—বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা (‘মনসুন ওয়েডিং’), আর বাবা মাহমুদ মামদানি—কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক ও আফ্রিকান স্টাডিজের গবেষক। মাত্র সাত বছর বয়সে মামদানি পরিবারসহ নিউইয়র্কে চলে আসেন। ব্রঙ্কস হাই স্কুল অব সায়েন্সে পড়ার সময় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্কুলের প্রথম ক্রিকেট দল, যা আজও নিউইয়র্কের অভিবাসী তরুণদের কাছে এক গর্বের প্রতীক।
পরে বোডউইন কলেজ থেকে আফ্রিকানা স্টাডিজে স্নাতক সম্পন্ন করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন”—একটি ছাত্র সংগঠন যা মধ্যপ্রাচ্যের মানবাধিকার ইস্যুতে সচেতনতা ছড়ায়। ২০১৮ সালে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন।
রাজনীতিতে পদার্পণ
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে মামদানি ছিলেন এক ‘কমিউনিটি অর্গানাইজার’—যিনি ঋণ খেলাপি ও বন্ধক জব্দ হওয়া মানুষদের সহায়তা করতেন। ২০২০ সালে তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ৩৬তম জেলা থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন, যেখানে তিনি প্রথম দক্ষিণ এশীয়, প্রথম উগান্ডান ও তৃতীয় মুসলিম আইনপ্রণেতা হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
২০২১ সালে সিরীয় বংশোদ্ভূত শিল্পী রামা দুয়াজির সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে, এবং চলতি বছরের শুরুতে তারা সিটি হলে বিয়ে করেন—যা নিউইয়র্কের বহুসংস্কৃতির প্রতীকী এক মুহূর্তে পরিণত হয়।
রাজনৈতিক উত্থানের পেছনের শক্তি
২০২৫ সালের জুনে ডেমোক্রেটিক মেয়র প্রাইমারিতে ব্যাপক ব্যবধানে জয়ের পর মামদানি ধীরে ধীরে পেয়ে যান শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতাদের সমর্থন—কামালা হ্যারিস, গভর্নর ক্যাথি হোচুল, এবং হাকিম জেফরিসসহ অনেকে প্রকাশ্যে তার পাশে দাঁড়ান। তবে তার প্রচারণার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনগণ। করপোরেট অনুদান নয়, বরং সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানেই গড়ে ওঠে তার তহবিল।
মুসলিম ও অভিবাসী গর্বের প্রতীক
ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদের প্রচারণার মুখেও মামদানি হাল ছাড়েননি। তিনি উর্দু, হিন্দি, আরবি ও স্প্যানিশ ভাষায় প্রচারণা চালিয়ে পৌঁছে যান মসজিদ, গির্জা, স্কুল, এমনকি নাইট শিফটের কারখানাগুলোতেও। তিনি গাজার মানবিক সংকট নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন, অভিবাসী অধিকার রক্ষায় দাঁড়িয়েছেন, এবং মুসলিম পরিচয়ের প্রতি গর্ব প্রকাশ করেছেন। এর ফলে তিনি শুধু মুসলিম ভোটারদের নয়, বরং বহু ধর্ম-বর্ণের তরুণ আমেরিকানদের অনুপ্রেরণার মুখ হয়ে উঠেছেন।
বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া
রিপাবলিকান নেতারা তাকে ‘বামপন্থী বিপজ্জনক এক্সপেরিমেন্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনকি নিউইয়র্কে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের হুমকি দিয়েছেন, ফেডারেল তহবিল বন্ধের সতর্কতাও দিয়েছেন। কিছু সংবাদমাধ্যম তাকে “মুসলিম বার্নি স্যান্ডার্স” নামে আখ্যা দিয়েছে—যিনি করপোরেট আমেরিকার বিপরীতে এক নতুন সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতি চালু করতে চান।
নতুন প্রজন্মের আশা
৯/১১-পরবর্তী প্রজন্মের এক তরুণ মুসলিম হিসেবে মামদানির উত্থান ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন শ্বেত জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ যুক্তরাষ্ট্রে আবার তীব্র হয়ে উঠেছে। তবু তিনি অটল থেকেছেন নিজের মূল দর্শনে—“একটি সাশ্রয়ী, ন্যায্য এবং মানবিক নিউইয়র্ক গড়তে হবে, যেখানে কেউ বঞ্চিত থাকবে না।”
আজ নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানি কেবল শহরের নয়, বরং আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছেন। উগান্ডা থেকে শুরু হওয়া তার যাত্রা প্রমাণ করেছে—পরিচয়ের প্রাচীর যত উঁচুই হোক, স্বপ্ন, সাহস ও মানবিক রাজনীতিই পারে নতুন ইতিহাস রচনা করতে। শহরটি এখন তার হাতেই দেখছে এক নতুন সূর্যোদয়—যেখানে আশার আলোয় আলোকিত হচ্ছে অভিবাসী ও সাধারণ মানুষের মুখ।










